শেবাচিমে চিকিৎসকের উপর হামলার অভিযোগ ॥ নার্স ও তার স্বামী আটকের পর নার্সের মুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকের উপর হামলা এবং হামলার অভিযোগে নার্স ও তার স্বামীকে আটকের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছে চিকিৎসক এবং নার্সরা। উভয়পক্ষ ঘটনার প্রতিবাদ ও আটক হওয়া নার্স এবং তার স্বামীর মুক্তির দাবীতে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ করেছে। এর মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চিকিৎসকের উপর হামলার ঘটনার পর থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত বিক্ষোভ করে হাসপাতালের অন্যান্য চিকিৎসকরা। তবে ওই সময়ে নার্সরা শান্ত থাকলেও রাত ৮টার দিকে তারাও পাল্টা বিক্ষোভ শুরু করে। রোগীর সেবা বন্ধ রেখে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত নার্সিং অফিসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পরে সাত মাসের শিশু কন্যা সহ আটক হওয়া নার্সকে ছেড়ে দেয়ার পাশাপাশি এমপি তালুকদার মো. ইউনুস এর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
এর পূর্বে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মারধরের শিকার হন শিশু বহিঃর্বিভাগের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. ফায়জুল হক পনির। তার উপর হামলার অভিযোগে আটক করা হয় শেবাচিমে স্টাফ নার্স এলিজা আক্তার ও তার স্বামী ব্যবসায়ী মো. শাহ আলম ভুইয়াকে। এলিজা সদ্য নিয়োগ পেয়ে শেবাচিম হাসপাতালে যোগদান করেন। তারা নগরীর বান্দ রোডে কমিশনার বাড়ি নামক এলাকার বাসিন্দা।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং হামলার শিকার শিশু বিভাগের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. ফায়জুল হক পনির জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালের কোথাও বিদ্যুৎ ছিলো না। তার মধ্যেও বাইরে রোগীর প্রচুর ভীর থাকায় তিনি টর্চের আলোতে রোগী দেখছিলেন। তখন এলিজা নামের নারী শেবাচিম হাসপাতালের স্টাফ নার্স পরিচয় দিয়ে তার সন্তানকে চিকিৎসা দিতে বলেন। কিন্তু এতে বাইরে সিরিয়ালে থাকা রোগীদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে ভেবে ওই নার্সকেও সিরিয়ালে দাড়াতে বলেন। কিন্তু ওই নার্সের স্বামী শাহ আলম ভুইয়া তার কথার তোয়াক্কা না করে সবার আগে তার সন্তানকে দেখতে বলে। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায় নার্স এলিজা এবং তার স্বামী শাহ আলম চিকিৎসকের সাথে বাকবিতন্ডার মধ্যে  চিকিৎককে থাপ্পর এবং তার শার্টের কলার ধরে টানা-হেচড়া করে বলে অভিযোগ ওই চিকিৎসকের। বিষয়টি হাসপাতালের অন্যান্য চিকিৎসকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে মুহুর্তের মধ্যে কর্মস্থল ত্যাগ করে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন আন্তঃ এবং বহিঃর্বিভাগের রেজিষ্ট্রার, সহকারী রেজিষ্ট্রার ও মেডিকেল অফিসার এবং ইনডোর মেডিকেল অফিসার এবং ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। এসময় তারা হামলাকারী নার্স ও তার স্বামীকে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে বিক্ষোভ করেন। খবর পেয়ে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে হামলাকারী নার্স এলিজা আক্তার ও তার স্বামী শাহ আলম ভূইয়াকে আটক করে থানায় নিয়ে যান। এর পরে বিক্ষুব্ধ চিকিৎসকরা পরিচালক এর রুম ঘেরাও করে সেখানে অবস্থান নেন। পরে দুপুর দেড়টার দিকে পরিচালকের আশ্বাসে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
