সরকারি দপ্তরে টেন্ডারবাজি অব্যাহত

সাইদ মেমন॥ বেপরোয়া মহানগর ছাত্রলীগ নেতাদের টেন্ডারবাজি বন্ধ হয়নি। যে কোন সরকারি দপ্তরের উন্নয়নমূলক কাজের দরপত্র আহবান প্রক্রিয়া তাদের বাঁধায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পরে। দরপত্র আহবান করা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি আর ঠিকাদারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা এখন ছাত্রলীগ নেতাদের দৈনন্দিন কাজে পরিণত হয়েছে। ছাত্রলীগ নেতাদের টেন্ডারবাজী উপেক্ষা করে যে সব ঠিকাদার দরপত্র জমা দিতে যায় তাদের লাঞ্ছিতসহ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। গত অক্টোবর মাসের বরিশাল জেলা প্রশাসকের সভা কক্ষে মাসিক আইন শৃংখলা রক্ষার সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবির প্রেক্ষিতে টেন্ডারবাজী প্রতিহতে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু তা সিদ্ধান্ত পর্যন্ত রয়ে গেছে। বাস্তবে কোন প্রয়োগ নেই। যার পুরো সুযোগ নিয়েছে ছাত্রলীগের বেপরোয়া নেতারা।
গত ৫ নভেম্বর ছাত্রলীগের বাঁধার কারণে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের আড়াই কোটি টাকার দরপত্রের লটারী স্থগিত হয়।
মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসিম উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক অসীম দেওয়ান গত ৭ নভেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ঠিকাদারদের দরপত্র জমা দিতে না দিয়ে সাড়ে চার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়। এই সময় ঠিকাদার যুবলীগ নেতাকে মারধর করে তারা।
এর কয়েকদিন পর যুবলীগ নেতার সহায়তায় মঈন তুষারের নেতৃত্বে বরিশাল ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের ৩ কোটি টাকার নির্মাণ কাজ দরপত্র জমা দিতে যাওয়া ঠিকাদারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বাগিয়ে নিয়েছে।
ধারাবাহিকতায় গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রায় সাড়ে ৪৬ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজের দরপত্র আহবান প্রক্রিয়া ছাত্রলীগের মহানগর শাখার নেতাদের টেন্ডারবাজির কবলে পড়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ওই কাজের দরপত্র জমা দেয়ার দিন ছিলো। কিন্তু টেন্ডারবাজিতে নগরীতে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা দরপত্র জমা দিতে আসা ঠিকাদারদের শুধু লাঞ্ছিতই করেনি, ঠিকাদারদের দরপত্র জমা দিতে বাঁধাও দিয়েছে। এ সময় মেসার্স গুলজার এন্টার প্রাইজের পক্ষে সিডিউল জমা দিতে গেলে মাসুম নামে এক যুবককে মারধর করা হয়। মাসুমের মাথায় ও পায়ে গুরুতর জখম হয়েছে। যারা জোরপূর্বক দরপত্র জমা দিয়েছে সেই সব ঠিকাদারদের কাছে ওই ছাত্রলীগ নেতারা খরচ দাবি করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নগরীর ভাটারখাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং জিলা স্কুল মোড়ে একই বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ে র‌্যাব-পুলিশের উপস্থিতিতে এসব ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ দফায় দফায় লাঠিচার্জ করে টেন্ডারবাজ সন্ত্রাসীদের অফিস থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু যারা দরপত্র দিয়েছে, তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন।
বরিশালে মেরিন একাডেমি নির্মাণের জন্য গত ১৩ অক্টোবর ৫ গ্রুপের দরপত্র আহ্বান করা হয়। গত সোমবার দরপত্র বিক্রির শেষ দিন পর্যন্ত ২৩ কোটি টাকায় একাডেমিক ভবন নির্মাণ কাজের বিপরীতে ১০টি, ১৮ কোটি টাকায় ডরমেটরী ভবন নির্মাণ কাজের বিপরীতে ৯টি, কমান্ডেন্টের বাস ভবন নির্মাণের দেড় কোটি টাকার কাজের ১০টি, ডেপুটি কমান্ডেন্টের বাস ভবন নির্মাণের দেড় কোটি কাটার কাজের ৪টি এবং ভূমি উন্নয়নের (মাটি ভরাট) সোয়া ২ কোটি টাকার কাজের ১৮টি দরপত্র বিক্রি হয়।
