শেবাচিম থেকে উদ্ধারকৃত ওষুধের মূল্য নিয়ে বিভ্রান্তি পরিচালকের দাবী ১৫ লাখের বেশি ॥ বাজার মূল্য অর্ধ কোটি ॥ তালিকায় নেই উদ্ধার হওয়া ট্যাবলেট-ক্যাপসুল

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ড থেকে উদ্ধারকৃত সরকারি ওষুধের ধরন ২১ প্রকার। এর সরকারি মূল্য ১৫ লাখ টাকার বেশি হবে। গতকাল রোববার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন হাসপাতাল পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসলাম। তবে বাজার দর অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া ওষুধের মূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
এদিকে শনিবার ওষুধ উদ্ধারের ঘটনায় আটক নার্সিং ইন-চার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স বিলকিস বেগমকে গত শুক্রবার পুকুর থেকে ওষুধ উদ্ধারের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরন করা হয়েছে। একই সাথে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা। এদিকে বিলকিছ বেগমের জামিন আবেদন না-মঞ্জুর করে জেল হাজতে প্রেরনের নির্দেশ দিয়েছেন।
এর পূর্বে দুপুরে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসরাম সাংবাদিকদের জানান, মোট ২০ প্রকারের ইনজেকশন সহ ২২ প্রকারের চিকিৎসা সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ড থেকে। এগুলো নিয়ম বর্হিভূত ভাবে ওয়ার্ডের ইনচার্জ বিলকিস বেগম জমিয়ে রেখেছিলো। উদ্ধার হওয়া ওষুধের মধ্যে রয়েছে, ওমিপ্রাজল এক হাজার ১শ পিস, কিটোরোলাক-৬০ মিলি গ্রাম ৬৭০ পিস, ক্লামক্স ১.২ গ্রাম ৮৭৪ পিস, ডেক্সোমেথাসন ২১ হাজার ২শ পিস, এট্রোপিন ৯শ পিস, ১০ পার্সেন্ট ডিএ স্যালাইন ১০৮ পিস, সেফট্রিক্সন ১ মিলিগ্রাম ২ হাজার ৩১২ পিস, সিপ্রোফ্লোক্সাসিন ৪০ পিস, মোস্কাসিলিন ২৩৯ পিস, হ্যালোপিড ১০ পিস, কটসন ৩ হাজার ১শ পিস, মেট্রোনিডাজর ১৮০ পিস, হাউড্রোকটিসন ৭৪০ পিস, ১০ পার্সেন্ট ডিএ ১০৮ পিস, ২০ পার্সেন্ট ডিএ ৯৬ পিস, সেফট্রিক্সন ২ মিলিগ্রাম ৩ হাজার ১৮০ পিস, ফ্লুক্লোক্স ১০০ পিস, ডাইক্লোফেন ১০০ পিস, রেনিডিট ১০০ পিস ও উনডাল ২৫ পিস। এগুলো সবই ইনজেকশন। এছাড়া হ্যান্ড গ্লাভ্স ১১ পিস এবং স্যাভলনও রয়েছে বিপুল পরিমান। এর বাইরে ট্যাবলেট এবং ক্যাপ্সুল উদ্ধার হলেও তার পরিসংখ্যান জানা যায়নি।
এদিকে উদ্ধার হওয়া ওষুধের সরকারি মূল্য ১৫ লাখের বেশি হবে বলে পরিচালক দাবী করেছেন। কিন্তু বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী ওই ওষুধের মূল্য অর্ধ কোটি টাকা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে দেয়া উদ্ধারকৃত ওষুধের তালিকা অনুসন্ধান করে এমন তথ্যই জানা গেছে। যার মধ্যে ওমিপ্রাজল এক হাজার ১শ পিস এর মূল্য ৯০ হাজার টাকা, কিটোরোলাক-৬০ মিলি গ্রাম ৬৭০ পিস এর মূল্য ৬০ হাজার ৩০০ টাকা, ক্লামক্স ১.২ গ্রাম ৮৭৪ পিস ইনজেকশন এর মূল্য ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৫০ টাকা, ডেক্সোমেথাসন ২১ হাজার ২শ পিস এর মূল্য ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৪০০ টাকা, এট্রোপিন ৯শ পিস এর মূল্য ২৭ হাজার, সেফট্রিক্সন ১ মিলিগ্রাম ২ হাজার ৩১২ পিস এর মূল্য ৪ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ টাকা, সিপ্রোফ্লোক্সাসিন ৪০ পিস এর মূল্য ২ হাজার ৮০০ টাকা, মোস্কাসিলিন ২৩৯ পিস এর মূল্য ২ লাখ ১২ হাজার ২৩২ টাকা, কটসন ৩ হাজার ১শ পিস এর মূল্য ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, মেট্রোনিডাজর ১৮০ পিস এর মূল্য ৯ হাজার ৫৪০ টাকা, হাউড্রোকটিসন ৭৪০ পিস এর পাইকারী মূল্য ৩৭ হাজার টাকা। এছাড়া অন্যান্য ওষুধের মূল্যও রয়েছে ব্যাপক। তবে