শেবাচিমে এনজিওগ্রাম পরীক্ষামুলকভাবে চালু

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনজিও গ্রামের সুফল ভোগ করছেন দক্ষিণাঞ্চলবাসী। পরীক্ষামুলকভাবে চালুর পর মাত্র ১১ মাসে এ পর্যন্ত বরিশাল অঞ্চলের ৫০ জন রোগীর সবল এনজিও গ্রাম সম্পন্ন হয়েছে। সেই সাথে হাজার হাজার টাকা অর্থ খোয়া থেকে মুক্তি পেয়েছেন হৃদরোগীরা। সরকারের দিক থেকে সার্বিক সহযোগিতা পেলে এই হাসপাতালেই একমাত্র ইন্টাভেনশনাল অব কার্ডিওলোজিস্ট ডাঃ মোঃ সালেহ্ উদ্দিন’র মাধ্যমেই কার্ডিয়াক সার্জারী কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা ব্যক্ত করেন পরিচালক ডা. মুঃ কামরুল হাসান সেলিম।
হৃদরোগ বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, ২০১৪ সালের ২৪ জুলাই শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিক্ষামুলকভাবে চালু করা হয় হৃদ রোগীদের রোগ নির্নয়ের অন্যতম পরীক্ষন যন্ত্র এনজিও গ্রাম। ঐদিন নগরীর রূপাতলীর বাসিন্দা আ. রাজ্জাক’র সর্ব প্রথম এনজিও গ্রাম করানো হয়। এ রোগীর এনজিও গ্রাম পরীক্ষায় সফলতা পান চিকিৎসকরা।
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়নে মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও ইন্টাভেনশনাল অব কার্ডিওলোজিস্ট ডাঃ মোঃ সালেহ্ উদ্দিন’র নেতৃত্বে পরবর্তী আগষ্ট মাসে ডাঃ শামিম, জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স ও ইনচার্জ শামিমা ইয়াসমিন এবং টেকনিশিয়ান গোলাম মোস্তফা ভারতের হায়দারাবাদ থেকে এনজিও গ্রামের উপর ১৫ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশ তথা বরিশালে ফেরেন। এরপর আগষ্ট মাস থেকে পুরোদমে শুরু হয় দক্ষিণাঞ্চলবাসীর এনজিও গ্রাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পরবর্তীতে টিমে যোগ দেন ডাঃ মোঃ আক্তারুজ্জামান, জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স ফরিদা বেগম ও শাহনাজ ইয়াসমিন। নবনিযুক্তদের সমন্বয়ে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর আগৈলঝাড়া উপজেলার হুমায়ুন কবিরের সফল এনজিও গ্রাম করা হয়।
এরপর গত ১১ মাসের ব্যবধানে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চিকিৎসক, নার্স এবং টেকনিশিয়ানদের সমন্বয়ে গঠিত এ টিম নগরী ও সদর উপজেলার আ. রাজ্জাক, আলতাফ হোসেন, পান গোলাপ, মুনসুর আলী, হোসেন আলী, কালাম খান, বাচ্চু মিয়ার, মোশারেফ হোসেন, কাজী আলতাফ, শামসুর নাহার, মোঃ হারুন উর রশীদ’র, জিয়াউল হক, হেলাল উদ্দিন, মো. ইউনুস, রাজিয়া বেগম, মো. আলাউদ্দিন, সুখ রঞ্চন ও মো. আলাউদ্দিন মিয়া, গৌরনদী উপজেলার মনতোষ সাহা, হাজী আব্দুর রশীদ, বানারীপাড়ার অর্চনা সিকদার, বাকেরগঞ্জের ইউনুস আলী, ইসমাইল খান, ঝর্না দেবনাথ, রুস্তুম আলী, গৌর রঞ্জন বিশ্বাস ও ইয়াকুব আলী, আগৈলঝাড়ার নজরুল ইসলাম, মনোরঞ্জন ও হুমায়ুন কবির, মুলাদীর জাহাঙ্গির হোসেন, মেহেন্দিগঞ্জের আনোয়ার হোসেন, ভোলা সদরের ইদ্রিস মিয়া, রুহুল আমিন, গিয়াস উদ্দিন, জাহাঙ্গির হোসেন, মো. জসীম উদ্দিন, রিনিকা বেগম, লালমোহনের আনিসুর রহমান, মোঃ মোজাম্মেল হোসেন, কেরামত আলী ও সানাউল্লাহ, শাহিদুল ইসলাম, পিরোজপুরের কমল সাহা, মঠবাড়িয়ার আ. রাজ্জাক, ঝালকাঠীর সামসুন্নাহার, পটুয়াখালীর আবুল কালম আজাদ ও বাসুদেব, বরগুনা সদরের আ. রাজ্জাক এবং শরিয়াতপুরের রাম চক্রবর্তি’র এনজিও গ্রাম পরীক্ষায় সফলতা বয়ে আনেন তারা। এর মধ্যে ৪০ জনের হার্টেই ব্লক ধরা পড়েছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক ও ইন্টারভেনশনাল অব কার্ডিওলোজিস্ট ডাঃ মোঃ সালেহ্ উদ্দিন।
