শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণহিস্টোরিয়া আতংক আরো ৩৫ শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ বরিশালে ছড়িয়ে পড়েছে গণহিস্টোরিয়ার আতংক। প্রায় প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছে শিশু-কিশোররা। গতকাল সোমবারও বরিশাল সদর উজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের নয়ানী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও চরকাউয়া আজাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি স্কুলে গণহিস্টোরিয়ায় ৩৫ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদেরকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গত কদিনে বরিশালের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক গণহিস্টোরিয়ার কারনে অভিবাবকদের মাঝে চরম আতংক বিরাজ করছে।
শেবাচিম হাসপাতালের জরুরী বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০ আগস্ট থেকে গণহিস্টোরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহন করেছে চারটি স্কুলের ৬২ জন শিক্ষার্থী। সর্বশেষ গতকাল সোমবার বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের চরকাউয়া নয়ানী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও চরকাউয়া আজাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৫ শিক্ষার্থী গণহিস্টোরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এরা হলো রূপা, লিমা (১৩), স্বর্ণা (১১), আছিয়া (১১), সায়মা (১১), ৮ম শ্রেনীর কেয়া আক্তার (১৩), ৬ষ্ঠ শ্রেণীর তামান্না আক্তার (১৩), হাদিস (১১), জিসান (১৩), মুনিয়া আক্তার (১২), ৬ষ্ঠ শ্রেণীর মীম (১১), ৫ম শ্রেণীর জান্নাতি (১০), ৫ম শ্রেণীর শাওন হাওলাদার (১২), ৬ষ্ঠ শ্রেনীর চান মিয়া (১১), ফেরদৌসি আক্তার (১১), ৫ম শ্রেনীর স্বর্ণা আক্তার (১১), ৬ষ্ঠ শ্রেণীর হাফিজা আক্তার (১২), ৬ষ্ঠ শ্রেণীর নাসরিন আক্তার (১১), ৫ম শ্রেণীর মীম (১১), আমিনুল ইসলাম (১৪), রিমা আক্তার (১৩), ফারজানা (১১), ঝুমুর আক্তার (১২), মীম (১১), ৫ম শ্রেণীর মুনিয়া আক্তার (১১), লিমা (১৩), মিমি আক্তার (১২), খুকুমনি (১১), ৬ষ্ঠ শ্রেণীর মাহামুদা আক্তার (১২), বিথি (১৫), স্বর্ণা (১৩), ৬ষ্ঠ শ্রেণীর আরিফ (১১), ৪র্থ শ্রেণীর রুপা (৯) ও সীমা (১২) সহ ৩৫ জন।
চরকাউয়া নয়ানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মালেক ও আজাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতিউর রহমান জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর শ্বাস কষ্ট ও মাথা ঘুরানো শুরু হয়। এরপর একে একে অচেতন হয়ে পড়ে। এর পর পরই বিদ্যালয় ছুটি ঘোষনা করে অসুস্থ শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিকভাবে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তাদেরকে হাসপাতালের শিশু এবং মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
খবর পেয়ে গতকাল রাতে শেবাচিম হাসপাতালে অসুস্থ শিক্ষার্থীদের দেখতে যান চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করিম, বরিশাল-২ আসনের সাংসদ তালুকদার মো. ইউনুস, হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন ফারুক ও চরকাউয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম ছবি। এসময় চরমোনাই পীর অসুস্থ শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ দোয়া-মোনাজাত এবং চিকিৎসার জন্য নগদ ২০ হাজার টাকা প্রদান করেন।
এদিকে হাসপাতালের জরুরী বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, গত চার দিনে গণহিস্টোরিয়ায় এ নিয়ে ৬২ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা গ্রহন করেছে। এর মধ্যে গত ২০ আগস্ট সদর উপজেলার দূর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেনীর ১৮ জন। এর পর ২১ আগস্ট নগরীর বাংলা বাজার এলাকার অর্নিবান ক্যাডেট ভর্তি কোচিং সেন্টার থেকে ২জন এর পরদিন ২২ আগস্ট ঐ একই কোচিং সেন্টার থেকে মডেল স্কুল এন্ড কলেজের ৬ষ্ঠ শ্রেনীর আরো এক ছাত্রী এবং ২৩ আগস্ট সদর উপজেলা চন্ডিপুর ৪৪ নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী ঝুমুর (১১) হিস্টোরিয়ায় আক্রান্ত হলে তাকে শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়।
এবিষয় শেবাচিম হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. অসীম কুমার সাহা বলেন, এটি কোন বড় ধরনের সমস্যা নয়। ডাক্তারী ভাষায় একে বলা হয় মাস সাইকোসিস অথবা গনহিস্টোরিয়া। যে কোন কারনে আতংক থেকে মাস সাইকোসিস এর সৃষ্টি হয়। একজনের এমন সমস্যা দেখা দিলে তার দেখাদেখি অন্যদের হয়ে থাকে। বিশেষ করে শিশু এবং কিশোর বয়সের মানুষের এমন সমস্যা হচ্ছে।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. অসীৎ ভুষন দাস জানান, হিস্টোরিয়া কোন রোগ নয়। এ নিয়ে আতংকিত হওয়ার কোন কারন নেই।
তিনি বলেন, অনেক সময় আক্রান্ত শিশু কিশোরদের অভিযোগ এবং স্থানীয়দের হুরোহুরির কারনে অন্যান্যদের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারনে আক্রান্ত’র সংখ্যাও বাড়ছে।
এধরনের সমস্যা সৃষ্টির কারন হিসেবে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, পরিবেশগত সমস্যা এবং মস্তিস্কে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির কারনে বেশিরভাগ সময় গণহিস্টোরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে শিশু-কিশোররা। এমন সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষনিক ভাবে রেজিষ্ট্রার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তবে আক্রান্ত শিশু কিশোরদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে ২৪ ঘন্টা পর্যবেক্ষনে রাখলেই সম্পূর্ণ ভাবে সুস্থ হয়ে যাবে।