শেবাচিমের জরুরী বিভাগে চিকিৎসকদের কাছে রোগীরা এখন বিরক্তির কারণ

জুবায়ের হোসেন ॥ শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসকদের কাছে রোগীরা যেন বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত সুবিধা নিতে নিজেদের বানানো সিডিউলে একটানা চিকিৎসা করে এখন বিরক্ত তারা। রোগীদের প্রতি এই বিরক্তি তাদের এখন এতটাই প্রকাশ্য যে অনেক সময় সরাসরি বলেই দিচ্ছেন “রোগিরা আসে ডাক্তারদের বিরক্ত করতে”। গত শুক্রবার রাত ১২ টায় রোগীর প্রতি এমন বিরক্তি প্রকাশ করেছেন জরুরি বিভাগের চিকিৎক ডা: কুদরতে খোদা। শুধু চিকিৎসকরাই নয়, রাতের শেবাচিমের জরুরি বিভাগে আসা রোগিরা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় দায়িত্বরত সকলেরই। একারণে নগরীর রোগীরা অনেকেই ফিরে যান সেবা বঞ্চিত হয়ে। তবে বিরক্তির কারণ হয়ে আংশিক সেবা নিয়েও ভর্তি হতে হয় বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা রোগীদের। শেবাচিমের জরুরি বিভাগের সেবা নিয়ে এমন অভিযোগ পুরনো হলেও প্রতিদিন তা বেড়েই চলেছে। রোগী গ্রহণ, ভর্তি, চিকিৎসকদের সেবা, ভর্তি রোগীকে বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রেরণের প্রক্রিয়া প্রতিটিতেই রোগীরা বিরক্তির শিকার হচ্ছে বলে জানায় একাধিক অভিযোগকারি রোগী ও তাদের স্বজনরা।
রোগীদের অভিযোগ ও জরুরি বিভাগ থেকে সংগৃহীত তথ্যে জানা গেছে, শের-ই-বাংলা মেডিকেলে সেবা নিতে আসা সকল রোগীকেই প্রথমে জরুরি বিভাগে আসতে হয়। টিকিট সংগ্রহের পর বিভাগের চিকিৎসক রোগীকে প্রাথমিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন। এরপর রোগীকে ভর্তির নির্দেশনা অনুযায়ী পাঠানো হয় নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে। তবে বর্তমানে দায়িত্বরত চিকিৎসক সহ সকলের নিজেদের বানানো সিডিউলের কারণে এই প্রক্রিয়াটি বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। দিনের বেলায় যেমন তেমন থাকলেও রাতে তা সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। টিকিট সংগ্রহের বিষয়টি টাকার বিনিময়ে কিছুটা সহজে হলেও ঝামেলার বিষয়ে পরিণত হয় দায়িত্বরত চিকিৎসকের প্রাথমিক সেবা ও রোগী নির্ধারিত ওয়ার্ডে প্রেরণ এর বিষয়টি। জরুরি বিভাগে বর্তমানে ৫ জন চিকিৎসক পর্যায়ক্রমে ৮ ঘন্টা করে তিনটি সিডিউলে ২৪ ঘন্টা দায়িত্ব পালন করেন। সিডিউল অনুযায়ী প্রতিদিন তিন জন এবং সপ্তাহে এক দিন পর পর সামঞ্জস্য বজায় রেখে প্রতিজনে দায়িত্ব পালন করবে। তবে ব্যক্তিগত স্বার্থে সিডিউল মানেন না কোন চিকিৎসক। এর কারণ হিসেবে জরুরি বিভাগের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, চিকিৎসকদের বেশির ভাগই নগরী থেকে দূরত্বে বসবাস করে এবং চেম্বার, ক্লিনিক সহ অন্যান্য স্থানে রোগী দেখে থাকেন। তাই লাভের কাজে অধিক সময় পেতে নিজেরাই সিডিউল তৈরি করে একজন একটানা ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত জরুরি বিভাগে রোগী দেখেন। এর পর পরবর্তী তিন দিন তিনি আর দায়িত্বে আসেন না। তাদের বানানো সিডিউলে অনেক সময়ই তাদের হয়ে প্রক্সি দেয় তথা রোগী দেখার দায়িত্বে থাকে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকদের একটানা এমন দায়িত্ব পালনের কারণেই তারা রোগীদের ওপর বিরক্ত হয়ে ওঠেন। ৫ চিকিৎসকের মধ্যে ডা: কুদরতে খোদা ও ডা: শাহীন মোল্লা প্রায়শই বিরক্ত হয়ে রোগী ও তার স্বজনদের সাথে অশালীন আচরণও করেন বলে