শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওয়েব সাইট তৈরিতে শুভংকরের ফাঁকি

সাইদ মেমন ॥ দেশের সকল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, টেকনিক্যাল বিদ্যালয়, কলেজ এবং মাদ্রাসার নিজস্ব ওয়েবসাইট বাধ্যতামূলক করার সরকারী নির্দেশনা ও লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা এবং ফলপ্রসু নিশ্চিত করনে গত এপ্রিল মাসে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওয়েব সাইট তৈরির নির্দেশ দেয় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।
এক পরিপত্র জারীর মাধ্যমে দেয়া নির্দেশ বাস্তাবায়নের বেধে দেয়া সময় শেষ হলেও সিংহভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ওয়েব সাইট তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। গত ৩০ জুনের মধ্যে ওয়েব সাইট তৈরি করে তা মন্ত্রনালয়কে অবহিত করার সময় বেধে দেয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের দুই মাস অতিক্রম হলেও কয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিপূর্ণ ওয়েব সাইট তৈরি করেছে তার কোন তথ্য শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে নেই।
অপরদিকে, এই পরিপত্র নিয়ে টাকা আয়ে মাঠে নেমে পড়েছে সুযোগ সন্ধানী ও চতুর ব্যক্তিরা। এসব ব্যক্তিদের স্বল্প পরিসর ও সীমিত জ্ঞানে ব্যবহার নিয়ে করা আইটি প্রতিষ্ঠান এক রকম প্রতারনা করছে।
তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে তৈরি করে দেয়া ওয়েব সাইট শুভকংরের ফাঁকির মতো হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের অর্থ ব্যয়ের কৃচ্ছতা ও অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে নামে মাত্র ওয়েব সাইট দাড় করিয়ে দিচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের ওয়েব সাইট সম্পর্কে কোন জ্ঞান না থাকায় অসার ওয়েব সাইট তৈরি করে দিচ্ছে। এসব ওয়েব সাইট নির্দেশনা ও লক্ষ্যপূরণ তার কোন কিছুই পূরণ করতে পারবে না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের অজ্ঞতা ও মাউশির তদারকির অভাবের সুযোগ নিয়ে আইটি প্রতিষ্ঠান ওয়েব সাইট তৈরিতে ফায়দা নেয়া ভবিষ্যতে অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, মাউশির নির্দেশনা মেনে প্রতিযোগিতা করে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইট তৈরি করেছে, সেখান থেকে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কোন তথ্য নেয়া বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংযোজনের সুযোগ নেই। ওইসব ওয়েবসাইট ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে তাৎক্ষনিক কোন তথ্য তো নেই, পূর্বের কোন তথ্যও সেখান থেকে পাওয়ার প্রক্রিয়া রাখা হয়নি। এছাড়াও ওয়েব সাইট পরিচালনার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে ওয়েব সাইট তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে হবে।
নগরীর একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সদর উপজেলার চরবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ওয়েব সাইট তৈরির বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক বলেন, কাকলীর মোড়ের একটি প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েব সাইট তৈরি করেছে। ওই ওয়েব সাইট নির্দেশনা মেনে করা হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক।
তিনি ওয়েবসাইট ব্যবহার তৈরি বা ব্যবহার সর্ম্পকে অজ্ঞতার কথা স্বীকার করে বলেন, যদি সমস্যা হয় তা তারা ঠিক করে দেবে।
নগরীর স্বনামধন্য বরিশাল জিলা স্কুল, সরকারী বালিকা বিদ্যালয়, উদয়ন, হালিমা খাতুন ও জগদ্বীস স্বারস্বত মাধ্যমিক বিদ্যালয় সহ অমৃত লালদে, সৈয়দ হাতেম আলী কলেজর তৈরি করা ওয়েব সাইট পরিদর্শনে গেলেও এর সত্যতা মিলবে। তবে এ থেকে মুক্ত রয়েছে সদর উপজেলার এআরখান মাধ্যমিক বিদ্যালয়, এপিবিএন পাবলিক স্কুল, কাশিপুর হাইস্কুল এন্ড কলেজসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের ওয়েব সাইট তৈরিতে নির্দেশনা ছাড়াও সকল তথ্য প্রয়োজন অনুযায়ী পাওয়া গেছে।
এসব ওয়েব সাইটের কন্ট্রোল প্যানেল নেই। শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে যা তৈরি করে দেয়া হয়েছে, তা কিভাবে পরিচালনা করা হবে তা একমাত্র তৈরিকারী আইটি প্রতিষ্ঠান অবগত।
এছাড়াও মাউশির প্রজ্ঞাপনে ওয়েব সাইটে বাধ্যতামূলক থাকা বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারীদের ছবিসহ ডাটাবেইজ, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ফিস গ্রহণ, প্রতিষ্ঠানের সকল অভ্যন্তরীন পরীক্ষার ফলাফল তৈরি ও অনলাইনে ডাউনলোডের সুবিধা, ছাড়পত্র, প্রশংসা পত্র, প্রত্যয়নপত্র, টটলিষ্ট ইত্যাদি তৈরির ব্যবস্থা, শিক্ষক কর্মচারীদের সৃষ্টপদ কর্মরত জনবল ও শুন্য পদের তথ্য, নোটিশ বোর্ড, স্ক্রলসহ প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ সংবাদ, ক্লাস রুটিন, পাঠ্যক্রম, সহশিক্ষার কার্যক্রম, পাবলিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা ভিত্তিক কর্নার, শিক্ষক কর্নার, শিক্ষার্থী কর্নার ও অভিভাবক কর্নার, বিভিন্ন প্রকার কনটেন্ট ডাউনলোড কর্নার, কার্যনির্বাহী পর্ষদ, একাডেমিক