এদিকে ঘটনার পরপরই নার্স এবং তার স্বামীর বিরুদ্ধে হাসপাতাল পরিচালক এর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন মিড লেভেল চিকিৎসকরা। সুষ্ঠু বিচার দাবী করে পরিচালককে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটামও দেয় তারা। এ সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি না হলে চিকিৎসকরা আন্দোলন কর্মসূচির ডাক দিবেন বলে হুশিয়ারী দিয়েছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে আটক হওয়া নার্স এলিজা বলেন, আমার শিশু সন্তান বেশি অসুস্থ ছিলো তাই চিকিৎসকের কাছে দ্রুত চিকিৎসা পেতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সন্তানকে না দেখে পাশের মেডিকেল অফিসারের কাছ থেকে রেফার্ড লিখে সিরিয়ালে দাড়াতে বলেন। তার কথা মত সিরিয়ালেই দাড়িয়েছিলাম। কিন্তু ওই চিকিৎসকই আবার সিরিয়াল ভঙ্গ করে দু’জন রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছেন। এর প্রতিবাদ করতে গেলে তিনি আমার এবং আমার স্বামীর সাথে খারাপ ব্যবহার করে। এমনকি আমার গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করলে শাহ আলম ওই চিকিৎসককে কলার ধরে ধাক্কা দেয়। এই ঘটনায় রোগীর অন্যান্য স্বজনরাও ওই চিকিৎসকের উপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলো বলে জানিয়েছেন এলিজা।
এদিকে ঘটনার সময় বিষয়টি নিয়ে মাথা ব্যাথা ছিলো না নার্স নেতৃবৃন্দের। এমনকি তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় ডিপ্লোমা নার্সেস এ্যাসোসিয়েশনের জেলা শাখার সভাপতি আসমা রেজওয়ানা কলি বলেন, চিকিৎসকের উপরে হামলা চালিয়ে নার্সের স্বামী অন্যায় করেছে। যে কারনে আমরা অন্যায়কে কখনই প্রশ্রয় দিবো না। কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নিবেন তাই আমরা মেনে নিবো। দুপুরে এমন প্রতিক্রিয়া জানালেও রাতে পাল্টা আন্দোলন গড়ে তোলেন নার্স নেতৃবৃন্দ। রাত ৮টার দিকে ৭৭ জন ডিউটি নার্স সহ অন্যান্য নার্সিং শিক্ষার্থীরা কর্মস্থলে গেলেও তারা কেউ কর্মে যোগদান করেননি। তারা আটক হওয়া স্টাফ নার্স এলিজার মুক্তির দাবীতে দ্বিতীয় তলায় নার্সিং অফিসের পাশে সংগঠন কার্যালয়ে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল এবং প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। এতে করে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীরা সেবা বঞ্চিত হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে বরিশাল-২ আসনের এমপি এ্যাড. তালুকদার মো. ইউনুস, কোতয়ালী মডেল থানার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহকারী পুলিশ কমিশনার ফরহাদ সরদার সহ অন্যান্য কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে আটক হওয়া নার্স এলিজাকে ছেড়ে দেয়ার আশ্বাস দিলে বিক্ষুব্ধ নার্সরা শান্ত হয়ে কর্মে যোগ দেন।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া ডিপ্লোমা নার্সেস এ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি সেলিনা আক্তার স্টাফ নার্স এলিজাকে আটকের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এলিজার ৭ মাস বয়সী শিশুর হাম হয়েছে। তাকে দেখাতে চিকিৎসকের কাছে যান। সেখানে এলিজার স্বামী অপরাধ করতে পারে। সে জন্য একজন শিশু সহ এলিজাকে আটক করা করাটা দুঃখজনক। এলিজা একটি দপ্তরে চাকুরী করে। সে অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা নিবে। তা না করে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা পদমর্যাদার একজন নার্সকে আটক করার প্রতিবাদ জানান তারা।
হাসপাতালে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এর দায়িত্বে থাকা উপ-পরিচালক ডা. আব্দুল কাদির বলেন, হামলার ঘটনায় নার্স এবং তার স্বামীকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু পরে নার্সরা আটক হওয়া স্টাফ নার্সের মুক্তির দাবীতে আন্দোলন করে। তিনি বলেন, চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করার ঘটনার সাথে নার্স এলিজার স্বামীর সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। যে কারনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে শুধুমাত্র তার স্বামীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ ব্যপারে বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহকারী পুলিশ কমিশনার ফরহাদ সরদার বলেন, যেহেতু অভিযোগ নার্সের স্বামীর বিরুদ্ধে। তাই আটক হওয়া নার্স এলিজাকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হবে। এতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও সম্মতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আটক এলিজাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনতে একদল নার্স নেত্রী থানায় অবস্থান করছিলেন।