জানায় সূত্রটি। অনেক সময় জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের শরীর স্পর্শ না করেই দিয়ে দেন ভর্তির নির্দেশনা। এর পরেও রোগীর বিড়ম্বনা শেষ হয় না। ভর্তি রোগীকে ওয়ার্ডে নেয়ার জন্য ট্রলি, লিফট সহ কিছুই মেলে না রাত ১২ টার পর। যদি মেলেও তাতে দিতে হয় “খরচপাতি” অথবা “বকশিস”। এমন ঘটনার শিকার হয়ে প্রায়শই নগরীর রোগীরা সেবা না নিয়ে ফেরৎ গেলেও বিপাকে পরতে হয় দরিদ্র ও দূর থেকে আসা রোগীদের যাদের করনীয় কিছুই থাকে না। এমন বিড়ম্বনার শিকার রোগী নগরীর নুরিয়া বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. বাবুল এর স্বজনরা জানান, শুক্রবার রাত ১২ টার সময় তারা রোগী নিয়ে আসেন শেবাচিমের জরুরি বিভাগে। ঐ সময় দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা: কুদরতে খোদা রোগীর দিকে না তাকিয়ে বিরক্তির সাথে টিকিট নিতে বলেন। টিকিট নেয়ার পরেও তিনি রোগী না দেখে ব্যক্তিগত কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। অতঃপর রোগী দেখার জন্য তাকে অনুরোধ করা হলে তিনি তা না করেই ৪ তলার ৭ নং ওয়ার্ডে ভর্তির নির্দেশনা দেন। পরীক্ষা না করেই ভর্তির নির্দেশনা দেয়ার পর তাকে ফের পরীক্ষা করার অনুরোধ করা হলে তিনি বলেন রোগীরা মেডিকেলে আসে তাদের বিরক্ত করতে। অতঃপর ভর্তি করতে হবে বলে তিনি তার দায়িত্ব পালন শেষ করেন। এর পর রোগী নিয়ে ৪ তলায় যাওয়ার জন্য ট্রলি পাওয়া গেলেও লোক না থাকায় হেটে রোগী নিয়ে লিফটের কাছে গিয়ে দেখা যায় দরজা খোলা আর লিফট বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। এসময় সব কটি লিফটই বন্ধ অবস্থায় ছিল বলে জানায় রোগীর স্বজনরা। লিফট চালানোর জন্য বেশ কিছু সময় খুঁজেও কাউকে পাওয়া যায়নি। সিড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার ভয়ে উচ্চ রক্তচাপের রোগী মো. বাবুল কে নিয়ে সর্বশেষে ফিরে যেতে হয় বলেও জানায় তারা। এমন অভিযোগ প্রতিদিনই একাধিক পাওয়া গেলেও চরম অব্যবস্থাপনায় চলা শেবাচিমের জরুরি বিভাগের চিত্র পরিবর্তন হয় না বলে জানায় অভিযোগকারীরা। যে কারণে প্রতিদিন প্রকৃত সেবা প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত হয় অসংখ্য রোগী বলেও জানায় তারা। অভিযোগের বিষয়ে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এস এম সিরাজুল ইসলাম এর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, পূর্বে কিছু কিছু সময় দেখা যেত জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা শিক্ষানবিশদের দিয়ে দায়িত্ব পালন করাচ্ছে। বর্তমানে তা হয় না। দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকদের সুবিধার্থে তিনি জরুরি বিভাগে ৪ জনের সাথে আরও একজন চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছেন। একটানা সেবা দেয়ায় চিকিৎসকদের ক্লান্তির বিষয়টি স্বীকার করে তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত সিডিউলের মাধ্যমে জরুরি বিভাগের চিকিৎসা চলে এমনটি হওয়ার কথা নয়। তার পরেও অভিযোগের বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সাথে দেখবেন। এছাড়াও জরুরি বিভাগ থেকে রোগী ভর্তি, ওয়ার্ডে প্রেরণ, ট্রলি, লিফট ইত্যাদি সংক্রান্ত যাবতিয় সমস্যা সমাধানে অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে রোগীদের প্রকৃত সেবা দান প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবেন বলেও জানান তিনি।