নগরীর প্রথম শ্রেণির ঠিকাদাররা অভিযোগ করেন, গতকাল সকাল থেকে এই ৫ গ্রুপ কাজের টেন্ডার দরপত্র জমা দিতে বাঁধা দেয় টেন্ডারবাজ সন্ত্রাসীরা। তারা দরপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং ঠিকাদারদের লাঞ্ছিত করে। এ সময় কেউ কেউ টেন্ডারবাজদের ফাঁক গলে নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে প্রবেশ করে দরপত্র জমা দিতে গেলে সেখানে গিয়েও তাদের জাঁপটে ধরে টেন্ডারবাজরা। অবস্থা বেগতিক দেখে কর্তব্যরত পুলিশ এক পর্যায়ে কঠোর হয় এবং লাঠিচার্জ করে টেন্ডারবাজদের অফিস থেকে তাড়িয়ে দেয়। বিষয়টি স্বীকার করেছেন সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা কোতয়ালী থানার এসআই আব্দুল মালেক।
এই সময় টেন্ডারবাজ যুবলীগ নেতা মো. লিটনকে পুলিশ পিটিয়েছে। প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার শাফিকুল আলম গুলজার অভিযোগ করেন, সকালে তার প্রতিষ্ঠানের একজন প্রকৌশলী দরপত্র জমা দিতে গেলে তাকে বাঁধা দেয় ছাত্রলীগের টেন্ডারবাজ নেতারা। খবর পেয়ে তিনি টেন্ডার জমা দিতে গেলে, তাকেও বাঁধা দেয় তারা। এক পর্যায়ে তিনি দৌড়ে অফিসে প্রবেশ করে পুলিশের সহায়তায় দরপত্র জমা দেয়া হয় বলে জানান তিনি।
এক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো. শামীম বলেন, টেন্ডারবাজদের হাত থেকে ছুটে গিয়ে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে রক্ষিত বক্সে দরপত্র জমা দেন। এরপর থেকে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
শহর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ঠিকাদার মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু বলেন, তাকে কেউ বাঁধা দেয়নি, তবে মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতি জসিম উদ্দিন তাকে ৫ নম্বর গ্রুপের ভূমি উন্নয়ন কাজে দরপত্র জমা না দিতে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু তিনি ওই কাজের দরপত্র জমা দিয়েছেন।
এদিকে দরপত্র জমা দেয়ার পর প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার গুলজারকে পাশে থাকা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে নিয়ে তার দরপত্র প্রত্যাহারের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন বিএম কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মঈন তুষার সহ অন্যান্যরা।
এতেও কাজ না হওয়ায় দুপুর ২টার দিকে মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতি জসিমউদ্দিন, ছাত্রলীগ নেতা মঈন তুষার এবং নাহিদ সেরনিয়াবাত সহ অন্যান্যরা ফের গুলজারের মালিকানাধীন হোটেল এরিনায় গিয়ে তার (গুলজার) দরপত্র প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। কিন্তু গুলজার বেঁকে বসায় শেষ পর্যন্ত তার কাছে কিছু খরচ দাবী করে তারা।
টেন্ডারবাজদের অন্যতম জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য মো. লিটনের কাছে জানতে চাইলে তিনি হাত জোর করে মাফ চান এবং কোন কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সকালে ছাত্রলীগের জসিম ও মঈন দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। এই সময় মঈন তুষারের ক্যাডারের হাতে সভাপতি জসিম লাঞ্ছিত হয়। কিন্তু দরপত্র বাগিয়ে নিতে ঘটনা দ্রুত সমাধান করে জোট বাঁধে।
অবশ্য পুরো ঘটনা অস্বীকার করেছেন বরিশাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন। তার কক্ষে ঠিকাদারদের জাঁপটে ধরা এবং টেন্ডারবাজদের উপর লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটলেও তিনি বেমালুম বিষয়টি চেপে গেছেন।
নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় ছাড়াও গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ে দরপত্র জমা দিতে ঠিকাদারদের বাঁধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে ক্ষমতাসীন টেন্ডারবাজদের বিরুদ্ধে। তবে শেষ পর্যন্ত টেন্ডারবাজরা সুবিধা করতে না পাড়ায় ঠিকাদাররা ৩০টি দরপত্র টেন্ডারবক্সে জমা দেন বলে গণপূর্ত বিভাগ সূত্র জানিয়েছে।