তাৎক্ষনিক ভাবে এগুলোর মূল্য জানা যায়নি। বর্তমান বাজার মূল্য বেশি হলেও সরকারি ভ্যাট-ট্যাক্স বাদ দিয়ে উদ্ধার হওয়া ওষুধের মুল্য দাড়ায় প্রায় ৩০ লাখের বেশি। অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবী করেছেন এর মূল্য ১৫ লাখের বেশির। এর পরে বিভিন্ন দামী ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, চিকিৎসা সামগ্রীর মূল্য কিংবা পরিসংখ্যান সাংবাদিকদের জানাননি কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসলাম বলেন, পুকুর থেকে ভাসমান অবস্থা থেকে এবং চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী সেফালীর বাসা থেকে ওষুধ উদ্ধারের পরে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছিলো। এর মধ্যে স্টোরের তদন্তে দুটি এবং ওয়ার্ডে ইন্ডেন্টকৃত ওষুধ বন্টনের বিষয়ে অপর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে ওষুধের স্টোরে তদন্তের জন্য গঠিত দুটি তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এতে স্টোরে কোন অনিয়ম ধরা পড়েনি। তাছাড়া যেসব ওষুধ উদ্ধার করা হয়েছে তা ২০১৬ সারের আগস্ট মাসে সরবরাহকৃত। এগুলো একই বছরের নভেম্বরে স্টোর থেকে রোগীদের জন্য ইন্ডেন্ট দেয়া সম্পন্ন হয়েছে।
পরিচালক বলেন, রোগীদের জন্য ওষুধ ইন্ডেন্ট দেয়ার পরে তা রোগীরা ভালো ভাবে পাচ্ছে কিনা তা দেখভালের জন্য মিডলেভেল চিকিৎসকদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই দায়িত্ব পালনে মিডলেভেল চিকিৎসকদের অবহেলা রয়েছে। তারা এই কাজটি সঠিক ভাবে পালন করেনি। পরবর্তীতে যাতে এমন অনিয়ম কিংবা ওষুধ চুরির ঘটনা না ঘটে সে জন্য আমাদের চেইন অব কমান্ডকে আরো ঢেলে সাজাতে হবে। পাশাপাশি প্রতি মাসে অন্তত একবার করে হাসপাতালের ওয়ার্ড গুলোতে তল্লাশি করা হবে। রোগীরা সঠিক ভাবে ওষুধ পায় কিনা, সে বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হবে। তাছাড়া পুলিশ তাইলে যে কোন সময় হাসপাতালের ওয়ার্ড গুলোতে এ ধরনের অভিযান চালাতে পারবে। এ বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে পুলিশকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া নার্সিং ইনচার্জ বিলকিস জাহানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের কোন ইখতিয়ার আমাদের নেই। কেননা তিনি আমাদের অধিদপ্তরের অধিনে নয়। তার বিরুদ্ধে ব্যস্থা গ্রহন করবে সেবা পরিদপ্তর। তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য আমরা ডিজি হেল্থকে চিঠি প্রেরন করবো। তারা আন্তঃদপ্তরের মাধ্যমে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করলে করতে পারে। তবে চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী শেফালীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে।
এদিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সাইফুল্লাহ মো. নাসির বলেন, গত শুক্রবার পুকুরে ওষুধ উদ্ধারের ঘটনায় আটক হওয়া কর্মচারী সেফালী বেগম এর দেয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হাসপাতালের ওয়ার্ডে তল্লাশি অভিযান চালান তারা। এসময় বিপুল পরিমান ওষুধ সহ ওয়ার্ডের ইনচার্জ বিলকিস বেগমকে গ্রেপ্তার করেন। গতকাল রোববার সকালে সেফালী বেগম ও তার ছেলে মামুনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় বিলকিসকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আদালতের কাছে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। তিনি আরো বলেন, আমাদের অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনে হাসপাতালের অন্যান্য ওয়ার্ড এবং কর্মচারীদের বাড়ি ঘরেও অভিযান পরিচালনা করা হবে।