সর্বকালের সর্বোচ্চ সংখ্যক যানবাহন ও যাত্রী পরিবহন করেছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিআইডব্লিউটিসি

বিশেষ প্রতিবেদক॥ এবারের ঈদ উল ফিতরের আগে পরে রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল সংস্থা-বিআইডব্লিউটিসি তার ফেরি সেক্টরগুলোতে এযাবতকালের সর্বোচ্চ, প্রায় ১লাখ যানবাহন পারাপার সহ অভ্যন্তরীন ও উপকূলীয় নৌ পথে যাত্রী পরিবহন করে প্রায় সাড়ে ১১কোটি টাকা আয় করেছে। সংস্থাটির ইতিহাসে সর্বাধিক সংখ্যক ফেরি ও যাত্রীবাহী নৌযান নিয়ে এযাবতকালের যেকোন উৎসব কেন্দ্রীক সর্বোচ্চ যানবাহন ও যাত্রী পারাপর করার রেকর্ড অর্জন করেছে। আয়ের দিক থেকেও যা ছিল সর্বাধিক। এর ফলে দেশের একমাত্র সেক্টর কর্পোরেশন হিসেবে সংস্থাটির মুনাফার ধারা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থ বছরে সংস্থাটি এ যাবাতকালের সর্বোচ্চ প্রায় ৬৫কোটি টাকা নীট মুনাফা অর্জন করেছে। যা এর আগের অর্থ বছরে ছিল ৫৫কোটি টাকা।
তবে এবারো সংস্থাটি চট্টগ্রাম-বরিশাল রুটে তার ঐতিহ্যবাহী উপকূলীয় স্টিমার সার্ভিসের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০কোটি টাকায় দুটি নৌযান পূণর্বাসন ও ৩০ কোটি টাকায় অপর ১টি উপকূলীয় নৌযান সংগ্রহের পরেও অতি জনগুরত্বপূর্ণ এ উপকূলীয় যাত্রীবাহী সার্ভিসটি পূণর্বাসনে নৌ পরিবহন মন্ত্রীর ওয়াদা পুরনেও সংস্থাটির দায়িত্বশীল মহলের যথাযথ উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ সাধারন যাত্রীদের।
এবারের ঈদের আগে পরে বিআইডব্লিউটিসি তার ফেরি বহরের বিভিন্ন মানের ৪৫টি ফেরির প্রায় সবগুলোকেই পরিচালনার মাধ্যমে ১লাখের মত যানবাহন পারাপার করে। গত ১৪জুলাই সকাল থেকে ২৫জুলাই পর্যন্ত এ রেকর্ড সংখ্যক যানবাহন পারাপার সম্ভব হয়েছে বলে জানা গেছে। যা ছিল দেশের ইতিহাসে যে কোন ঈদের ছুটি কেন্দ্রীক সর্বাধিক সংখ্যক যানবাহন পারপার। রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল সংস্থাটি তার জন্মলগ্ন থেকেই রাজধানীর সাথে দেশের দক্ষিন ও দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক পথে পদ্মা ও যমুনার ওপর দিয়ে যানবাহন পারপারের মাধ্যমে এক চলন্ত সিড়ির কাজ করছে। যমুনা সেতু চালুর পর থেকে আরিচা-নগরবাড়ী ফেরি সার্ভিসটি বন্ধ হলেও সংস্থাটির ফেরি সেক্টরে আয় ও মুনফার ধারায় কোন ছেদ পরেনি। বেড়েছে ফেরির সংখ্যাও।
এবারের ঈদে পারাপারকৃত ১লাখ যানবহানের মধ্যে পাটুরিয়া ও মাওয়া সেক্টরের মাধ্যমে রাজধানীর সাথে দেশের দক্ষিন ও দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলায়ই প্রায় ৯০ভাগ বিভিন্ন মান ও ধরনের গাড়ী পারাপার করা হয়। এছাড়া এসময়কালে চাঁদপুরÑশরিয়তপুর, ভোলাÑলক্ষ্মীপুর ও ভোলাÑবরিশালের মধ্যবর্তি লাহারহারট ভেদুরিয়া সেক্টরেও বিপুল সংখ্যক যানবাহন পারাপার করা হয় বলে বিআইডব্লিউটিসি’র দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।
বর্তমানে সংস্থার ফেরি বহরে রো-রো, কে-টাইপ, মিডিয়াম ফেরি, স্মল ফেরি ও ডাম্ব ফেরি বা ফ্লাট ফেরি ছাড়াও ৭টি ইউটিলিটি ফেরি মিলিয়ে ৪৫টি ফেরি রয়েছে। যার প্রায় সবগুলোই এবারের ঈদের আগে-পরে যানবাহন পারপার কাজে নিয়োজিত ছিল। ফলে এবার রেকর্ড সংখ্যক যানবাহন পারাপার সম্ভব হয়। এমনকি সংস্থাটির ইতিহাসে ঈদের আগে-পরের কোন কোন দিন ২৪ঘন্টায় ১১হাজার যানবাহন পারাপারের রেকর্ডও সৃষ্টি হয় এবার।