কাউন্সিলের পরিচিতি, ওয়েব সাইট অনলাইন ভিজিটরসহ মোট ভিজিটর, অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কাছে এসএমএস নোটিফিকেশন প্রেরন, শিক্ষক কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের হাজিরার তথ্য, শিক্ষক কর্মচারীদের ছুটি ব্যবস্থাপনা, স্যালারি সিট তৈরি ও প্রতিষ্ঠানের একাউন্টস, প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, ভৌত কাঠামো, মাষ্টার প্লান, একাডেমিক ক্যালেন্ডার, ছুটির তালিকা ও ক্লাস রুটিন, প্রয়োজনী ও গুরুত্বপূর্ন ওয়েব সাইট লিংক, ফটোগ্যালারি, প্রতিষ্ঠান প্রধানের বানী, প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ইমেইল করার অপশন ও যোগাযোগের ঠিকানা, কৃতি শিক্ষার্থীদের তথ্য, প্রাক্তন প্রতিষ্ঠান প্রধানসহ শিক্ষকদের তথ্যাবলি ও বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল।
এসব তথ্য সংযোজন করতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাজ করতে হবে। যার জন্য প্রত্যেকটির জন্য আলাদা পরিচয়ের ডাটাবেইজ থাকতে হবে। যা কন্টোল প্যানেলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ প্রতিনিয়িত হালনাগাদ করবেন। এই জন্য আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বা প্রতিষ্ঠানের কাউকে দক্ষ করার নির্দেশনাও রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৩০ এপ্রিল মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) প্রফেসর ড. এসএম ওয়াহিদুজ্জামান সাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে ওয়েব সাইট বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনা পেয়ে আইটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ওয়েবসাইট তৈরী করে দেয়া নিয়ে মাঠ দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের অজ্ঞতার সুযোগে ওয়েব সাইট তৈরির মান নয়, টাকা কম রাখার প্রতিযোগিতা করে আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রধানরা মান না বুঝে কম টাকায় ওয়েব সাইট তৈরি করে ফেঁসে যাচ্ছে। তাদের ফেঁসে যাওয়ার জন্য মাউশি কর্তৃপক্ষ কম দায়ী নয়।
উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজাররা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওয়েব সাইট হালনাগাদ ও যথাযথ তথ্য রয়েছে কিনা তা নিয়মিত তদারকি করবেন। ওয়েব সাইট তৈরির সঠিক দিক নির্দেশনা ও ত্রুটি বিচ্যুতি চিহ্নিত করে উপজেলা, জেলা শিক্ষা অফিসার এবং আঞ্চলিক উপ-পরিচালকের মাধ্যমে তিন মাস পর পর প্রতিবেদন মন্ত্রনালয়ে পাঠানোর নিয়ম রয়েছে।
এছাড়াও জেলা-উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা আইসিটি/সার্বিক) মনিটরিং করবেন।
কিন্তু এসব কিছু পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় পূর্নাঙ্গ ওয়েব সাইট তৈরি হচ্ছে না। অজ্ঞতায় থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানরা প্রতারিত হচ্ছেন। এমনকি পূর্নাঙ্গ ওয়েব সাইট তৈরি করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছে না।
অভিযোগ পাওয়া গেছে বাবুগঞ্জ উপজেলার দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওয়েব সাইট তৈরি করার জন্য ভুঁয়া আইটি প্রতিষ্ঠান টাকা নিয়ে পালিয়েছে।
অস্বচ্ছ ধারনা নিয়ে অনভিজ্ঞ আইটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপরিকল্পিত ওয়েব সাইট তৈরি করায় সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে। আর প্রায় ৩০০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা বিভ্রান্তি নিয়ে নির্দেশনা পালন করছে।
এ বিষয়ের সত্যতা স্বীকার করে জেলা শিক্ষা অফিসের রিসার্চ কর্মকর্তা নিটল মন্ডল বলেন, এখন পর্যন্ত কতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ওয়েব সাইট তৈরি করেছে তার সঠিক কোন হিসেব নেই। জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে তালিকা চেয়েছে। সে অনুযায়ী তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। পেলে জানা যাবে কতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মন্ত্রনালয়ের নির্দেশ পালন করেছে।
রিসার্চ কর্মকর্তা আরো বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি যে কয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট পরিদর্শন করেছেন। তার সিংহভাগ মন্ত্রনালয়ের চাহিদা পূরণ করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন তিনি।
এই সমস্যা শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের জন্য নয়, শিক্ষা কর্মকর্তাদের আইটি সম্পর্কে সামান্য বা সম্পূর্নভাবে অজ্ঞাত থাকায় হয়েছে।
তিনি জানান, মন্ত্রনালয়ের চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৮০ ভাগ পূরণ করতে পেরেছে একটি আইটি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া অন্যান্য আইটি প্রতিষ্ঠান মন্ত্রনালয়ের চাহিদার ১৮ কনটেন্টের বাটন তৈরি করে দিয়ে শুভংকরের ফাঁকি দিয়েছে। যাতে বিস্তারিত তথ্য সংযোজন বা পাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই।
কোন তদারকি না থাকায় দাড় করানো ওয়েব সাইটে চলছে মন্ত্রনালয়ের নির্দেশ পালন। এই অবস্থা থেকে এক সময় মুক্ত হবে। তবে সেটা কবে তার কোন সময় বলতে পারেননি তিনি।