শিক্ষা ও ভবিষ্যত হুমকির মুখে ঢাকায় গাঁজাসহ আটক আসামীর ভুল নাম ঠিকানা যাচাই না করায় নলছিটির কলেজ ছাত্র কারাগারে

সাইদ মেমন ॥ ভুয়া ঠিকানায় জামিন নিয়ে ফেরারী দন্ডপ্রাপ্ত মাদক ব্যবসায়ী আসামীর পরিবর্তে পুলিশের ভুলে সম্মান শ্রেণিতে (অনার্স) পড়–য়া কলেজ ছাত্র গত ৯ দিন ধরে ঝালকাঠি কারাগারে অন্তরীন রয়েছে। এই কারণে তার শিক্ষা জীবন থেকে একটি বছর হারিয়ে যাবে। এছাড়াও ভবিষ্যত হুমকির মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করেছে ছাত্রের পরিবার।
ঘটনার শিকার ছাত্র হলো- নলছিটি উপজেলার রায়াপুর গ্রামের মো. সুলতান তালুকদারের ছেলে মো. সুমন তালুকদার। সে পটুয়াখালী আব্দুল করিম মৃধা কলেজের ভুগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সম্মান প্রথম বর্ষের পরীক্ষার্থী।
স্বজন সূত্রে জানা গেছে, নলছিটি থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মিজানুর রহমান গত ২০ ফেব্রুয়ারি রায়াপুর গ্রামের নিজ ঘর থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে।
স্বজনরা অভিযোগ করেন, এএসআই মিজানুর রহমান কোন কিছু বোঝার ও জানার সুযোগ দেয়নি। পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি সুমনকে আদালতে পাঠানো (চালান) কাগজপত্রে উল্লেখ করেছেন সে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইনে তেজগাঁও থানায় করা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামী।
চালানে দেখা গেছে, ঢাকা মহানগর বিচার বিভাগীয় হাকিম (মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট) ৩০নং আদালতের তেজগাঁও থানায় ২০১০ সালের ১৪ এপ্রিলে করা ৩৮, জি আর ১৮১/১০ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইনের মামলার দন্ডিত আসামী। সেখানে আসামী হিসেবে লেখা রয়েছে, মো. সুমন (২২), পিতা- মো. সুলতান, গ্রাম- রায়াপুর থানা- নলছিটি জেলা- ঝালকাঠি। বর্তমান ঠিকানা ৭০/ন বাংলা মোটর, মসজিদবাড়ী থানা রমনা, ঢাকা।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ১৪ এপ্রিল পূর্ব তেজতুরী বাজার এলাকার ১৬৯ মিষ্টি ঘরের সামনে সকাল সাড়ে আটটায় অভিযান চালায় মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের একটি দল। ওই দপ্তরের তেজগাঁও সার্কেলের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন ভুঞার নেতৃত্বে দলটি ২১০ গ্রাম ওজনের গাঁজা ভর্তি ঠোংঙ্গাসহ চালানে উল্লেখ করা ঠিকানার মো. সুমনকে (২২) আটক করে। ওই ঘটনায় তেজগাঁও থানায় এসআই আনোয়ার হোসেন ভুঞা বাদী হয়ে একমাত্র মো. সুমনকে (২২) আসামী করে মামলা করে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের গুলশান সার্কেলের উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুমুনুর রহমান একমাত্র সুমনকে অভিযুক্ত করে ২০১০ সালের ৫ মে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশীট) জমা দেয়।
ঢাকা মহানগর বিচার বিভাগীয় ৩০নং আদালতের হাকিম ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর ওই মামলার রায় দেন। মামলার আসামী মো. সুমনকে (২২) দেড় বছরের কারাদন্ড দেন। গাঁজাসহ সুমনকে আটকের সময় উল্লেখ করা বয়স পাঁচ বছর পরে দেয়া রায়েও একই ছিল।
ঝালকাঠির জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম (সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট) আদালতে করা মানবিক কারণে জামিনের প্রার্থনা করে আইনজীবীর আবেদনে উল্লেখ করা হয়, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সুমুনুর রহমান আসামীর ঠিকানা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য (ইনকোয়ারি স্লিপ) না পাঠিয়ে অসম্পূর্ণ (ইনকমপ্লিট) অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে।
এতে আসামী জামিনে বের হয়ে আর হাজির হয়নি। যার কারণে ফেরারী আসামী হিসেবে আদালতের করা গ্রেপ্তারী পরোয়ানায় নলছিটি থানার এএসআই মিজানুর রহমান বেআইনীভাবে এবং ভ্রমাত্মকভাবে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে সে ঝালকাঠি কারাগারে রয়েছে।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনের সম্মান শ্রেণির প্রথম পর্বের পরীক্ষা শুরু হয়। ওই পরীক্ষার সুমন পরীক্ষার্থী হওয়ার মানবিক কারণে করা জামিনে আবেদনে বিভিন্ন প্রমাণপত্র দেয়া হয়। মামলায় গাঁজাসহ গ্রেপ্তারের সময় ২০১০ সালের ১৪ এপ্রিল সুমন নবম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে রায়াপুর সৈয়দ আব্দুল লতিফ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণের জন্য শ্রেণি কক্ষে উপস্থিত ছিল। স্কুলের হাজিরা খাতাসহ জন্ম এবং যাবতীয় শিক্ষা সনদ, সম্মান শ্রেণির প্রবেশ পত্র ও পরীক্ষার রুটিনও আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকা মহানগর বিচার বিভাগীয় ৩০নং আদালতের বিষয় হওয়ায় সুমন জামিন পায়নি।
কারন্তরীন থাকায় গত ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। এছাড়াও আগামী ১৩ মার্চও তার পরীক্ষা রয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সুমুনুর রহমান বলেন, আসামী গ্রেপ্তার থাকায় ও স্বল্প সময়ের মধ্যে চার্জশীট জমা দিতে হয়। তাই আসামীর ঠিকানা যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয়নি।
নলছিটি থানার ওসি (তদন্ত) মো. কামরুজ্জামান বলেন, গ্রেপ্তারী পরোয়ানা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এসে পৌছানোর পর যাচাই-বাছাই করা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানো হয়। থানা আসামীর সম্পর্কে গ্রাম্য চৌকিদারসহ বিভিন্ন উৎস্য থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। এক্ষেত্রে ভুল হওয়ার সুযোগ থাকে না।