বর্তমানে দেশের প্রধান দুটি ফেরি সেক্টরে ১৮টি করে মোট ৩৬টি ফেরি যানবাহন পারাপারে নিয়োজিত রয়েছে। এরমধ্যে রাজধানীর সাথে দেশের দক্ষিন ও দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের সংক্ষিপ্ত সড়ক পথের মাওয়া-কাওড়াকান্দী সেক্টরে প্রথমবারের মত ৫টি রো-রো ফেরি যানবাহন পারাপারে নিয়োজিত রয়েছে। পাশাপাশি এ সেক্টরে ৩টি কে-টাইপ, ৬টি ডাম্ব ফেরি, ২টি মিডিয়াম ও ১টি স্মল ফেরি যানবাহন পারাপারে নিয়োজিত ছিল ঈদের আগে পরে। পাটুরিয়রা সেক্টরেও ১০টি রো-রো ও ৩টি কে-টাইপ ছাড়াও ৫টি ইউটিলিটি টাইপের ফেরি যানবাহন পারাপার করেছে। এরফলে দেশের প্রধান এ দুটি ফেরি সেক্টরে ৯০হাজোরের বেশী যানবাহন পারাপার সম্ভব হয় ঈদের আগে পরে।
অপরদিকে চাঁদপুরÑশরিয়তপুর ও ভোলাÑলক্ষ্মীপুর এবং লাহারহাট-ভেদুরিয়া সেক্টরে আরো প্রায় ১০হাজার যানবাহন পারাপার করেছে বিআইডব্লিউটিসি। এসব যানবাহন পারাপার করে সংস্থাটি গত ১৪জুলাই থেকে ২৫জুলাই পর্যন্ত সাড়ে ১০কোটি টাকারও বেশী আয় করে। যা এর আগের যে কোন সময়ের ঈদ উৎসব কেন্দ্রীক আয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এদিকে এবারের ঈদের আগে পরে বিআইডব্লিউটিসি প্রথমবারের মত সর্বাধিক সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করে রেকর্ড পরিমান আয় করেছে। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত ১৪জুলাই থেকে ২৫জুলাই পর্যন্ত সংস্থাটি অভ্যন্তরীন সেক্টরে প্রায় ৬০হাজার যাত্রী বহন করে। পাশাপাশি উপকূলীয় সেক্টরেও প্রায় সাড়ে ৭হাজার যাত্রী বহন করে সংস্থাটির উপকূলীয় নৌযানগুলো। অভ্যন্তরীন ও উপকূলীয় যাত্রীবাহী সেক্টর থেকে এসময়ে সংস্থাটির আয় ছিল প্রায় ৮১লাখ টাকার মত। এর বাইরে ইজারা দেয়ার সংস্থাটির বিভিন্ন সী-ট্রাকেও অন্তত ১০হাজার যাত্রী বহন করে বলে জানা গেছে। এমনকি সংস্থাটির ফেরি সেক্টরেও প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। এ সেক্টরে ঈদের আগে পরে কমপক্ষে ৫০হাজার যাত্রী পারাপার হয়েছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও মাওয়াÑকাওড়াকান্দী সেক্টরে। এবারের ঈদের আগে-পরে সংস্থাটির বহরে সদ্য সংযোজিত ‘এমভি মধুমতি’ জাহাজটি অত্যন্ত নির্ভরতার সাথে যাত্রী পরিবহন করেছে। নৌযানটি ঢাকাÑবরিশাল রুটে প্রায় প্রতিদিনই ডবল ট্রিপে বিপুল সংখ্যক যাত্রী বহন করে। এছাড়া সংস্থাটির অপর স্ক্রু-হুইল জাহাজ ‘এমভি বাঙালী’ ছাড়াও প্যাডেল জাহাজ ‘পিএস মাহসুদ, পিএস অষ্ট্রিচ, পিএস লেপচা ও পিএস টার্ণ’ও এবার অত্যন্ত নির্ভরতার সাথে রাজধানী থেকে দক্ষিনাঞ্চলে যাত্রী পরিবহন করেছে। এমনকি এবারই প্রথমবারের মত সংস্থাটি ঈদের আগের মত পরের দিনগুলোতেও পরো একটি সপ্তাহ জুড়ে বিশেষ সার্ভিসের মাধ্যমে কর্মস্থলমুখি যাত্রী পরিবহনে সক্ষম হয়।
এসব ব্যাপারে সংস্থার জিএম-বাণিজ্য এসএম সাহদাত আলী জানান, ‘এবার অনেকটা যুদ্ধকালীন তৎপড়তায় সংস্থার ফেরি সেক্টরেরর মত যাত্রীবাহী সেক্টরের প্রতিটি কর্মীও কাজ করেছেন। সংস্থার চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে দায়িত্বশীল সকলেই প্রতিনিয়ত প্রতিটি সার্ভিসের মনিটরিংও করেছেন। ফলে অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে এবার রাষ্ট্রীয় সংস্থা হিসেবে বিআইডব্লিইটসি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথেষ্ট নিষ্ঠার সাথেই পালন করেছে। তবে চট্টগ্রাম-বরিশাল রুটে উপকূলীয় স্টিমার সার্ভিস চালুর প্রসঙ্গে তার দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি জানান, ‘এ রুটে পুনরায় নৌযান চালুর চেষ্টা চলছে। পূণর্বাসনকৃত নৌযানগুলোর কারিগরি ত্রুটির কারনে এখনো সে লক্ষ্য অর্জন না হলেও যত দ্রুত সম্ভব এ সার্ভিসটি চালুর চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।