শেবাচিমে মেঝে-বারান্দায় চিকিৎসা নেয় সহস্রাধিক রোগী

রুবেল খান ॥ বিশেষজ্ঞ জেষ্ঠ্য চিকিৎসক ও বিভাগীয় প্রধানদের অসহযোগিতা আর অতিরিক্ত রোগীর চাপের ফলে ধুকছে শেবাচিম হাসপাতাল’র চিকিৎসা সেবা। রোগীর চাপ সামলাতে ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি কাগজে কলমে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হলেও বাড়েনি সেবার মান। এর মধ্যেই প্রতিদিন গড়ে তিনগুনের বেশি রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা গ্রহন করছে হাসপাতালটিতে। ফলে শয্যা তো দুরের কথা ওয়ার্ডের মেঝেতেও জায়গা হচ্ছে না রোগীদের। চলতি বর্ষা মৌসুমেও চিকিৎসার স্বার্থে বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে রোগীদের। বছর জুড়েই হাসপাতালের প্রসূতী, মহিলা সার্জারী, মহিলা মেডিসিন ও অর্থপেডিক্স ওয়ার্ডে থাকে ভয়াবহ অবস্থা।

তবে এর ব্যতিক্রম চিত্রও রয়েছে শেবাচিম হাসপাতালে। বিশাল ওয়ার্ড জুড়ে বিছানো শয্যায় ১০ থেকে ২০ জন রোগী রয়েছে। বাকিগুলো পড়ে থাকতে শূণ্য অবস্থায়। সপ্তাহের চারদিনই এমন চিত্র দেখা যায় হাসপাতালের পুরুষদের চক্ষু, ইএনটি এবং মেডিসিন ওয়ার্ডগুলোতে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওয়ার্ডগুলো নারীদের জন্য পুনঃবিন্যাসের চেষ্টা করলেও তাতে প্রধান বাঁধা হয়ে আছেন বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রফেসররা। ফলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় এবং গরীব রোগীদের ভোগান্তিও পিছু ছাড়ছে না।

সরেজমিনে গতকাল শনিবার বেলা ১২টায় শেবাচিম কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ তলায় অবস্থিত নারীদের জন্য একমাত্র মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় পুরো ওয়ার্ড কানায় কানায় পূর্ণ। রোগীর ভিড়ে তিল ধারনের ঠাঁই নেই ওয়ার্ডটিতে। শয্যা পরিপুর্ণ হয়ে ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা ও চতুর্থ তলার মেঝেতে রেখে রোগিদের একেবারে উন্মুক্ত স্থানে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কারন ৩২ শয্যার ওই ওয়ার্ডটিতে গতকাল চিকিৎসাধীন রোগী ছিল দেড়শ’র বেশি। এর পাশেই ছোট ছোট দুটি কক্ষে চতুর্থ শ্রেণির স্টাফ এবং নার্সিং শিক্ষার্থীদের জন্য দুটি রুম রয়েছে। যেখানে ৩টি করে শয্যার বিপরীতে রোগী থাকছেন ৫ জনেরও বেশি।

একই চিত্র দেখা গেছে হাসপাতালের প্রসুতী এবং গাইনী ওয়ার্ডে। প্রসুতী ওয়ার্ডে অনুমোদিত ৬০টি বেডের বিপরীতে রয়েছে দুই শতাধিক রোগী। একই সংখ্যক রোগী রয়েছে ৬০ শয্যার গাইনী ওয়ার্ডে। এ দুটি ওয়ার্ডের শয্যা পূর্ণ হয়ে মেঝে, বারান্দা ও সামনের করিডোরের মেঝেতেও রোগিতে পরিপূর্ণ। এরপরও ভর্তি হচ্ছে নতুন রোগী।

হাসপাতালের পুরুষ অর্থপেডিক্স ওয়ার্ডের চিত্রও একই। এখানে বরাদ্দকৃত ২২টি শয্যার বিপরীতে রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে শতাধিক। মেঝে এবং ওয়ার্ডে প্রবেশের পথে বারান্দাতেও রোগীদের ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বারান্দার রোগীরা বৃষ্টিতে ভিজছেন আবার রোদে শুকাচ্ছেন।

এদিকে মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের পার্শ্বেই রয়েছে পুরুষ মেডিসিন (ইউনিট-৪) ওয়ার্ড। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে পুরো ভিন্ন চিত্র। ওয়ার্ডটিতে বরাদ্দকৃত ৩৩টি সাধারন ও ১২টি পেয়িং এবং বাড়তি আরো ১৪ বেডসহ মোট ৫৯ বেড রয়েছে। কিন্তু এর অধিকাংশই রোগী শূণ্য অবস্থায় পড়ে আছে। এ ওয়ার্ডটির পাশে চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি ও বাড়তি ১০টি সহ মোট ২২টি বেডের একটি সিক রুম রয়েছে। যা পুরোপুরি শূণ্য রয়েছে। মাসের মধ্যে এক থেকে দেড় সপ্তাহ দু-একজন রোগী থাকে। বাকি সময় শূন্য পড়ে থাকে।

হাসপাতালের চতুর্থ তলায় চক্ষু বিভাগে গিয়ে দেখা যায় তিন চারটি বেডে কয়েকজন লোক ঘুমাচ্ছেন। তারা সকলেই হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এরপর ওই ওয়ার্ডের পেয়িং বেডে গিয়ে দেখা যায় ৩ জন রোগি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সাথে আসা স্বজনরা পার্শ্ববর্তী বেডে ঘুমাচ্ছেন। এ ওয়ার্ডের ইনচার্য সিমা বেগম বলেন, ওয়ার্ডটিতে বরাদ্দকৃত বেড (সাধারন) ৪৪টি। আরো ২০টি বেড রয়েছে। পেয়িং বেড রয়েছে ১০টি। এখানে সব সময় রোগীর সংখ্যা শয্যার তুলনায় অনেক কম থাকে বলে জানিয়েছেন তিনি।

পাশের নাক, কান, গলা বিভাগ। এখানে ২৪ বেডের অর্ধেক শূন্য পড়ে আছে। যেগুলো পূর্ণ তার অনেকটিতে রোগির স্বজনরাও রয়েছেন। এছাড়া ১০টি পেয়িং বেড শুণ্য পরে আছে। হাসপাতালের দন্ত বিভাগটি একেবারেই ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখা যায়। শিশু বিভাগে ৬৭শয্যার বিপরীতে রোগীর সংখ্যা ছিলো দুই শতাধিক। এক একটি বেডে দুই থেকে তিনজন করে শিশুকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। অনেক শিশুকে রাখা হয়েছে মেঝেতে।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. এস এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত ৫০০ রোগির জায়গা দিতে হয় ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা ও বাইরের মেঝেতে। মেডিসিন, লেবার ও গাইনী বিভাগসহ ৪/৫টি বিভাগে রোগির চাপ এতো বেশী থাকে যা সামাল দিতে হিমশিম খেরেত হয়। তবে অনেক ওয়ার্ড শুন্য থাকে। আমরা পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে ফিমেল মেডিসিন এর কিছু রোগি রাখতে চেয়েছিলাম। তবে তাতে ওই ওয়ার্ডের প্রফেসররা বাধা দিচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন, চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের দখলে থাকা সিকরুম উদ্ধার করার চেস্টা চালাচ্ছি। রাজনৈতিক চাপের কারনে তা সম্ভব হচ্ছে না। তবে নির্মানাধীন হাসপাতালের ৫ তলা অপর ভবনটির কাজ শেষ করা গেলে রোগীদের আর মেঝেতে থাকতে হবে না।