শেবাচিম’র সাধারণ ছাত্রদের আর্তি রাজনীতি নয়, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এসেছি

জুবায়ের হোসেন॥ আমরা তো রাজনীতি করতে আসি নি, আমরা এসেছি চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। ছেলেবেলা থেকেই দেশের ভাল একটি মেডিকেল কলেজে পড়ার ইচ্ছায় ভর্তি হয়েছিলাম শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজে। তবে এখানে আমাদের পড়াশোনা হচ্ছেনা। এখানকার ছাত্রনেতারা তা করতে দিচ্ছে না। আমাদের প্রতিদিন একই দলের দুই পক্ষের রাজনৈতিক ঝামেলায় লোকবল হিসেবে বাধ্যতামূলকভাবে যোগ দিতে হচ্ছে। কখনও অবসরে কখন বা ক্লাস চলাকালীন সময়ে যোগ দিতে বাধ্য আমরা তিন ছাত্রাবাসের কয়েকশত ছাত্ররা। যোগ না দিলে ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে ছাত্রাবাসে কোথাও মিলবে না সুযোগ সুবিধা। কখনও কখনও লাঞ্ছিত হতে হবে শারীরিকভাবেও। এখন এমন অবস্থা ছাত্রনেতাদের জন্য ব্যবহৃত না হয়েও উপায় নেই। চিকিৎসক হওয়ার যে স্বপ্ন ছিল ওই সকল ছাত্রনেতাদের কারণে এখন তা দুঃস্বপ্ন মনে হয়। এই কথাগুলো গতকাল বৃহস্পতিবার শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজের এক সাধারণ শিক্ষার্থী আক্ষেপের সাথে জানায়। কথাগুলো বলার সময় সে আতংকিত ছিল ছাত্রনেতাদের জন্য। কারণ এই অভিযোগ অনেকের তবে প্রতিবাদ করলেই শুরু হবে নির্যাতন। এই ভয়ে তারা চুপ থাকে।
সূত্রমতে, শুধু বাংলাদেশই নয় দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের অন্যতম ও স্বনামধন্য শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। দেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলা এমনকি দেশের বাইরের শিক্ষার্থীরাও চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এখানে ভর্তি হয়। ভর্তির জন্য করতে হয় কঠোর পরিশ্রম। সুযোগ প্রাপ্তরা মেডিকেল হলসহ আশে-পাশের এলাকায় থাকে।
ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানরতদের অবস্থা যেমন তেমন। তবে শুরু থেকেই ছাত্রনেতাদের টার্গেটে পরিণত হয় ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্ররা। নিজেদের লোকবল বাড়িয়ে নেতাদের নিকটস্থ হওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় তারা। বর্তমানে মেডিকেল কলেজে ৫ ব্যাচে ১ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এদের একটি বড় অংশই থাকে ছাত্রাবাসে। বর্তমানে শেবাচিমে শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিই চলে। এক পথের পথিক হলেও তারা চলে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে।
এই দুই পক্ষে সর্বদাই লেগে থাকে নিজেদের পাল্লা ভারি করার প্রতিযোগিতা। দুইটি পক্ষে সর্বোচ্চ ১০০ শিক্ষার্থী নিজের ইচ্ছায় রাজনীতি করে। তবে এর বাইরে যাদের মিছিল, মিটিং, সংঘর্ষ, ক্ষমতাপ্রদর্শনের শোডাউনের অংশ হিসেবে মাঝ ও পেছনের কাতারে দেখা যায় তারা থাকে বাধ্য হয়ে। এরা প্রকৃত পক্ষে কোন পক্ষের না, এদের দুই পক্ষ জোর করে ব্যবহার করে যে যার মত করে। এক পক্ষের ডাকে গেলে অন্য পক্ষের শত্রু হতে হয়। সহ্য করতে হয় নানা যন্ত্রনা। আর না এলে তো ছাত্রাবাসে থাকা ও পড়াশোনা করাও দুস্কর হয়ে পড়ে। তাদের উৎপাতে ঠিকভাবে পড়াশোনা করাও সম্ভব হয় না সাধারণ শিক্ষার্থীদের। এমনকি তাদের সংঘর্ষের অংশ হতে হয় মানব সেবার জন্য পরিহিত এ্যাপ্রোন গায়ে দিয়ে।
গতকাল বৃহস্পতিবার এমন ঘটনার শিকার হয়েছে তুহিন নামের এক শিক্ষার্থী। যুব রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অর্থ বিষয়ক সম্পাদক এই শিক্ষার্থী স্থগিত হওয়া কমিটিতেও রয়েছে। হাসপাতালে যুব রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কক্ষের সামনে থাকা সাইকেল ভাংচুর করা হয়েছে। যুব রেড ক্রিসেন্টের তালা ভেঙ্গে প্রবেশ করে টাকা নিয়ে গেছে। এই ঘটনার সাথে বিডিএসের রুবেল, মাসুদ পারভেজ ও জাকির জড়িত বলে দাবি করেছে তুহিন। এই ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরী করা হয়েছে।
এছাড়াও সাধারণ ছাত্রদের অভিযোগ ও সূত্রটির দেয়া এ সকল তথ্যের সত্যতা মিলেছে বুধবার দুপুরে শেবাচিমে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের সময়। এমনকি সত্যতা শিকার করেছে কলেজ শাখার একাধিক ছাত্রনেতা। বুধবার দুপুরে কলেজ শাখার নবগঠিত কমিটি স্থগিত করা নিয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় দুই পক্ষই মেডিকেল অডিটরিয়ামের পুলিশ বাহিনী ও কলাপসিবল গেটকে মধ্যে রেখে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। পরস্পর বিরোধী স্লোগান, একে অপরকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। মারমুখি ভঙ্গিতে থাকা দুই পক্ষের পেছনে আতংকিত অবস্থায় ছিল কিছু সাধারণ শিক্ষার্থী। গায়ে এ্যাপ্রোন ও কাধে চিকিৎসক হওয়ার পাঠ্যপুস্তক নিয়ে তাদের অবস্থান ছিল। পুলিশ যখন দুই পক্ষকে আলাদা করে দেয় তখন তাদের এক রকম টেনে হিচড়ে সাথে নিতে দেখা গেছে ছাত্রনেতাদের। অন্যদিকে তারা যখন বিপরীত পক্ষের সামনে থেকে যায়, তখন তাদের চোখ রাঙানী ও দেখে নেয়ার হুমকির শিকার হয়। এর আগে ১৯ অক্টোবর যখন কমিটি গঠন এর খবর আসে সেদিনও পড়তে হয়েছে এই অবস্থায়। এখন তাদের জন্য এই ঘটনার শিকার প্রতিদিন হতে হয়। যা তাদের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নকে এখন অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মুক্তি চাইলেও যা থেকে তারা পচ্ছে না বিন্দু মাত্র ছাড় পর্যন্ত। এই বিষয়টি কেন হচ্ছে বা সাধারণ শিক্ষার্থীদের এর থেকে মুক্ত করে তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে কিভাবে সুরক্ষিত করা যায় সেই বিষয়ে আলাপের জন্য শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ এর অধ্যক্ষ ডা: ভাস্কর সাহার সাথে যোগাযোগের জন্য ফোন দেয়া হলে তিনি তা কেটে দেন।