সাংবাদিক মিন্টু বসু আর নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বিশিষ্ট সাংবাদিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নগরীর সাংস্কৃৃতিক অঙ্গণের অন্যতম ব্যক্তিত্ব মিন্টু বসু পরলোকগমন করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার রাত সোয়া দশটায় নগরীর আরিফ মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নি.শ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তিনি স্ত্রী ও এক কন্যাসহ বহু গুনগ্রাহী রেখে গেছেন। বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী মিন্টু বসু’র অন্তেষ্টিক্রিয়া আজ বুধবার অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে নগরীর খেয়ালী গ্রুপ থিয়েটার, শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে নেয়া হবে। সেখানে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। পরে সর্বজনের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে নগরীর শহীদ মিনার চত্বরে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর  অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
তার মৃত্যুর খবর শুনে বরিশালের সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং শুভাকাংখীরা নগরীর শীতলাখোলা এলাকায় তার বাসভবনে ছুটে যান। প্রয়াত মিন্টু বসুকে এক নজর দেখার জন্য তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্টসহচর সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতৃবৃন্দ ভীড় করেন। অনেকেই প্রয়াত মিন্টু বসুর নিথর দেহ দেখে আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন। রাতেই বাসভবনে ছুটে যান বিশিষ্ট সাংবাদিক মানবেন্দ্র বটব্যাল, এসএম ইকবাল, নজরুল ইসলাম  চুন্নু, সৈয়দ দুলাল, আনিচুর রহমান স্বপন, কাজল ঘোষ, এ্যাড. গোলাম মাসউদ বাবলু, বরিশাল প্রতিদিন সম্পাদক কাজী কামাল, মুরাদ আহমেদ, বিএনপি নেত্রী এ্যাড. বিলকিস জাহান শিরিন, দৈনিক আজকের পরিবর্তন সম্পাদক কাজী মিরাজ, দৈনিক সমকাল’র বরিশাল ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জি, সুরভী লঞ্চের মালিক রিয়াজ উল কবির ও রেজিন উল কবিরসহ নগরীর গনমান্য ব্যক্তিবর্গ।
মিন্টু বসু’র কর্মময় জীবন
একাধারে সাংবাদিক, লেখক, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, অভিনেতা ও সংগঠক গুণী এ মানুষটি ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার বৈচন্ডি গ্রামে ১৯৪৮ সালের ১২ মার্চ জš§গ্রহণ করেন। প্রয়াত নরেন্দ্রনাথ বসু ও প্রয়াত শৈলবালা বসু দম্পত্তির ৬ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। বহুমুখী প্রতিভার এই মানুষটি সুদীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতা পূর্বকালে প্রগতিশীল সামাজিক-সাংস্কৃৃতিক সংগঠন ‘বরিশাল যুবসংঘ’র নেতৃস্থানীয় কর্মী ছিলেন মিন্টু বসু। এ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তিনি ’৬৯ এর গণঅভ্যূত্থান এবং স্ব^াধীনতা পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিবাদী। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল প্রকাশিত স্ব^াধীন বাংলাদেশে প্রথম সংবাদপত্র ‘বাংলাদেশ’ পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদের অন্যতম ছিলেন মিন্টু বসু। ‘বাংলাদেশ’ পত্রিকা থেকেই মিন্টু বসুর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয়েছিল। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের মুখপত্র বিপ্লবী বাংলাদেশের বার্তা সম্পাদক ছিলেন মিন্টু বসু। রণাঙ্গন নিয়ে মিন্টু বসুর অনেক লেখাই ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দলিল পত্র’ গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে। তিনি দৈনিক দক্ষিণাঞ্চল ও আজকের বার্তা সম্পাদক, দৈনিক গ্রাম সমাচারের নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদ, দৈনিক দেশবাংলা এবং দৈনিক বাংলার বাণীতে বরিশাল সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। দীর্ঘ দিন একুশে টিভিরও বরিশাল প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ছাড়াও বরিশাল প্রেসক্লাবের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন মিন্টু বসু।
লেখক হিসেবে নাটক, উপন্যাস, জীবনী গ্রন্থ ও মুক্তিযুদ্ধের ওপর তার ৭৮টি বই প্রকাশিত হয়েছে। ’৮০ এর দশকে শিশু সংগঠন চাঁদের হাটের মাধ্যমে বরিশালে শিশু নাট্য আন্দোলন গড়ে তোলেন। দেশের অন্যতম প্রাচীন গ্রুপ থিয়েটার খেয়ালী গ্রুপ থিয়েটারের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ ২০ বছর। তার লেখা নাটকের সংখ্যা ৩৪। এর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ১৪টি। ১৯৯৪ সালে তার লেখা নাটক ‘বিপ্লবের মৃত্যু নেই’ মঞ্চস্থ হয় এবং বিশেষ অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। তার একাধিক নাটক টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। ঢাকা নাট্য সংগঠন লোকনাট্য দল মিন্টু বসুকে ১৯৯৩ সালে দেশের শ্রেষ্ঠ নাট্য কর্মীর পদকে ভূষিত করেন। এছাড়াও বরিশালের প্রজন্ম নাট্য কেন্দ্র তাকে বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ পদক প্রদান করে। এ পর্যন্ত তিনি অর্ধশত নাটকে অভিনয় ও নির্দেশনা দিয়েছেন। তার লেখা নাটক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, অপসংস্কৃতি এবং সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে। তিনি বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং একাধিকবার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। মিন্টু বসু মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বরিশাল জেলা কমান্ডের সাবেক সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাংস্কৃতিক সম্পাদকসহ বহু প্রগতিশীল সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরাম বরিশাল মহানগর শাখার সভাপতি ছিলেন।