৫০তম’র মধ্যে সর্বশেষ এনজিও গ্রাম করানো বানারিপারার মালুহার গ্রামের মনীন্দ্র সিকাদারের স্ত্রী অর্চনা জানান, দীর্ঘ দিন তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত। চিকিৎসকরা তাকে এনজিও গ্রাম পরীক্ষা করাতে বলেছেন। কিন্তু অর্থের অভাবে রাজধানী ঢাকায় যাওয়া হয় নি। অবশেষে এই হাসপাতালে মাত্র ২ হাজার টাকা দিয়ে এনজিও গ্রাম পরীক্ষা করিয়েছি। এতে আমার হার্টে একটি ব্লক ধরা পড়েছে। তবে ঢাকায় খোঁজ নিয়ে দেখেছি যে, সেখানে এনজিও গ্রাম করাতে সর্বনি¤œ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা ব্যয় হবে।
বিভাগের জ্যেষ্ঠ স্টাফ নাস শামিমা ইয়াসমিন জানান, রোগীর আসলে প্রতিদিনই এনজিও গ্রাম করা সম্ভব। তাছাড়া যত পরীক্ষা হবে মেশিনটিও ততটা ভালো থাকবে।
উল্লেখ্য, শেবাচিম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার গত ৪৭ বছরেও হৃদরোগীর এনজিও গ্রাম পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা ছিলো না। হাসপাতালের সিসিইউ বিভাগ প্রতিষ্ঠার ২৩ বছরে শুধুমাত্র এনজিও গ্রাম পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রায় ২০ হাজার রোগীকে রাজধানী ঢাকায় প্রেরন করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক রোগী অর্থাভাবে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা করাতে না পেরে ধুকে ধুকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
এদিকে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯২ সালে হৃদরোগীর জন্য শুধু মেডিসিন চিকিৎসার জন্য একটি ইউনিট চালু করা হয়। রোগ নির্ণয়ের জন্য ছিলো শুধু ইসিজি মেশিন। পরবর্তিকে ইকো কার্ডিওগ্রাফী মেশিন সংযোজন করা হয়।
২০১১ সালের এপ্রিলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট থেকে সহকারী অধ্যাপক ও ইন্টারভেনশনাল অব কার্ডিওলোজিস্ট ডাঃ মোঃ সালেহ্ উদ্দিন বরিশালে বদলী হয়ে আসেন। সেই সাথে ২০১৩ সালে বর্তমান পরিচালক ডা. মু. কামরুল হাসান সেলিমের প্রচেষ্টায় এ হাসপাতালে যুক্ত হয় এনজিও গ্রাম মেশিন।
সহকারী অধ্যাপক ও ইন্টারভেনশনাল অব কার্ডিওলোজিস্ট ডাঃ মোঃ সালেহ্ উদ্দিন জানান, বাংলাদেশে এই প্রথম অত্যাধুনিক (ফিলিপস’র এফডি-এলুরা) এই মেশিনটি সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই মেশিন দিয়ে এনজিও গ্রাম পরীক্ষা থেকে শুরু করে এনজিও প্ল¬াষ্টি, প্রেস মেকার বসানো সম্ভব।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. মুঃ কামরুল হাসান সেলিম বলেন, খুব দ্রুত এখানে এনজিও প্ল¬াস্টি (রিং বসানো) করার সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। মন্ত্রনালয়ের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে রিং ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলাচ্ছেন তারা। রিং সরবরাহ করতে পারলে খুব অল্প খরচে শেবাচিম হাসপাতালেই হৃদরোগীদের হার্টে রিং স্থাপন সম্ভব হবে বলে জানান পরিচালক।