সংস্কারের বছর পার না হতেই খানা-খন্দে নগরীর সড়কগুলো অচল

রুবেল খান ॥ নগরীর একটি গুরুত্বপূর্ন সড়ক ফজলুল হক এভিনিউ। এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো যানবাহন চলাচল করে। গত ঈদ উল ফিতরের পূর্বে সড়কটির মেরামত করা হয়। কিন্তু কয়েক মাস পার হতে না হতেই সড়কটির বেহাল দশা হয়েছে। কাকলী মোড় থেকে ফায়ার সার্ভিস’র ষ্টেশন পর্যন্ত সড়কে ছোট ও বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। এতে যানবহন, যাত্রী ও পথচারীরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তি’র শিকার হচ্ছে। শুধু এই সড়কটিই নয়, নগরীর গুরুত্বপূর্ন প্রায় সকল সড়কই বছর পার না করতেই ফের বেহাল দশায় পরিনত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নি¤œমানের সামগ্রী দিয়ে দায়সারা কাজ হওয়ায় সড়ক’র এমন করুন অবস্থা হয়েছে। তারা সড়ক সংস্কারের নামে লাখ লাখ টাকা লুটে-পুটে নিচ্ছেন আর দুর্নাম হচ্ছে নগর কর্তৃপক্ষ’র।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ৫৮ বর্গ কিলোমিটারের এই নগরীতে মোট সড়কের ৩৮৭ কিলোমিটার পাকা এবং ২০৬ কিলোমিটার কাচা সড়ক রয়েছে। প্রায় প্রতি বছরই এসব সড়কের নির্মান এবং পুন.সংস্কার কাজ করে থাকে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। আর তাই বছরে বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থই চলে যাচ্ছে সড়ক নির্মান ও সংস্কার কাজে। কিন্তু নগরবাসীর ভোগান্তি দুরীকরনের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যে পূরন হচ্ছে না। বরং নগর কর্তৃপক্ষকের চোখে ধুলা দিয়ে সরকার ও জনগনের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ঠিকাদাররা। আর এসব অনিয়ম বেশিরভাগই হচ্ছে দলীয় কিংবা প্রভাবশালী ঠিকাদার কর্তৃক।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর জনগুরুত্বপূর্ন ফজলুল হক এভিনিউ সড়কের বেহাল দশার চিত্র। পুরো রাস্তা জুড়ে দুই এক কদম পর পরই গর্তের সৃষ্টি হয়ে আছে। বৃষ্টি এলেই গোটা রাস্তায় কর্দমাক্ত হয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। চলাচল করতে গিয়ে কাদা-পানিতে নষ্ট হচ্ছে জামা-কাপড়। সড়ক দিয়ে ভালোভাবে চলতে পারছে না কোন প্রকার যানবাহন। অথচ জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের পাশেই অবস্থিত জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্ট, সিটি কর্পোরেশনের নগর ভবন এবং বিভিন্ন বিপনি বিতান। লঞ্চ ঘাটে কিংবা চক বাজারে যেতেও সড়কটির বেশ গুরুত্ব রয়েছে। এ কারনে সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করছে হাজার হাজার মানুষ এবং যানবাহন। সকলেই প্রতিনিয়ত হচ্ছেন ভোগান্তির শিকার
বিসিসি’র প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় প্রতি বছরই এই সড়কটিতে সংস্কার কাজ হয়। সর্বশেষ রোজার ঈদের পূর্বে সড়কটি লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে সংস্কার করা হয়। বিসিসি’র অর্থায়নে নগরীর একটি প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সংস্কারের নামে নি¤œমানের কাজের মাধ্যমে উন্নয়নমুলক কাজের অর্থ হাতিয়ে নেয়। এর পূর্বে প্রায় দুই থেকে আড়াই বছর পূর্বে সড়কটি কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে পুন.