সদর হাসপাতালে পানি সরবরাহ ১৭ দিন ধরে বন্ধ

রুবেল খান॥ গত ১৬ তারিখ মোর পোলারে সদর হাসপাতালে ভর্তি করছি। আইয়া দেহি হাসপাতালের কল দিয়া একটু ফোডাও পানি পড়ে না। বাইরে দিয়া পানি কিন্না আইন্না হেইয়া লইয়া লেট্টিনে যাইতে অয়। হের ফাইন্নে অনেহে এহাইনদা হেগো রোগী অন্যহানে লইয়া গ্যাছে। কিন্তু মোরা গরিব মানুষ। হেইর ফাইন্নে কষ্ট হর্ইরা এইহানেই পোলার চিকিৎসা করাইতে আছি।
ঠিক এমনভাবেই কথাগুলো বলেছেন বরিশাল সদর (জেনারেল) হাসপাতালের পুরুষ মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন রোগী চরমোনাই’র বাসিন্দা আব্দুল মুঈন খান’র মা বিলকিছ বেগম।
একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগী আব্দুল খালেক হাওলাদারের মা এবং নগরীর কাউনিয়া এলাকার বাসিন্দা শামসুন্নাহার জানান, গত ২৩ দিন পূর্বে তার ছেলেকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় হঠাৎ করে গত কদিন যাবত সাপ্লাইয়ের পানি পাচ্ছেন না। হাসপাতাল চত্ত্বরে দুটি টিউবয়েল রয়েছে। সেখান থেকেই পানি সরবরাহ করতে হয়। হাসপাতালের সামনে যে টিউবয়েলটি রয়েছে সেটাতে গভীর রাত থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত পানি পাওয়া যায়। কিন্তু লাইনে দাড়িয়ে থাকতে গিয়ে টিউবয়েলটির পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। যে কারনে আর পানি পাওয়া সম্ভব হয় না। বাকি যে টিউবয়েলটি রয়েছে তা মসজিদের পাশে। সেখান থেকে সব সময় পানি আনা সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছেন রোগীর স্বজন শামসুন্নাহার।
শুধু মাত্র রোগীরাই নয়, গত ১৭ দিন যাবত পানি না পেয়ে সীমাহীন ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন হাসপাতাল চত্ত্বরে বসবাসকারী চিকিৎসক, নার্স এবং চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীরাও। তারা বলেন, অনেক যুদ্ধ করে কোন রকম খাবার পানিটুকু সরবরাহ করতে পারছি। তা দিয়ে রান্নার কাজও করছেন। কিন্তু গোসল করা কিংবা সৌচাগারে পানি খরচ করতে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন তারা। দিনের পর দিন চলে গেলেও কর্তৃপক্ষ সাপ্লাইয়ের পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
জানতে চাইলে হাসপাতালটির ওয়ার্ড মাষ্টার নূর হোসেন ফরাজী জানান, তাদের হাসপাতালে দুটি পাম্প রয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে বহু আগে থেকে একটি নষ্ট হয়ে আছে। গত দু’বছর পূর্বে স্থাপিত অপর পাম্পটি দিয়ে গোটা হাসপাতাল, কোয়ার্টার এবং নার্সদের ডর্মেটরিতে পানি সরবরাহ করা হচ্ছিল। কিন্তু গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে পাম্পটিতে থেকে কর্দমক্ত পানি উঠে। যে কারনে ঐ পানি ব্যবহার সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে পাম্পটি বন্ধ করে রাখা হয়েছে। পরে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে একাধিক চিঠি লেখা সত্ত্বেও তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি। এ জন্য হাসপাতালে রোগীদের পাশাপাশি এখানে বসবাসরত ৪৫টি পরিবার পানি বিহীন মারাত্মকভাবে ভোগান্তিতে পড়েছেন।
হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার আকুল রানি রায় জানান, পানি না থাকায় রোগীরা এখানে থাকতে চাচ্ছে না। চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়ে যখন জানতে পারে পানির প্রকট সমস্যা তখন তারা হাসপাতাল থেকে নাম কাটিয়ে চলে যাচ্ছে।
নার্সিং সুপুরভাইজার জানান, পানি সমস্যার পূর্বে এই হাসপাতালে ১২০ থেকে দেড়’শ রোগী প্রতিদিন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতো। কিন্তু গত ১৬ সেপ্টেম্বরের পর থেকে রোগীর সংখ্যা কমে আসছে। সে অনুযায়ী গতকাল শুক্রবার ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিলো মাত্র ৬৪ জন। পানির সমস্যা সমাধান না হলে হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জানতে চাইলে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. দেলোয়ার হোসেন বলেন, সদর হাসপাতালে পানির সমস্যার কথা শুধু বরিশাল নয়, গোটা দেশ জানে। কিন্তু তারপরেও সমাধান হচ্ছে না।
তিনি বলেন, পাম্পে সমস্যা হওয়ার পর বিসিসি থেকে প্রতিদিন সকালে সদর হাসপাতালে পানি দিয়ে যেত। কিন্তু তাদের পানির সরবরাহের লড়িতে কোন এক ঝামেলার কারনে গত কদিন যাবত আর পানি দিতে পারছে না। তাই ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষকে এ হাসপাতালে পানি সরবরাহের জন্য তারা চিঠি দিয়েছেন।
এছাড়া তাদের হাসপাতালে বিসিসি’র তিনটি পানির লাইন রয়েছে। বকেয়া বিল না দেয়ায় বিসিসি কর্তৃপক্ষ পানি সরবরাহ করছে না। এখন ঐ তিনটি লাইন চালুর জন্য তারা আগ্রহ প্রকাশ করছেন। কিন্তু বকেয়া পরিশোধ না করা পর্যন্ত বিসিসি তাদের পানির লাইন চালু করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।
ডা. দেলোয়ার আরো জানান, স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রকৌশলীরা হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। তারা আপাতত দুটি ওয়ার্ডে পানি সরবরাহের জন্য একটি টিউবয়েল স্থাপনের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু এটা দিয়ে গোট হাসপাতাল এবং কোয়ার্টারে পানি সরবরাহ সম্ভব নয়। সকল স্থানে পানি সরবরাহ করতে হলে ১৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে টিউবয়েল স্থাপন করতে হবে। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ না থাকায় আপাতত তা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানিয়েছেন ডা. দেলোয়ার হোসেন।