শিশুদের উপর জিপিএ-৫ নির্যাতন বন্ধ করতে হবে-সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর

সিদ্দিকুর রহমান ॥ সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেছেন, ফুলের মতো শিশুদের জীবনে এখন গান নেই, কবিতা নেই, সংস্কৃতিচর্চা নেই। তাদের ওপর শুরু হয়েছে ‘জিপিএ-৫ নির্যাতন’। এই নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, নইলে শিশুদের মেধার বিকাশ ঘটবে না। গতকাল রবিবার বেলা ১১টায় নগরীর জিলা স্কুলে অনুষ্ঠিত ৭ দিন ব্যাপী বরিশাল বিভাগীয় বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি একথা বলেন।

এসময় তিনি আরো বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নির্দেশ দিয়ে রোবটের মতো শিশুদের বড় করা হচ্ছে। তাদের ওপর জিপিএ-৫’র এই নির্যাতনের কারণে তাদের অবস্থা খারাপ। অভিভাবকেরা জিপিএ-৫ এর পেছনে না ছুটে, শিশুদের সুকুমার মনের বিকাশ ঘটাতে হবে। মানবিক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেছেন, পূর্বে শিক্ষকরা লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা-সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে সমানভাবে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করতেন। কিন্তু এখনকার লেখাপড়ায় পার্থক্য দেখা দিয়েছে। এখন ভালো ফলাফল করাই শিক্ষক-অভিভাকদের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মন্ত্রী আরো বলেন, প্রত্যেক পরিবারের বাবা-মায়েদের ধারণা তার সন্তান যদি জিপিএ-৫ না পায় তবে যেন তার জীবন ধ্বংস হয়ে গেল। এ ধারণা সঠিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জিপিএ-৫ পাওয়াই শেষ কথা নয়। প্রকৃত জ্ঞানী মানুষ হওয়াটা জরুরী। শ্রেনীকক্ষে পাঠদান এবং কোচিং করার মধ্যে দিয়ে পরীক্ষায় ভাল ফলাফল আশা করা যায়। কিন্তু সীমাবদ্ধ এই জ্ঞান নিয়ে পূর্নাঙ্গ মানুষ হওয়া যায় না। পূর্নাঙ্গ মানুষ হতে হলে তাকে বেশি করে বই পড়তে হবে। জ্ঞান আহরনের জন্য বইয়ের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, এখনকার শিক্ষাব্যবস্থাকে আমি বলি, জিপিএ-৫ নির্যাতন শিক্ষা ব্যবস্থা। এ প্রতিযোগিতায় দৌঁড়াতে গিয়ে শিশুদের মধ্য থেকে মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের বিভ্রান্ত করে জঙ্গিবাদে উদ্ধুদ্ধ করার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, পরীক্ষায় ভালো ফলাফলে কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবেন আবার কেউ নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করে শিল্পী ও কবি-সাহিত্যিক হবে। শিশুদের সেই সৃজনশীলতাকে বিকশিত করতে হবে। এটার দায়িত্ব শিক্ষক ও অভিভাবকদেরই নিতে হবে। তাছাড়া মাদক ও সন্ত্রাস এবং জঙ্গীবাদমুক্ত সমাজ গড়তে হলে সংস্কৃতিচর্চা বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশে এই বই মেলা করা হচ্ছে। তাছাড়া এই বই মেলায় যে বইগুলো এসেছে সাধারনত স্থানীয় ভাবে এই বই খুব কম পাওয়া যায়। তাই মফস্বল পর্যায়ে এই বই পৌছে দিতে এই মেলা। আর এই বইমেলার উপর সাধারন বইপ্রেমীদের আগ্রহের উপর নির্ভর করেই ভবিষ্যতে বরিশালে এই বইমেলা করা হবে।

চেতনার জাগরনে বই এই স্লোগানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের তত্ত্বাবধানে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে এবং বরিশাল জেলা প্রশাসনের বাস্তবায়নে এবং বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সহযোগীতায় ৭ দিনব্যাপী বরিশাল বিভাগীয় বইমেলা শুরু হয়। মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ডিআইজি শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, পুলিশ কমিশনার মো. রুহুল আমিন, শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক, বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম এবং নির্বাহী পরিচালক কামরুল হাসান শায়খ। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক উপসচিব মো. নজরুল ইসলাম। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী হাকিম আহসান মাহমুদ রাসেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. জাকির হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন, শিক্ষাবোর্ডের সাবেক সচিব মোতালেব হাওলাদার, নাট্যজন সৈয়দ দুলাল, এ্যাড. এস এম ইকবাল, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির, সহকারী কমিশনার ভূমি নাজমুল হোসাইন, জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন, সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুবা হোসেন, শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পাপিয়া জেসমিন, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরি বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আনিসুর রহমান স্বপন, সাবেক সভাপতি সুশান্ত ঘোষ, নিবার্র্হী হাকিম নাহিদুল করিম, মেহনাজ ফেরদৌস, রিপন বিশ্বাস, রুমানা আক্তার, মাহমুদা আক্তার প্রমুখ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে মেলার বইয়ের স্টলগুলো ঘুরে দেখেন বইমেলার প্রধান অতিথিসহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ। এর আগে বেলুন উড়িয়ে এবং ফিতাকেটে মেলার উদ্বোধন করা হয়। এছাড়াও পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিকেল ৩ টায় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগীতা এবং বিকেল ৫ টায় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বরিশালের ভূপ্রকৃতি সৃজনশীল সাহিত্য রচনার স্বর্গভূমি এই বিষয়ক সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন কবি আসমা চৌধুরি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আহসান হাবিবের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক স.ম ইমানুল হাকিম। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএম কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও শুভ্রা হালদার, নাট্যজন সৈয়দ দুলাল। পরে সন্ধ্যা ৬ টায় জারি গান ও নৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন বিকেল ৩ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত চলবে ১২ মে পর্যন্ত। তাছাড়া মেলায় সৃজনশীল ও জ্ঞানমূলক গ্রন্থ প্রকাশনায় নিয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের ৫১ টি প্রকাশনীর নিজস্ব স্টল রয়েছে। এছাড়াও বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির আয়োজনে দুষ্প্রাপ্য বই প্রর্দশনী করা হয়।