শেবাচিমে থ্রি পার্সেন্ট সোডিয়াম স্যালাইন নিয়ে স্টোর ইনচার্জ নির্মলের কারসাজি

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ওষুধ চুরির মহা কেলেংকারী ফাঁস হওয়ার পরেও বন্ধ হয়নি শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে ওষুধ চুরি। এখনো হরহামেশাই হাসপাতালের স্টোর থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পাচার হচ্ছে মূল্যবান ওষুধ। যা অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে হাসপাতালের বাইরে বিভিন্ন ফার্মেসীতে। বিশেষ করে রোগীদের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ন থ্রি-পার্সেন্ট সোডিয়াম স্যালাইন নিয়ে সিন্ডিকেটে মেতেছে শেবাচিম হাসপাতালের সাব স্টোরের একটি চক্র। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্টোরের ইনচার্জ এর দায়িত্বে থাকা ফার্মাসিস্ট নির্মল। যিনি সুখ্য কারসাজির মাধ্যমে স্টোরের সাবেক ফার্মাসিস্ট শিশির ও লিটনকে ওষুধ চুরির ফাঁদে ফেলে নিজের আয়ত্বে নিয়ে নিয়েছেন হাসপাতালের মেডিসিন সাব স্টোর। ওই দু’জনকে সরিয়ে অবৈধভাবে কন্ট্রাক্ট সার্ভিসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া নারী ও পুরুষ ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের নিয়ে ওষুধ চোরাই চক্র পরিচালনা করছেন বলে ফার্মাসিস্ট নির্মল এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, থ্রি-পার্সেন্ট সোডিয়াম ক্লোরাইড নামক স্যালাইনটি মানব দেহের চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ন অংশ। দাম তেমন বেশি না হলেও স্যালাইনটি উৎপাদনের অনুমতি নেই বেসরকারি কোম্পানিগুলোতে। শুধুমাত্র সরকারিভাবে উৎপাদিত স্যালাইনটি চাহিদা অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ হয়ে থাকে। যে কারনে হাসপাতাল ছাড়া বাইরে কোন ফার্মেসীতে অহরহ পাওয়া যাচ্ছেন না গুরুত্বপূর্ণ এই স্যালাইনটি। হাতে গোনা কয়েকটি ফার্মেসীতে স্যালাইনটি গোপনে বিক্রি করা হলেও তার মূল্য রাখা হচ্ছে সর্বনি¤œ পনের শ থেকে দুই হাজার টাকা। বাস্তবে এর মূল্য সত্তর টাকার মধ্যে।
এদিকে বেসরকারিভাবে ওষুধ উৎপাদন না হলেও নগরীর বৃহত্তর শেবাচিম হাসপাতালের সামনে, সদর রোড সহ কয়েকটি স্থানে অনেক ফার্মেসীতেই পাওয়া যাচ্ছে স্যালাইনটি। তবে চাহিবা মাত্রই পাওয়া যাচ্ছে না। নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চোরাই ভাবে থ্রি-পার্সেন্ট সোডিয়াম ক্লোরাইড স্যালাইনটি বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। চোরাইভাবে স্যালাইন বিক্রি করা এমন কয়েকটি ফাঁমেসীর মালিক পক্ষের সাথে আলাপ কালে বেরিয়ে আসে সরকারি স্যালাইন ফার্মেসীতে বিক্রির মূল রহস্য। নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে এবং প্রশাসনিক হয়রানির ভয়ে নিজেদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেবাচিম হাসপাতালের সামনে দুটি ফার্মেসীর মালিক এবং কর্মচারীরা জানিয়েছেন, যেহেতু সরকারি হাসপাতালে স্যালাইনটি সরবরাহ হচ্ছে সেহেতু সেখান থেকেই স্যালাইন গুলো ফার্মেসীতে আসছে। ওষুধ স্টোরের দায়িত্বে থাকা স্টাফরাই কৌশলে চোরাই পথে ওষুধগুলো ফার্মেসীতে পৌছে দিচ্ছেন। স্যালাইনগুলো ফার্মেসীতে রেখে নয়, বাসায় কিংবা গোপন কোন স্থানে মজুদ রেখে তা ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে থাকেন তারা।
