শিশু সদনে কিশোরের মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে দুই কমিটি সমাজ সেবার পরিচালকের তদন্ত শুরু, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার

রুবেল খান॥ বরিশাল শিশু সদনে নিবাসী শিশুর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করেছেন সমাজ সেবা অধিদপ্তরের পরিচালক। তদন্তে করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটন করেছেন তিনি। গতকাল রবিবার দুপুর থেকে দিন ব্যাপী তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে মৃত্যুর পাশাপাশি কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করেন।
এদিকে শিশুর মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে স্থানীয়ভাবে গঠন করা হয়েছে ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি। বরিশাল জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মো. জাকির হোসেনকে প্রধান করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন জেলা প্রশাসক।
অপরদিকে গতকাল রবিবার নিহত শিশু মো. মশিউর রহমান ইউসুফ এর মরদেহের ময়না তদন্ত শেষে লাশ দাফন সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে শিশুর ভিসেরা ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়াও শিশু পরিবার (বালক) এর উপ-তত্ত্বাবধায়ক এই ঘটনায় শনিবার রাতে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত শনিবার বিকালে নগরীর আমতলার মোড় সরকারী শিশু সদন (বালক) এর শিশু নিবাসী ও প্রথম শ্রেণির ছাত্র মো. মশিউর রহমান ইউসুফ (১২) এর গলায় ফাঁস দেয়া অবস্থায় ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে ঘটনার প্রায় ঘন্টা খানেক পর লাশটি উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরী বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে শিশু সদনের কক্ষে শিশুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে রহস্যের দানা বাধে। শান্ত শিষ্ট এই শিশুকে হত্যার পর ফ্যানের সিলিং এর সাথে ঝুলিয়ে রাখা হতে পারে বলেও কেউ কেউ ধারনা করছেন।
এদিকে শিশুর রহস্যজনক মৃত্যুর সংবাদে গতকাল শনিবার সমাজ সেবা অধিদপ্তরের এক সদস্যের তদন্ত টিম বরিশালে এসেছেন। অধিদপ্তরের মহা-পরিচালকের নেতৃত্বে অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) মো. জুলফিকার হায়দার এই তদন্ত কার্যক্রম চালান। দুপুরে বরিশালে এসে দেড়টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তদন্ত কালে সমাজ সেবা অধিদপ্তর বরিশাল এর উপ-পরিচালক মো. মোর্শারফ হোসেন, প্রবেশন কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ পারভেজ, উপ-তত্ত্বাবধায়ক মো. হেমায়েত উদ্দিন সহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তা পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) মো. জুলফিকার হায়দার’র সাথে এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, মহা-পরিচালক’ স্যারের নির্দেশে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে বরিশালে এসেছি।
তিনি আরো বলেন, বরিশাল শিশু পরিবারে যে ঘটনাটি ঘটেছে তা আসলেই দুঃখজনক। তাই বিষয়টিকে আমরা খুব গুরুত্বতার সাথেই দেখছি। যাতে করে পরবর্তীতে এই ধরনের আর কোন ঘটনার সম্মুখিন না হতে হয়।
তিনি বলেন, শিশু পরিবার (বালক) এর দ্বিতীয় তলায় যেই কক্ষ থেকে শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে সেই কক্ষ পরিদর্শন করেছি। এমনকি তার সাথে যে কজন নিবাসী শিশু থাকে তাদের প্রত্যেকের সাথেই কথা বলেছি। কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের দায়িত্ব অবহেলায় গাফেলতি এবং কারো প্ররোচণা নাকি অন্য কিছু সে বিষয়েও আমরা তদন্ত করছি।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে তিনে বলেন, যেখান থেকে শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে সেই রুমের মেঝে থেকে ফ্যানের সিলিং পর্যন্ত উচ্চতা অনেক। কিন্তু শিশুটি খুবই ছোট। তার পক্ষে কিভাবে সিলিং এর সাথে গামছা বাধা সম্ভব হলো তা বোধগম্য নয়। তবে মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা না থাকায় দিন ব্যাপী তদন্তে কি আলামত পাওয়া গেছে, আত্মহত্যা নাকি হত্যার কোন আলামত রয়েছে সে বিষয়ে কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। তবে বিষয়টি সত্যিই জটিল ও রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে বরিশাল জেলা প্রশাসক সরকারী শিশু সদনের সভাপতি ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান বলেন, শিশু মৃত্যুর ঘটনার রহস্য উৎঘাটনে তদন্ত করা হবে। সুষ্ঠু তদন্তের লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসেনকে প্রধান করে গঠিত কমিটিতে অন্যান্যদের মাঝে রয়েছেন সমাজ সেবার বরিশাল এর উপ-পরিচালক মো. মোশারেফ হোসেন, বরিশাল সিভিল সার্জন এর একজন প্রতিনিধি, পুলিশ কমিশনারের একজন প্রতিনিধি এবং সমাজ সেবা অধিদপ্তর বরিশাল এর প্রবেশন অফিসার সাজ্জাদ পারভেজ।
অপরদিকে কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাখাওয়াত হোসেন বলেন, শিশুর অপমৃত্যুর ঘটনায় শিশু পরিবার (বালক) এর উপ-তত্ত্বাবধায়ক মো. হেমায়েত উদ্দিন থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাইদুর রহমানকে। এছাড়া গতকাল রবিবার শিশুর ময়না তদন্ত শেষে লাশ সমাজ সেবা কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. এস.এম আক্তারুজ্জামান তালুকদার জানান, গতকাল সকালে শিশুটির ময়না তদন্ত করা হয়েছে। তবে শিশুর শরীরে আঘাতের কোন আলামত পাওয়া যায়নি। তারপরেও ঘটনাটি যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ এবং রহস্যজনক বলে কথা রটেছে সে জন্য শিশুর ভিসারা সংরক্ষণ করেছেন। তা পরীক্ষার জন্য রাজধানীর মহাখালী রাসায়নিক পরীক্ষাগারে প্রেরণ করা হবে। ঐ রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করে বলা যাবে বলে জানান এই চিকিৎসক।
উল্লেখ্য, আগৌলঝাড়ার ছোটমনি নিবাসে মো. মশিউর রহমান ইউসুফ নামে নবজাতক থেকে বেড়ে ওঠে শিশুটি। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ১৪ মে লেখা পড়ার জন্য তাকে সেখান থেকে বরিশাল শিশু পরিবার (বালক) এ স্থানান্তর করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ ফেব্রুয়ারি শনিবার শিশু পরিবার (বালক) এর দ্বিতীয় তলায় এক নম্বর কক্ষ থেকে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।