শিকল বেঁধে ঢাকা থেকে কুয়াকাটায় আনা হয়েছে জেলে রাসেলকে

রুমান ইমতিয়াজ তুষার, কুয়াকাটা ॥ পর্যটক সহ সাধারন যাত্রী বোঝাই পরিবহনে সবাই যখন স্লিপিং চেয়ারে হেলান দিয়ে আয়েশ করছিলো ঠিক তখন শিকলে পা বাঁধা জেলে রাসেল ড্রাইভারের পাশে ইঞ্চিন কভারে বসে লজ্জায় অপমানে মাথা নিচু করে কাঁদছিলো। চুরি ডাকাতি বা সাজা প্রাপ্ত আসামি না হয়েও জেলে রাসেলকে দেয়া এমন অপমান যেন এই স্বাধীন দেশের সভ্য সমাজকে মাথা নীচু করে দিয়েছে। দাদনের কিছু টাকা আদায় করতে ঢাকার নারায়নগঞ্জের বাসা থেকে ধরে এনে গত ৫ মে সকালে সায়েদাবাদ থেকে পায়ে শিকল বেঁধে পরিবহনে দেশে পাঠায় মহাজন ফেরদৌস মেম্বর। মাত্র দের হাজার টাকার বিনিময় কুয়াকাটা এক্সপ্রেস নামের পরিবহনের স্টাফরা এমন জঘন্য কাজের সহযোগীতা করেছে অথচ তাদের হাতে এদেশের যাত্রী সেবা।
জেলে রাসেল (২২) কান্না জড়িত কন্ঠে জানায়,কুয়াকাটার চর চাপলীর মহাজন ফেরদৌস মেম্বরের কাছ থেকে দুই বছর আগে ৫ হাজার টাকা দাদন নেই। সাগরে ইলিশ না থাকায় লোকসান হওয়ায় অন্য জাইল্লার পাশাপাশি তার ভাগে ৩২ হাজার টাকা ধার্য করা হয়। সেই টাকা শোধ করতে ঢাকা নারায়নগঞ্জ এসে লেবারের কাজ শুরু করি এক বছর আগে থেকে। গত পনের দিন আগে ১৩ হাজার টাকা শোধ করি মহাজনকে। বাকি উনিশ হাজার টাকা কাজ করে শোধ করে দিবো বলে মহাজনকে জানাই। কিন্তু আমার কথা না শুনে ৫ মে সোমবার সকালে নারায়নগঞ্জ দেলপাড়া বাসা থেকে মহাজন নিজে গিয়ে আমাকে বলে, চল সায়েদাবাদ থেকে গাড়ীতে একটা লোক পাঠামু তুই সাথে থাকবি। আমি না খেয়ে তার সাথে আসি। পরে কুয়াকাটা এক্সপ্রেসের সুপারভাইজার ও হেলপারের সাথে কথা বলে আমারে গাড়িতে উঠায়। আমার কাছে মহাজন টাকা পাইবে আমি পালাইয়া যামু এ্ই কারনে গাড়ীর হেলপার আমার পয়ে শিকল বাইন্দা তালা দিয়া দেয়।
চোখের পানি মুছতে মুছতে রাসেল বলে স্যার আমি কি চুরি করছি বলেন ? আমরা গরীব দেইখ্যা আমাগোকি কোন ইজ্জত নাই।
জেলে রাসেল’র গ্রামের বাড়ি কুয়াকাটার চর চাপল্।ী বাবা জেলে নশা প্যাদা। সংসারে বাবা মা সহ দুই ভাই তিন বোন। ভাই বোনদের মধ্যে রাসেল চতুর্থ। বড় ভাই আলাদা থাকে বাবা জেলে নসু প্যাদা ও রাসেল মহাজনের ট্রলারে কখনো সাচরা মাছ কখনো ইলিশ মাছ ধরে সংসার চলে। পরপর দুই বছর সাগরে তেমন ইলিশ না পরায় অনেক দেনা হয়ে যান রাসেলের পরিবার। তার উপর দুই বোনের বিয়ে দেয়া। ছোট বোনটি স্কুলে পড়ছে। দেনা শোধ করে ছোট বোনটিকে বিয়ে দিয়ে পরে নিজে বিয়ে করবেন এমন স্বপ্ন তার। কিন্তু দাদান যেন সে স্বপ্ন পূরন করতে দেবেনা।জেলে রাসেলর ভাষায়, দাদান এমন জিনিস কারেন্ট জালের মত একবার আটকাইলে আর ছোডা যায়না।
