শেবাচিম হাসপাতালের কোটি টাকার ওষুধ কৌশলে পাঁচার

ওয়াহিদ রাসেল॥ বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে সিন্ডিকেটের দখলে সরকারী ওষুধ। সাধারন রোগীদের জন্য প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ওষুধ সরবরাহ হলেও তা পাচ্ছে না অসহায় রোগীরা। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তা চলে যাচ্ছে বহিরাগতদের হাতে। ফলে হাত বাড়ালেই হাসপাতাল এবং আশপাশের ফার্মেসী গুলোতে মিলছে সরকারী ওষুধ। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেও সুষ্ঠু নজরদারীর অভাবে সরকারী ওষুধ সিন্ডিকেটের হাতে চলে যাচ্ছে। এমন অভিযোগ সাধারন রোগীদের।
হাসপাতালের ওষুধ স্টোর থেকে পাওয়া তথ্য মতে প্রতি বছর রোগীদের জন্য কোটি কোটি টাকার ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। ডায়াবেটিস, শাপে কাটা রোগ, নিউমোনিয়া সহ গুরুত্বপূর্ণ রোগের বহু মূল্যমান ভ্যাক্সিন, গ্যাসটিকের ওমিপ্রাজল, এনটিবায়োটিক, এজিথ্রমাইসিন, সিফরোসিন, এ্যাজমাসল, আইভি ইনজেকশন এবং প্যাথেডিন ইনজেকশন সহ প্রায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে হাসপাতালে। কিন্তু এসব ওষুধ রোগীদের ভাগ্যে জোটছে না। রোগীরা ওষুধ না পেলেও প্রতিদিনের হিসেবে এসব ওষুধ বিতরণের হিসাব দেখাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এর হিসাবও দেখানো হচ্ছে যথাযথ নিয়মে। তবে তার মধ্যেই সূক্ষ্ম কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকার ওষুধ।
হাসপাতালের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র জানায়, প্রতিদিন গড়ে ২/৩ লক্ষ টাকার সরকারী ওষুধ বিভিন্ন মাধ্যমে বাহিরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। পাচারের কৌশল হিসেবে সূত্রগুলো জানান, ওষুধ স্টোরের ফার্মাসিস্ট এবং কর্মচারীরা নিজেরাই বিভিন্ন চিকিৎসক এর সিল বানিয়ে নিয়েছেন। যেগুলো ওষুধের সিলিপে ব্যবহার করে চিকিৎসকের স্বাক্ষও জাল করে ওষুধ নিজেদের পকেটে নিয়ে নিচ্ছেন। এর পাশাপাশি হাসপাতালের অন্যান্য কর্মচারীরাও একই পদ্ধতিতে স্টোর থেকে ওষুধ পাচার করছেন।
শুধু তাই নয়, প্রতিদিন হাসপাতালে সহস্রাধিক ভর্তি রোগীদের চাহিদা দেখিয়ে নার্সিং ইনচার্জরা ওষুধ ইনডেক্স করে নিচ্ছেন। কিন্তু সেই ওষুধ আবার চিকিৎসকের মাধ্যমে বাইরের ফার্মেসী দিয়ে কেনাচ্ছেন নার্সরা। তবে রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী যে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে তা চলে যাচ্ছে নার্সদের ঘরে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নার্সরা রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ তাদের ঘনিষ্ট বহিরাগত আয়া এবং চুক্তি ভিত্তিক কর্মচারীদের দিয়ে বাইরে পাচার করছে। বাজারের ব্যাগ, পার্স ব্যাগ, ময়লা আবর্জনা ভর্তি ট্রলির বাক্সে এবং খাবারের বাটিতে প্রতিনিয়ন পাঁচার হচ্ছে সরকারী ওষুধ। সিকিউরিটি ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় নির্বিঘেœই এসব ওষুধ পাচার করা সম্ভব হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, বেশিরভাগ ওষুধ পাচার হচ্ছে গভির রাত থেকে ভোর রাত পর্যন্ত। রাত্রিকালীন দায়িত্বে থাকা নার্স, ফার্মাসিস্ট এবং চতুর্থ শ্রেনী কর্মচারীরা নির্জন রাতে তাদের নিজস্ব লোক দিয়ে ওষুধ হাসপাতালের বাইরে পাচার করছে। ফজরের আজান দেয়া মাত্রই হাসপাতালের প্রধান ফটক এবং জরুরী বিভাগের ফটকে দাড়ালেই দেখা যায় কর্মচারীদের হাতে ব্যাগ বোঝাই ওষুধ। তবে ওষুধের উপরে রাখা হচ্ছে নিজেদের জামা কাপড় কিংবা বিভিন্ন খাবার। যা দেখে বোঝার কোন উপায় নেই ভেতরে চোরাই ওষুধ না অন্যকিছু রয়েছে।
এ পাচারের সাথ্যে হাসপাতালের চিহ্নিত কিছু নার্স এবং ফার্মাসিস্ট রয়েছে। তার মধ্যে হাসপাতালের ফার্মেসীর ইনচার্জ হাবিবুর রহমান, ফার্মাসিস্ট লিটন, স্টোর অফিসার ডা. গোলাম মোস্তফার নাম সবার আগে আলোচনায় উঠে আসছে। এর মধ্যে প্রধান ফার্মাসিস্ট হাবিব হাসপাতালের বহিরাগত আনিস খান নামে এক দালালের মাধ্যমে প্রতি রাতে, দুপুরে এবং সকালে ওষুধ পাচার করছেন। এসব করে সরকারী ওষুধ চোরা কারবারি হাবিব কোটিপতি বনে গেছেন। অবৈধ অর্থে তিনি গড়ে তুলেছেন গার্মেন্টস, বস্্রালয়, জমি জমা এবং অট্রালিকা সহ কোটি টাকার সম্পদ। তার আশির্বাদে দালাল আনিছও পরিবার পরিজন নিয়ে বেশ ভালো সময় পার করছে।
এদিকে সরকারী ফার্মেসী ছাড়াও অপারেশন থিয়েটার থেকেও পাচার হচ্ছে সরকারী ওষুধ। প্রতিটি ওটির ইনচার্জ এবং র্দীঘ দিন যাবত ওটিতে দায়িত্বে থাকা চতুর্থ শ্রেনী কর্মচারিরা সরকারী ওষুধ বিক্রির রাম রাজত্ব তৈরী করেছে ওটি কমপ্লেক্সে। এছাড়া রোগীদেও জন্য বরাদ্দ প্যাথেডিন প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে মাদক গ্রহন কারীদের কাছে। বেশি কিছুদিন পূর্বে প্যাথেডিন বিক্রি করতে গিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলো হিরন নামের এক চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীকে। কিন্তু মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে সে দফায় পাড় পেয়ে যায় হিরন এবং তার সহযোগিরা। তবে এর পরেও বন্ধ হয়নি তার প্যাথেডিন এমনকি সরকারী ওষুধ পাচার। তার পরেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ওষুধ পার রোধে নেয়া হচ্ছে না কোন কার্যকরী পদক্ষেপ। ফলে সরকারী ওষুধ চুরির ধারাবাহিকতা দিন দিন বেড়েই চলছে বলে অভিযোগ রোগী এবং তাদের স্বজনদের।