শেবাচিমের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে রোগী ও স্বজনরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ দক্ষিণাঞ্চলবাসির চিকিৎসা সেবার একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতাল’র উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। হাসপাতালের প্রশ্নবিদ্ধ চিকিৎসা সেবা ও পরীক্ষা নিরীক্ষার ইউনিট বন্ধ হয়ে হয়ে যাওয়ায় এ অবস্থা হয়েছে। হাসপাতালে ক্যান্সার রোগীদের থেরাপী, এমআরআই, লেসিস এবং এক্সে মেশিনের পরে এবার বিকলের তালিকায় যুক্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ন সিটি স্ক্যানও। প্যাথালজী বিভাগটিও চলছে নেই’র মধ্যে। অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নেই হাসপাতালটির প্যাথালজী বিভাগে। এর ফলে রাজস্ব আয় থেকে যেমন সরকার বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি আধুনিক চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না দক্ষিণাঞ্চলের অসহায় ও গরীব রোগীরা। এমনকি পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে ব্যক্তিমালিকানাধীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। তবে অভিযোগ উঠেছে, বৃহত্তর শেবাচিম হাসপাতালে রেডিওলজী এন্ড ইমেজিং বিভাগে পরীক্ষা নিরীক্ষার মেশিন বিকল হওয়ার পেছনে সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্টদের যোগসাজস রয়েছে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তর এই হাসপাতালটিতে প্রতিদিন সর্বনিম্ন ১২শত থেকে দেড় হাজার পর্যন্ত রোগীকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি বহিঃর্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে আরো দেড় থেকে দুই হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শুধুমাত্র বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলাই নয়, খুলনা, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ সহ আশ পাশেল জেলার রোগীরাও চিকিৎসা সেবা নিতে আসছেন এই হাসপাতালটিতে। আর তাই ক্রমশই বাড়ছে হাসপাতালটিতে রোগীর সংখ্যা। সেই সাথে পরীক্ষা নিরীক্ষার যন্ত্রপাতির চাহিদাও বাড়ছে। কেননা ভর্তি রোগী কিংবা বহিঃর্বিভাগে রোগী আসা মাত্রই তাদের রোগ নির্নয়ের জন্য পরীক্ষা নিরীক্ষার ফর্দ ধরিয়ে দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। বিশেষ করে দুর্ঘটনা, মারামারীতে আহত, হাত-পা ভাঙ্গা কিংবা মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত রোগী, মেডিসিন ও সার্জারী সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে পরীক্ষা নিরীক্ষা একপ্রকার বাধ্যতামুলক হয়ে দাড়িয়েছে। কিন্তু পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য হাসপাতালে বিভাগ থাকলেও যন্ত্রপাতির অভাবে বেশিরভাগ পরীক্ষাই হচ্ছে না। ফলে প্রায় বন্ধের পথে বিভাগগুলো।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ক্যান্সার রোগীদের জন্য থেরাপী সেবা বাধ্যতা মুলক। এজন্য শেবাচিম হাসপাতালের পূর্ব প্রান্তে দীর্ঘ বছর পূর্বে স্থাপন করা হয় অত্যাধুনিক মানের কোবাল সিক্সটি যন্ত্র। প্রতিদিন নামে মাত্র মূল্যে অসংখ্য ক্যান্সার রোগীকে থেরাপী দিয়ে আসছিলো কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বছর কয়েক আগে মেশিনটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক লাখ টাকা খরচ করে মেশিনটি সচল করা হলেও তা বেশিদিন টেকেনি। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তা পুনরায় বিকল হয়ে যায়। সেই থেকেই মেশিনটি বন্ধ রয়েছে। ফলে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের থেরাপী গ্রহনের জন্য যেতে হচ্ছে রাজধানীতে।
এদিকে হাসপাতালের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এমআরআই মেশিন স্থাপনের পর থেকেই নানা সমস্যায় জরজড়িত হয়ে পড়ে। কেননা মেশিন চালু করার এক বছর না যেতেই দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে মেশিনটি বিকল হয়ে পড়ে। এর পর কয়েক দফায় লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে মেশিনটি মেরামত করা হলেও তার স্থায়ী পায়নি বেশিদিন।
এছাড়া হাসপাতালের রেডিওলজী বিভাগে হচ্ছেনা অধিকাংশ পরীক্ষা নিরীক্ষা। শুধুমাত্র নরমাল এক্সরে আর আল্ট্রাসনোগ্রাম ছাড়া আর কোন পরীক্ষা নিরীক্ষাই হচ্ছে না বিভাগটিতে। এর মধ্যে বিভাগটিতে সর্বশেষ দাতের এক্সরে কবে হয়েছে যা বলতে পারছেন না বিভাগটির দায়িত্বরত কেউ। আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন বিকল হয়ে পড়লে দীর্ঘ দিন এ বিভাগে আলট্রাসনো সেবা বন্ধ ছিলো। পরে মেডিকেল কলেজ থেকে ধার করা আলট্রাসনোগ্রাফী মেশিন দিয়ে রোগীর সেবা দেয়া হয়। পরবর্তীতে দুটি কালার ডুপ্লেক্স আলট্রাসনো মেশিন সরবরাহ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেখানে সঠিক ভাবে রোগীদের সেবা প্রদান করা হচ্ছে না। প্রতিদিন সর্বচ্চ ১০ থেকে ১২ রোগীর আলট্রাসনোগ্রাম করা হচ্ছে।
এদিকে সর্বশেষ গত অক্টোবরে বিকল হয়ে পড়েছে শেবাচিম হাসপাতালের একমাত্র সিটি স্ক্যান মেশিনটি। মেশিনটি দিয়ে সর্বশেষ ২১ অক্টোবর রোগীর সিটি স্কান করা হয়। মেশিনটি দিয়ে দুই হাজার টাকা ব্যয়ে প্রতিদিন ১৫/২০ জন রোগীর মাথার সিটি স্কান করা হত। মেশিনটি বিকল থাকায় এখন হাসপাতালের বাইরে সাড়ে তিন হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে সিটি স্ক্যানের জন্য।
অভিযোগ উঠেছে, সিন্ডিকেট করেই হাসপাতালে পরীক্ষা নিরীক্ষার এক একটি মেশিন বন্ধ করে দিচ্ছে। কেননা বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা নিরীক্ষা বেশি হলে তাদের পার্সেন্টেজও বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া নগরীর অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক কিংবা শেয়ার হচ্ছেন চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানরা। ফলে নিজেদের ব্যবসা বাড়াতেই সরকারী হাসপাতালে পরীক্ষা নিরীক্ষার ক্ষেত্রে কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান এক বক্তব্যে বলেছিলেন, তিনি শেবাচিম হাসপাতালে যোগদানের পর পরই সিটি স্ক্যান থেকে শুরু করে অন্যান্য মেশিন ও পরীক্ষা নিরীক্ষা চালুর বিষয়ে মন্ত্রনালয়ে চিঠি প্রেরন করেছেন। কিন্তু সেখান থেকে এখন পর্যন্ত কোন প্রতিউত্তর আসেনি। তাছাড়া বিষয়টি নিয়ে মুঠোফোনে সচিব ও পরিচালকদের সাথে যোগাযোগ করছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।