সংসদ ও সিটি নির্বাচন ঘিরে বরিশালে মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় চার রাজনৈতিক দল

রুবেল খান ॥ সংসদ ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট, বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জোট, জাতীয় পার্টি ও ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনৈতিক কার্যক্রম সক্রিয় রয়েছে। নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কেন্দ্রের দিক নির্দেশনা ও দলের সাংগঠনিক অবস্থা আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে স্ব স্ব দলের নেতা-কর্মীরা। যা শুরু হয়েছে চলতি বছরের শুরু থেকেই। বর্তমানে বরিশালের ছয়টি আসনে তিনটি দলের সাংসদ রয়েছে। যার মধ্যে একটিতে জাতীয় পার্টি, একটিতে ওয়ার্কার্স পার্টি এবং বাকি চারটিতে আওয়ামী লীগ এর এমপি রয়েছেন। তবে আসন্ন নির্বাচনে আ’লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি ছয়টি আসনের প্রত্যেকটিতেই একক প্রার্থী দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করছেন। সে অনুযায়ী রাজনৈতিক কর্মকান্ড এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
অবশ্য বরিশালের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের প্রস্তুতি’র দিক থেকে অনেকটা সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে বিএনপি জোট। দফায় দফায় দলের তৃনমূল পর্যায়ে প্রস্তুতি সভা, কর্মী সভা, সাংগঠনিক সফর করছে দলটির নেতৃত্ব স্থানীয় নেতারা। অবশ্য সাংগঠনিক এই কর্মকান্ডকে শুধুমাত্র নির্বাচনের প্রস্তুতিই নয়, বরং সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবী বাস্তবায়নের আন্দোলন কর্মসূচির প্রস্তুতির অংশ হিসেবেও দেখছেন দলটির সিনিয়র পর্যায়ের নেতারা।
অপরদিকে আওয়ামী লীগও এগিয়ে চলছে সাংগঠনিক কর্মকান্ডের মধ্যে দিয়ে। তারাও সভা, সমাবেশ সহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচার প্রচারনা। বর্তমানে চলছে দলটির সদস্য সংগ্রহ কর্মসূচি। অবশ্য বিএনপিরও সারা দেশের ন্যায় বরিশালেও সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সূত্রমতে, আগামী ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে অনুযায়ী নির্বাচনের সময় অনেকটাই ঘনিয়ে এসেছে। তাই নির্বাচনে অংশগ্রহনের লক্ষ্যে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি অন্যান্য দলগুলোও সারা দেশে নির্বাচনী প্রচার প্রচারনা শুরু করে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যে দলের পক্ষে ভোটও চাইছেন। কেন্দ্রের রূপ রেখা অনুযায়ী তৃনমূল পর্যায়ে চালাচ্ছেন রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, চলতি বছরের শুরু থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো বরিশাল কেন্দ্রিক বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সর্বশেষ বড় ধরনের কর্মসূচি ছিলো দলের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কার্যক্রমের উদ্বোধন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের-এমপি প্রধান অতিথি হিসেবে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এখানে দলের জাতীয় পর্যায়ের অনেক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিষয় সদস্য সংগ্রহ এবং নবায়ন হলেও দলটির মূল উদ্দেশ্য ছিলো নির্বাচনের প্রস্তুতি। এই কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে জনগনের কাছে ভোট চেয়েছেন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের-এমপি।
এছাড়া আসন্ন জাতীয় সংসদ এবং সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ২৩ এপ্রিল কর্মী সভা করে মহানগর আওয়ামী লীগ। এর পরপরই কর্মী সভা করেছে জেলা আওয়ামী লীগ। সংগঠনের দুটি কমিটির কর্মী সভার আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু ছিলো সংসদ ও সিটি নির্বাচন। এর পরে গত আগস্ট মাস পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ। অবশ্য বরিশাল কেন্দ্রীক সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের দিকে এগিয়ে আছে সংসদের বাইরে থাকা দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে নিয়ে দফায় দফায় কর্মী সভা, প্রতিনিধি সভা সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে তারা। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বরিশাল জেলা ও মহানগর সহ তিনটি ইউনিটে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কর্মী ও প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তিনটি কর্মসূচিতেই মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি মূল দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও কর্মসূচিতে ছিলেন।