জেলে রাসেলের বয়সের যুবকরা এখন কেউ স্কুল কলেজের বারান্দায় ঘুরে নিজের জীবনটা গড়ার স্বপ্ন দেখছে আবার কেউ কেউ রাজনীতি করে নেতা হওয়ার কথা ভাবছে, কেউ আবার দখল আর চাঁদাবাজী করে মাল কামাচ্ছে কিন্তু রাসেল ! দরীদ্র পরিবারের বোঝা আর মহাজনদের দেনার ভার বইতে বইতে যেন ক্লান্ত। আজ সামান্য সেই দেনা শোধ করতে না পারায় তার পায়ে শিকল,এমন জীবনকে অভিশাপ মনে হয় রাসেলের। গাড়ীতে রাসেলের পায়ে শিকল বাঁধা দেখে প্রথমে অনেক যাত্রী মনে করছেন কোন সাজা প্রাপ্ত আসামি হবে। পরে আস্তে আস্তে যখন জানতে পরেন, একজন জেলেকে এমন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পাওনা টাকা আদায় করতে! যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রথম সাড়ির চার নম্বর সিটে বসা একজন ভদ্র মহিলা কেঁদে ফেললেন। তার প্রবাসি স্বামী বাইজিদ আহম্মদ বললেন, এরাওকি মানুষ ! এ দেশে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা লোট-পাট হয় তার কোন খবর নাই আর কটা টাকার জন্য একটা গরীব জেলের প্রতি কি অবিচার। তবে যাত্রীদের ক্ষোভ আর অনুরোধে মাঝপথে রাসেলের পায়ের শিকল খুলে দিলেও যাত্রীদেরকে শর্ত দেয়া হয় সে যাতে পালিয়ে না যায়। এবং কুয়াকাটার আলীপুর বন্দরে মহাজনের লোকদের হাতে পৌছাতে হবে।এমন কথা খুব সহজে বলে দিলেন ঢাকা মেট্রো ব-১১-৬৮৭২ কুয়াকাটা এক্সপ্রেস পরিবহনের সুপারভাইজার তপন। কারন হিসেবে বলেন, ওকে কুয়াকাটা পৌছানোর জন্য আমাদের দায়ীত্ব দেওয়া হইছে। যাতে সে পালাইয়া না যায় সেই জন্য শিকল দিয়া বাইন্দা আনা হইছে। এর বিনিময় কত টাকা মহাজন আপনাদের দিয়েছেন জানতে চাইলে তপন জানান, কোন টাকা পাইনাই। ড্রাইভার ওয়াদুদ বলেছেন আমার বিষয়টি জানা ছিলো গাড়ীতে এসে ওর পায়ে শিকল বাঁধা দেখি। মহাজন ফেরদৌস মেম্বর বলেছেন, আমার বোটের ৫জন জাইল্ল্যা দাদন খাইয়া পলাইছে। ওরে ঢাকা থেকে ধর্ইরা গাড়ীতে উঠাইয়া দিছি। আমি সাথে না থাকায় শিকল দিয়া বাইন্দা পাডাইছি। ওর কাছে আমি ৪৫ হাজার টাকা পাই। সকাল ৮টায় ছেড়ে আসা গাড়ীটি রাত ৮টায় কুয়াকাটার আলীপুর বন্দরে পৌছলে রাসেলকে ধরে নেবার জন্য অপেক্ষা করেন মহাজনের কয়েকজন লোক। ড্রাইভার ওয়াদুদ গাড়ী দাড় করিয়ে তাদের কাছে নিজে সোপর্দ করেন জেলে রাসেলকে। জেলে রাসেল বলেছেন মূল টাকা ৫ হাজার আর মহাজন বলছেন ৪৫ হাজার কোনটি সঠিক হবে? কাগজের মারপ্যাচে হয়তো মহাজনরাই জিতবে কিন্তু জেলে রাসেলরা এমন অবহেলা, অপমান, নির্যাতন সয়ে আর কত দিন সৎউপার্জনের জন্য নিজের জীবনের সাথে লড়াই করবে? নাকি এমন করেই নষ্ট হয়ে যায় রাসেলদের জীবন ?