শ্রমিক ধর্মঘটে অচল সড়ক-মহাসড়ক ॥ সীমাহীন ভোগান্তিতে যাত্রীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বাস চালকের বিরুদ্ধে আদালতের দেয়া দন্ডাদেশ বাতিলের দাবীতে শ্রমিকদের ধর্মঘটের ফলে দিনভর সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে হাজার হাজার যাত্রীদের। কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে বরিশালের আভ্যন্তরিন এবং দূরপাল্লার সকল রুটে বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়। এমনকি ট্রাক সহ গনপরিবহন সড়ক-মহাসড়কে চলাচল করতে চাইলে তাতেও বাস শ্রমিকদের বাঁধা প্রদানের অভিযোগ উঠেছে। ফলে দুর-দুরান্ত থেকে আসা যাত্রীদের সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হতে দেখা গেছে। কেউ কেউ বিকল্প ব্যবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেও বেশিরভাগ যাত্রীকেই ফিরে যেতে দেখা গেছে।
সূত্রমতে, বাস চাপায় চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং সাংবাদিক মিশুক মনির সহ ৫ জনের মৃত্যুর ঘটনায় বাস চালক জসিম হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। আদালতের রায়ের পর পরই দন্ডাদেশ বাতিলের দাবীতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পরিবহন সেক্টরের শ্রমিকরা। এরই অংশ হিসেবে খুলনা অঞ্চলের ১০ রুটে পরিবহন ধর্মঘট পালন শুরু করে তারা। চলমান কর্মসূচির অংশ হিসেবে দন্ডিত বাস চালকের সাজা বাতিলের দাবীতে কেন্দ্রীয়ভাবে সারা দেশে যাত্রীবাহী পরিবহন এবং বাস ধর্মঘটের আহ্বান জানান। সে অনুযায়ী গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে দেশের অন্যান্য জেলার ন্যায় বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এবং রূপাতলী বাস টার্মিনাল সহ সড়ক এবং মহাসড়কে বাস ধর্মঘট শুরু করেন এখানকার শ্রমিকরা। তবে সকালে নথুল্লাবাদ থেকে দুরপাল্লার এবং আন্তঃজেলা এবং রূপাতলী থেকে শুধুমাত্র খুলনা রুটে বাস চলাচল বন্ধ ছিলো। যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা বিবেচনায় এনে সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত রূপাতলী থেকে অভ্যন্তরিন সকল রুটে মিনিবাস চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়। কিন্তু সাড়ে ৯টার পরে জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক নেতৃবৃন্দের চাপের মুখে রূপাতলী থেকে অভ্যন্তরিন রুট গুলোর বাস চলাচলও বন্ধ করে দেয়া হয়। পাশাপাশি নথুল্লাবাদ এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচিও পালন করে শ্রমিকরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে বাস ধর্মঘটের ফলে যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগের চিত্র। রিক্সা সহ গনপরিবহনে বাস টার্মিনালে আসলেও গন্তব্যে পৌছতে পারেনি। কেননা ঢাকা, খুলনা, যশোর, নড়াইল, বেনাপোল সহ দুরপাল্লার কোন রুটেই পরিবহন চলাচল করেনি। শুধু দুরপাল্লার নয়, অভ্যন্তরিন রুট গুলোতেও বাস চলাচল বন্ধ রাখায় স্কুল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী, চাকুরীজীবী সহ সর্বস্থরের মানুষের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ঘন্টার পর ঘন্টা বাস টার্মিনালে দাড়িয়ে থেকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে যাত্রীদের। ব্যাগ, লাগেজ সহ প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে বিপাকে পড়েন তারা। অবশ্য অনেক যাত্রী গনপরিবহনে বিশেষ করে মাহেন্দ্র, লেগুনা, গ্যাস চালিত অটোরিক্সা এবং ট্রাক যোগেও গন্তব্যে পৌঁছাবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেখানেও বাঁধা হয়ে দাড়াতে দেখা গেছে বাস শ্রমিকদের। তারা মাঝ পথে যাত্রী সহ গনপরিবহন চলাচলও বন্ধ করে দেয়। তবে ধর্মঘটের মধ্যে যাত্রীদের একমাত্র নির্ভরতা হিসেবে কাজ করেছে ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল। এক সাথে চার- থেকে পাঁচজন করে এক একটি মোটর সাইকেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যেতে হয়েছে যাত্রীদের। এমনকি শিশু সন্তান এবং মালামাল নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনতে দেখা গেছে বহু যাত্রীকে।
নগরীর নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালে যশোরের যাবার জন্য অপেক্ষা করা আলম নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, দু’দিন পূর্বে যশোরে যানবাহনের যন্ত্রাংশ ক্রয়ের জন্য টাকা পাঠিয়েছি। সোমবার গিয়ে সেই মালামাল ছাড়িয়ে আনার কথা। কিন্তু কাজের চাপে ওই দিন যেতে না পারায় গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে যশোরের উদ্দেশে ঢাকা থেকে রওয়ানা করেছি। কিন্তু নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালে এসে দেখি সকল প্রকার বাস চলাচল বন্ধ রেখে শ্রমিকরা আন্দোলন করছে। পরিবহনের টিকেট কাউন্টার থেকে কয়েকবার সময় দিয়েছে বাস ছাড়া এবং ধর্মঘট প্রত্যাহারের কথা বলে। সে অনুযায়ী চার বার প্রস্তুতি নিয়ে নথুল্লাবাদে এসেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস না ছাড়ায় যেতে পারিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্রী শারমিন সাবিহা মৌ বলেন, বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি শেষ হবে। তাই মঙ্গলবার ঢাকার উদ্দেশ্যে যাবার কথা ভেবেছিলাম। ঈগল বাসে আগাম টিকেটও কাটা। কিন্তু শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারনে শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, মাইক্রোবাস এবং মাহেন্দ্রতে অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে মাওয়া পর্যন্ত যাবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সেখানেও শ্রমিকরা বাঁধা দিয়েছেন। যে কারনে সড়ক পথে ঢাকায় যেতে বাঁধাগ্রস্থ হয়ে লঞ্চের ডেকে চেপে ঢাকার উদ্দেশে যেতে হয়েছে।
ধর্মঘট প্রসঙ্গে বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি আফতাব হোসেন বলেন, আমাদের শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধারন যাত্রীদের গন্তব্যে পৌছে দিচ্ছে। অথচ এখন আমাদের সেই যাত্রীর জীবন এবং সংসারের রুটি রুজির প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে। তাই বিষয়টি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করছি না। তাছাড়া এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি যে সিদ্ধান্ত জানাবেন সে অনুযায়ী আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহন করবো।