লেবুখালী সেতু নির্মাণ কাজ শুরু নিয়ে সংশয়

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ কুয়েত উন্নয়ন তহবিলের সাথে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় চার বছর পরেও বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা/বরগুনা মহাসড়কের লেবুখালীর কাছে পায়রা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের বিষয়টির আরো এক দফা ঝুলে পড়ার আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ কালক্ষেপনের পরে প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ লেবুখালী সেতু নির্মাণে গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রাক যোগ্যতা সম্পন্ন ৪টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপত্র প্রস্তাব গ্রহণ করা হলেও সড়ক অধিদপ্তরের প্রাক্কলিত দরের দ্বিগুনেরও বেশী প্রস্তাব পেশ করেছে সর্বনি¤œ দরদাতা। ৪৮০ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ ঐ সেতু নির্মাণে সর্বনি¤œ দর প্রস্তাব পেশকারী নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার ২২ কোটি টাকার প্রস্তাব পেশ করেছে বলে জানা গেছে। দ্বিতীয় সর্বনি¤œ দরদাতা প্রায় সাড়ে ১১শ কোটি টাকা, তৃতীয় নি¤œ দরদাতা প্রায় ১৩শ কোটি টাকা এবং সর্বোচ্চ দর প্রস্তাব পড়েছে প্রাক্কলিত দরের ৪ গুনেরও বেশী, প্রায় ১হাজার ৭শ কোটি টাকা।
ফলে ২০১১ সালে কুয়েত উন্নয়ন তহবিলের সাথে খসড়া ঋণ চুক্তি এবং ২০১২-এর ১৩ মার্চ চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় সাড়ে ৩ বছর পরে দর প্রস্তাবসমূহ গ্রহণ করা হলেও সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরুর বিষয়টি চরম অনিশ্চয়তায় পড়তে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধীক দায়িত্বশীল মহল। সেতুটি নির্মাণে ৮০ভাগ অর্থই কুয়েত উন্নয়ন তহবিল থেকে দেয়ার কথা। ২০১৩ এর মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লেবুখালী সেতুর ভিত্তি প্রস্তরও স্থাপন করেছিলেন। ২০১২-এর মে মাসে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি-একনেক এর চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে।
এ প্রকল্পটি দেখিয়ে পটুয়াখালীর ক্ষমতাসীন দলের নেতৃবৃন্দ অনেক রাজনৈতিক বক্তব্যও প্রদান করে আসছেন বছরের পর বছর ধরে। কিন্তু মূলত নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার রাস্তা শুধু লম্বা হয়েছে গত কয়েক বছরে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জবাবদিহিতাহীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জনগণের কাছে নুন্যতম কোন দায়িত্ব বোধের পরিচয় দেননি গত কয়েক বছরে।
মূলত ২০০৬সালে প্রস্তাবিত লেবুখালী সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরে সে সময়ের দর অনুযায়ী সড়ক অধিদপ্তর যে খসরা তৈরী করে, তার ভিত্তিতেই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটির পরিপূর্ণ দরপত্র দলিল প্রস্তত করায় এ বিপত্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। অথচ গত ৯বছরে সড়ক অধিদপ্তরের সব ধরনের প্রকল্প ব্যয়ের দর দ্বিগুনেরও বেশী বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সড়ক অধিদপ্তরে ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত ও অগ্রাধিকার প্রকল্প তালিকাভূক্ত’ একমাত্র প্রকল্প হিসেবে লেবুুখালী সেতু নির্মাণের বিষয়টি সর্বাধীক গুরুত্ব লাভের কথা থাকলেও তার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া সহ নানা জটিলতায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুধু পেছাচ্ছে। গত ৩০সেপ্টেম্বর লেবুখালী সেতুর দর প্রস্তাবসমূহ গ্রহণের পরে এখন তার কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন চলছে বলে জানা গেছে। চলতি মাসের মধ্যেই এসব মূল্যায়ন শেষে পুরো প্রস্তাবসমূহ সড়ক অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো হবে। এর পরে সেখান থেকে বিষয়টি নিয়ে সড়ক ও সেতু মন্ত্রনালয়ের সিদ্ধান্তের জন্য প্রেরণ করা হতে পারে। মন্ত্রনালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনকে বিষয়টি অবহিত করার পরে বহিঃসম্পদ বিভাগ ইআরডি’র মাধ্যমে কেএফআইডি’র সাথে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে আলাপ আলোচনা শুরু হতে পারে বলে একাধীক দায়িত্বশীল সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে সরকারের উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারক মহলের আন্তরিকতার উপর।