ব্যবসায়ীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরো বলেন, ইতিপূর্বে শেবাচিম হাসপাতালের মেডিসিন সাব স্টোরের দায়িত্বে থাকা ফার্মাসিস্ট শিশির এর মাধ্যমে সোডিয়াম ক্লোরাইড স্যালানটি পেতেন তারা। কিন্তু ওষুধ চুরির বিষয়টি ফাঁস হয়ে সে সহ দুই ফার্মাসিস্ট সাময়িক ভাবে বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন। যে কারনে কিছুদিন তারাও স্যালাইনটি পাননি। তবে মাস দুই ধরে পূর্বের মত করেই শেবাচিমের মেডিসিন সাব স্টোর হতে স্যালাইনগুলো তাদের ফার্মেসীতে পৌছে দেয়া হচ্ছে। পূর্বের কেউ নয়, মেডিসিনের সাব স্টোরে নতুন করে দায়িত্ব পাওয়া ফার্মাস্টি নির্মল তার লোক দিয়ে ফার্মেসীতে এই স্যালাইন পৌছে দিচ্ছেন। শুধুমাত্র সোডিয়াম ক্লোরাইড স্যালাইনই নয়, অন্যান্য মুল্যবান ওষুধও তার মাধ্যমেই পেয়ে থাকেন বলে জানিয়েছেন ফার্মেসীর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
হাসপাতালের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, মেডিসিন সাব স্টোরে আইএইচটি থেকে পাশ করা কয়েজন ডিপ্লোমা ফার্মাসীস্ট অবৈতনিকভাবে স্টোরে দায়িত্ব পালন করছে। তাদের নিয়েই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন ফার্মাসিস্ট নির্মল। আর তাই বেতন-ভাতা না পাওয়া সত্ত্বেও স্টোরে দিনের পর দিন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন অবৈতনিক ফার্মাসিস্টগন। যাদের মধ্যে চোরাই সিন্ডিকেটের সাথে চুক্তি ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের নিশি নামে এক তরুনীর নাম শোনা যাচ্ছে। অবশ্য সাংবাদিক কিংবা প্রশাসনিক কেউ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অতি জরুরী ভিত্তিতে বিশেষ প্রয়োজনে ওষুধ আনতে গেলে বিভিন্ন নিয়ম এবং বিধি নিষেধের বেড়াজালে ফেলে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এমনই একটি ঘটনা গতকাল শনিবার দুপুর দুইটার দিকে হাসপাতালের সাব স্টোরে ঘটেছে। প্রধান স্টোরে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকে জানানো হয় সাব স্টোরের ফার্মাসিস্ট নির্মল স্বাক্ষর করে দিলেই তারা সোডিয়াম স্যালাইন দিতে পারবেন। কিন্তু নির্মলের কাছে গেলে তিনি ফিরিয়ে দেন রোগীর স্বজনদের। উল্টো নিয়ম কানুনের ফাইলে আটকে দিয়ে বলেন, আমার কাছে মানবিকতার কোন গুরুত্ব নেই। শুধু মুমূর্ষ রোগীই নয়, সব কিছু ধুলিস্যাৎ হয়ে গেলেও স্যালাইন দেয়া যাবে না। “আপনারা পারলে কিছু করেন আমি কিন্তু ভোলা থ্যাইক্যা আসিনাই”। অবশ্য এসব বলে রোষানলে পড়তে হয় নির্মলকে। যে কারনে তড়িঘড়ি করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন ওষুধ চুরির হোতা নির্মল। বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষনিকভাবে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. আব্দুল কাদির এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন না ধরায় বিষয়টি নিয়ে তার মতামত যানা যায়নি।