নির্মান করা হয়েছিলো। কিন্তু নির্মানের তিন বছর না পেরুতেই কয়েক দফায় সংস্কার কাজ করতে হয়েছে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে। এমনকি নতুন করে সড়কটি সংস্কারের জন্য কাজ শুরু করতে যাচ্ছে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে দরপত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষে দেড় কোটি টাকা চুক্তিতে এক লেয়ার সড়ক নির্মান কাজের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে। বৃষ্টি মৌসুম অথবা পূর্নিমা গেলেই সড়কটির নির্মান কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন বিসিসি’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল মোতালেব হোসেন।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, শুধুমাত্র ফজলুল হক এভিনিউ সড়কটিই নয়, ভেঙ্গে-চুড়ে একাকার হয়ে আছে আমতলা সড়ক, ইসলামপাড়া সড়ক, সদর রোড, নিউ সদরঘাট সড়ক, পোর্ট রোড, ফকিরবাড়ি রোড, কালীবাড়ি রোড, মল্লিক রোড, মুসলিম গোরস্থান রোড, পুলিশ লাইনস্ রোড, দরগাবাড়ি রোড, ইছাকাঠি সড়ক, লুৎফর রহমান সড়ক, কাউনিয়া প্রধান সড়ক, কাশিপুর কলোনি সড়ক, কাশিপুর চৌমাথা সড়কসহ নতুন বাজার, ফজলুল হক এভিনিউ, পলাশপুর, আমানতগঞ্জ, বেলতলা অনেকটাই অচল হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি হলেই এসব সড়ক কাদা পানিতে একাকার হয়ে যায়। কোনো কোনো সড়কে বিটুমিন উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈদ উল ফিতরের কয়েক দিন পূর্বে জিলা স্কুলের মোড় থেকে জেল গেট পর্যন্ত সদর রোডের সংস্কার কাজ করে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। সে অনুযায়ী রাস্তাটির সংস্কার কাজের এক বছরও শেষ হয়নি। তার মধ্যেই নতুন এই রাস্তার উপর থেকে গুড়ি পাথর উঠে গিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই বিভিন্ন সময় মোটর সাইকেল সহ বিভিন্ন যানবাহন স্লিপ কেটে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। ওই রাস্তার সঙ্গে নির্মান কাজ করা হয়েছিলো জিলা স্কুল মোড় থেকে আমতলার মোড় পর্যন্ত সড়কটিরও। সেই রাস্তার একই অবস্থা। গুড়ি পাথর উঠে যাবার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া নগরীর প্রধান সড়ক বান্দ রোডের নির্মান কাজে অনিয়মের কারনে সেখানেও বিভিন্ন স্থান জুড়ে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে।
তাছাড়া নগরীর সদর গাল্স স্কুলের পেছন থেকে ফকিরবাড়ি সড়কটিও কাজ হয় মাত্র কয়েক মাস পূর্বে। ওই রাস্তাটি নির্মানের নামে ঠিকাদার পুরোটাই প্রতারনা করেছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ টেকসই উন্নয়ন না করে নামে মাত্র বালু এবং বিটুমিন ছিটিয়ে নির্মান কাজের নামে আই ওয়াশ দিয়েছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কাজের তদারকির দায়িত্বে বিসিসি’র সহকারী প্রকৌশলীগন থাকলেও তারাও রহস্যজনক কারনে এর কোন প্রতিবাদ করেনি। আর তাই ছয় মাস না যেতেই ফকিরবাড়ি সড়কটি পূর্বের অবস্থানে ফিরে গেছে। শুধু উল্লেখিত রাস্তাই নয়, নগরীর প্রায় প্রতিটি রাস্তায় সংস্কার কাজে বিসিসি’র দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সুষ্ঠু তদারকির অভাবে টেকশই উন্নয়ন হয়নি বলে দাবী সংশ্লিষ্টদের। আর তাই ভাঙ্গা-চুড়া রাস্তা থেকে সহসাই জনগনের দুর্ভোগ লাঘব হচ্ছে না বলে মন্তব্য নগরবাসীর।