আরো কয়েক মাস আগেই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল থেকে লেবুখালী সেতুর নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে কেএফআইডি’র দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। ‘বহিঃসম্পদ বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেলে বিষয়টি বিবেচনার’ও আশ্বাস দিয়ে রেখেছিল কেএফআইডি প্রতিনিধি দল। তবে দাতা সংস্থাটির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক পর্যায় থেকে এব্যাপারে এখনো কোন সুষ্পষ্ট ধারনা পাওয়া যায়নি বলে প্রকল্প সংশিষ্ট মহল জানিয়েছে।
প্রকল্পটির অওতায় বরিশালÑপটুয়াখালীÑবরগুনা/কুয়াকাটা মহা সড়কের অন্যতম প্রতিবন্ধক পায়রা নদীর ওপর ১হাজার ৪৭০মিটার দীর্ঘ চার লেন বিশিষ্ট একটি সেতু নির্মাণের কথা। এরমধ্যে মূল নদীর ওপর সেতুর দৈর্ঘ ৬৩০মিটার। নদীর দুপাড়ে ‘সংযোগ সেতু বা ভায়াডাক্ট’ থাকছে ৮৪০মিটার। সেতুটির দু প্রান্তে ৮৯০মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের লক্ষ্যে প্রায় ১২হেক্টর জমি হুকুম দখল প্রক্রিয়াও ইতোমধ্যে শেষ পর্যায়ে।
কিন্তু এতবড় একটি সেতু এবং প্রায় ১কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন ৪ লেন সংযোগ সড়ক নির্মাণে ২০০৬ সালের প্রাক্কলন অনুসরণ করে ঋণচুক্তি স্বক্ষরের ৪বছর পরে দরপত্র আহবানের বিষয়টিকে নির্মাণ বিশেষজ্ঞগণ মানতে পারছেন না। বিষয়টিকে নির্মাণ বিশেষজ্ঞগণ সড়ক অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট মহলের দায়িত্বহীনতার সামিল বলে মনে করলেও প্রকল্প সংশ্লিষ্টগণের মতে ‘এ সেতুর নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি ইতোপূর্বেই মন্ত্রনালয়, ইআরডি ও দাতা সংস্থাকে অবহিত করা হয়েছে’।
এমনকি বরিশালÑপিরোজপুরÑমোংলাÑখুলনা মহাসড়কের বেকুঠিয়া এলাকায় কঁচা নদীর ওপর সম পরিমান দৈর্ঘের একটি সেতু নির্মাণে ১হাজার কোটি টাকার খসরা প্রাক্কলন করা হয়েছে ইতোমধ্যে। চীন সরকার প্রকল্প ব্যয়ের ৮০ভাগ অর্থ, ১০কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৮শ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে মঞ্জুরী প্রদানে ইতোমধ্যে প্রাথমিক কার্য বিবরণীও স্বাক্ষর করেছে ।
সেখানে পায়রা নদীর ওপর সমান দৈর্ঘের সেতু নির্মাণে ২০০৬সালের প্রাক্কলন নিয়ে ২০১৫সালে দর প্রস্তাব গ্রহণকে উদ্ভট চিন্তা বলেও মনে করছেন কারিগরি বিশেষজ্ঞগণ। এর ফলে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন আরো কত বছর পিছিয়ে পড়বে তা বলতে পারছেন না কেউ। কয়েক দফার সংশোধনের পরে ২০১৮ সালের মধ্যে সেতুটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার কথা থাকলেও তা ২০২০ সালে শেষ হবে কিনা সে বিষয়ে সন্দিহান ওয়াকিবাহাল মহল।
উল্লেখ্য বরিশালÑপটুয়াখালীÑকুয়াকাটা মহাসড়কের ৬টি ফেরি পয়েন্টের মধ্যে পটুয়াখালী ও আলীপুরে ২টি সেতুর নির্মাণ কাজ শেষে ইতোমধ্যে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে কলাপাড়া সেতুটিও চালু হতে যাচ্ছে। হাজীপুর সেতুটিও ডিসেম্বরের মধ্যে খুলে দেয়া হবে। কিন্তু লেবুখালীতে প্রায় ৯বছর আগের প্রাক্কলন নিয়ে দীর্ঘ দৌড় ঝাপ আর নানামুখি কালক্ষেপনের পরে প্রাক্কলনের দ্বিগুনেরও বেশী দর প্রস্তাব সেতুটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরো কত পেছাবে তা বলতে পারছেন না কেউই।