মহিলা দলের তিনটি ইউনিটের কর্মসূচিতেই উঠে আসে আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আলোচনা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবী বাস্তবায়নের বিষয়ে মহিলা দলের নেতা-কর্মীদের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। এর পূর্বে বরিশাল মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র তিনটি ইউনিটে কর্মী সভা অনুষ্ঠিত হয়। গত ৫ ও ৬ মে তিনটি ইউনিটের কর্মসূচিতেই প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপি’র মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানেও আলোচনার মুল বিষয় বস্তু ছিলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দলের শীর্ষ ওই নেতা নির্বাচনের প্রস্তুতি’র জন্য তৃনমুল নেতা-কর্মীদের দিয়েছেন বিভিন্ন দিক নির্দেশনা। শুধু বরিশাল জেলা ও মহানগর কেন্দ্রীক নয়, বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক ৮টি জেলায় পর্যায়ক্রমে কর্মী সভা করেছে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। প্রতিটি কর্মসূচির মুল লক্ষ্যই ছিলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এদিকে নির্বাচনের প্রস্তুতির দিকে থেকে পিছিয়ে নেই বর্তমানে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। বরিশাল জেলার সংসদীয় ৬টি আসনকে প্রার্থী নির্ধারনের পাশাপাশি তৃনমূল পর্যায়ে দলের রাজনীতি চাঙ্গা করতে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা। তাছাড়া বরিশালের তিনটি সংসদীয় আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে দায়িত্ব পেয়েছেন পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু। দায়িত্ব পেয়ে তিনি দলকে সু-সংগঠিত করতে বেশ কয়েকটি কর্মী সভাও করেছেন। এর লক্ষ্য ছিলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অবশ্য বরিশালে জাতীয় পার্টির কার্যক্রম বেশি বাকেরগঞ্জ উপজেলা কেন্দ্রীক। এর বাইরে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু’র নিজ এলাকায়ও জাতীয় পার্টির কর্মসূচি পালন হচ্ছে। কিন্তু মহানগর পর্যায়ে দলের তেমন কার্যক্রম নেই বললেই চলে। দলের মধ্যে কোন্দল-বিভাজনের কারনে মহানগরে জাতীয় পার্টির কর্মকান্ড স্থবির হয়ে আছে। অবশ্য ভেতরগত ভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতির কমতি নেই দলটির নেতৃবৃন্দের।
এদিকে নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রস্তুত বামপন্থি রাজনৈতিক সংগঠন ওয়ার্কার্স পার্টি’র বরিশাল জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। সম্প্রতি নগরীর অশ্বিনী কুমার টাউন হলে কর্মী সভা করেছে ওয়ার্কার্স পার্টি। যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এবং বেসাময়িক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন-এমপি। এই কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় অন্যান্য নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতৃবৃন্দও ছিলো। এই কর্মসূচির লক্ষও ছিলো আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দলটির সভাপতি ও মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন-এমপি স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার জন্য বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। ওয়ার্কার্স পার্টির পাশাপাশি মহাজোট সরকারের পক্ষে জনগনের কাছে ভোটও চেয়েছেন তিনি।
পার্টির সভাপতির ঘোষনা অনুযায়ী স্থানীয় নেতৃবৃন্দ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্রে দলটির তেমন কার্যক্রম লক্ষনিয় হচ্ছে না। শুধুমাত্র বাবুগঞ্জ উপজেলা কেন্দ্রীক দলটির কার্যক্রম সিমাবদ্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পার্টির সভাপতি’র নিজ এলাকা হওয়ায় বাবুগঞ্জ উপজেলা কেন্দ্রিক ওয়ার্কার্স পার্টির কার্যক্রম সংগঠিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর বাইরে বরিশালে জোট ও মহাজোটের সরিক দল নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও তাদের কোন প্রকার কার্যক্রম লক্ষনীয় হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি’র ব্যনারে সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাদের বক্তৃতার মঞ্চে ছাড়া দলের পৃথক ব্যানারে কর্মসূচি নেই বললেই চলে। তবে স্ব স্ব দলের পক্ষে নির্বাচনী প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ।