শেবাচিমে চিকিৎসক নেই ॥ মারা যাচ্ছে কিডনী রোগে আক্রান্তরা

রুবেল খান ॥ চোখ জুড়ানো ডেকোরেশন, দুটি এয়ার কন্ডিশন, রয়েছে পুরুষ ও নারীদের জন্য ৮টি বেডের ব্যবস্থা। কিডনী রোগীদের ডায়ালসিস এর জন্য রয়েছে দুটি বিদেশী হেমোডায়ালসিস মেশিন। ব্যয়বহুল ডায়ালসিস এর জন্য সকল আয়োজনই রয়েছে বিভাগটিতে। কিন্তু নেই শুধু চিকিৎসক। যে কারণে চালু হওয়ার চার বছর পর থেকেই বন্ধ হয়ে আছে শেবাচিম তথা দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র কিডনী বিভাগটি। এদিকে বিভাগটি দেখভাল এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রয়েছেন একজন নার্সিং ইনচার্জ। কাজ না থাকায় তাকে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে অন্য ওয়ার্ডে। ওয়ার্ডের প্রবেশদ্বারে ছিলো ওয়ার্ড পরিচিতির জন্য একটি সাইন বোর্ড। তাও মাস ছয়েক পূর্বে খুলে ফেলা হয়েছে। তাই কিডনী বিভাগটি থেকেও না থাকায় পরিনত হয়েছে। সরকারি সবরকম সুযোগ-সুবিধা থাকা স্বত্ত্বেও দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার কিডনী রোগীরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কিডনী বিভাগের ইনচার্জ সেবিকা নাসিমা মমতাজ জানান, ১৯৯৮ সালে শেবাচিম হাসপাতালে ওয়ার্ডটির কার্যক্রম শুরু হয়। ৮টি শয্যা নিয়ে চালু হওয়া ওয়ার্ডটি পর্যায়ক্রমে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কিডনী ওয়ার্ডে রূপান্তর করার কথা ছিলো। কিন্তু চিকিৎসক না থাকার কারণে পূর্ণতা পাবার আগেই বন্ধ হয়ে যায় বিভাগটি। প্রথমত কিডনী রোগীদের পেরিটনিয়াল (পেট কেটে) ডায়ালসিস করা হত। পরবর্তীতে বিভাগটিতে আধুনিকতার ছোয়া লাগে। ওয়ার্ডটিতে সংযোজন করা হয় প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের দুটি হেমডায়ালসিস মেশিন। স্থাপনের পরে সরবরাহকারী কোম্পানি মেশিনটি একবার ইনস্টল করেন। কিন্তু এর পরে আর সেটি চালু করে দেখা হয়নি। কিডনী ওয়ার্ডের ভেতরে চার দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে মেশিন দুটিকে। ব্যবহার না করায় মেশিন দুটি এখন সচল নাকি অচল অবস্থায় রয়েছে তাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।
ইনচার্জ বলেন, শুরু থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ন্যাফ্রোলজিষ্ট প্রফেসর জাহাঙ্গীর হোসেন, ডা. সোহাইল আহমেদ, ডা. সামিম আহমেদ, ডা. বিধান ও ডা. আবুল কাশেদ দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ আবুল কাশেদ দেড় বছর এই হাসপাতালে কিডনী রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন। বাকিরা সর্বনি¤œ এক সপ্তাহ থেকে সর্বোচ্চ ৪ মাস পর্যন্ত থেকে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। সর্বশেষ ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিভাগটির দায়িত্বে ছিলেন সহকারী রেজিষ্ট্রার ডা. সালাউদ্দিন। তিনি বরিশাল থেকে বদলি হবার পরে ওই বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে কিডনী বিভাগটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হওয়ার পূর্বে ২০০৪ সালের ১১ জুলাই পর্যন্ত ওয়ার্ডটিতে চিকিৎসা সেবা গ্রহন করেন প্রায় পাঁচশ’র মত রোগী। সর্বশেষ বিভাগটিতে চিকিৎসা গ্রহন করেন রুহুল আমিন নামের এক রোগী।
ইনচার্জ আরো বলেন, ক্যান্সারের রোগী থাকলেও মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকরা তাদেরকে কিডনী বিভাগে প্রেরন না করে নিজেদের স্বার্থে রোগীদের লাখ লাখ টাকা খরচ করাচ্ছেন। রোগী না থাকার কারনে এখানে আসা চিকিৎসক পুনরায় বদলি হয়ে চলে যাচ্ছেন। তবে এক সময় তার পিড়াপিড়ির কারনে প্রফেসর ডা. গোলাম মাহমুদ সেলিম, ডা. হুমায়ুন কবির, ডা. আব্দুল লতিফ এবং ডা. সেলিম বিভাগটি সচল রাখার জন্য কিডনী রোগীদের বিভাগে প্রেরন করতেন। কিন্তু তারা বদলি এবং অবসরে যাওয়ায় অন্য কোন চিকিৎসক কিডনী বিভাগটির প্রতি গুরুত্ব দেয়নি। বরং বর্তমানে একজন ইউনিট প্রধান তার ব্যবহারের জন্য কিডনী ওয়ার্ডটি দাবী করেন। কিন্তু পরিচালক তার সেই দাবীতে সায় দেননি।
ইনচার্জ বলেন, বরিশালবাসীর জন্য কিডনী বিভাগটি অত্যন্ত জরুরী। কেননা এখানে রোগীদের ডায়ালসিস এর জন্য সকল ব্যয় বহন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বাইরে করতে গেলে এর খরচ আরো বেশি। যা বহন করতে হয় রোগীদের। বরিশালে বেসরকারি মমতা কিডনী ডায়ালাসিস সেন্টার রয়েছে। যার মালিক এই হাসপাতালের চিকিৎসকরা। ৭টি মেশিনের মাধ্যমে সেখানে রোগীদের ডায়ালসিস করানো হয়। কিন্তু তার পরেও রোগীদের চাপ সামলাতে পারছে না সেখানকার কর্তৃপক্ষ। এই নার্সিং কর্মকর্তার দাবী চিকিৎসক না থাকা এবং বিভাগটি বন্ধ থাকার পেছনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ইন্ধন থাকতে পারে।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসলাম বলেন, কিডনী বিভাগটি পুনরায় চালু করতে সবার আগে প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চেয়ে ইতিপূর্বে বহুবার মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রনালয় থেকে চিকিৎসক পদায়নের উদ্যোগ নিলেও কেউ এখানে আসতে চাচ্ছেন না। যে কারনে বিভাগটি চালু করা নিয়ে হতাশা থেকেই যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, কিডনী বিভাগটিতে থাকা দুটি ডায়ালসিস মেশিন সচল করার জন্য ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছিলো। তারা মেশিন দুটি দেখে গেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে মেশিন দুটির বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। তাছাড়া ওই দুটি মেশিন চালু করা সম্ভব না হলে ভিন্ন প্রক্রিয়ায় কিডনী বিভাগটি চালুর জন্য মন্ত্রনালয়ে চিঠি লেখা হয়েছিলো। কিন্তু আদৌ তার প্রতিউত্তর আসেনি। তাই কবে নাগাদ কিডনী বিভাগটি চালু হবে নাকি আদৌ হবে না সে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।