লিবিয়ায় আইএস’র গুলিতে বাবুগঞ্জের আরিফ নিহত

রুবেল খান॥ মা লিবিয়ায় যুদ্ধ চলছে। দেশের অনেক মানুষ জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামী ষ্টেট (আইএস) সদস্যের গুলিতে মারা যাচ্ছে। এ দেশে থাকতে আর মন চাইছে না। তোমাদেরকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। বছরের শেষ দিকে দেশে ফিরে আসব। এখন আসলে তোমাদের জন্য কিছু নিয়ে আসতে পারবো না। কিন্তু আমার বাবার সেই স্বপ্ন আর পূরন হলো না। দেশে ফেরার আগেই আইএস’র গুলিতে প্রান হারাতে হলো আমার কলিজার টুকরা বড় ছেলে আরিফকে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ভাঙ্গা কন্ঠে বিলাপ করতে করতে ছেলের কাছ থেকে সোনা জীবনের শেষ কথা গুলো বলতে গিয়ে ধেই ধেই করে কেদে ফেলেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার লোহালিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালম মাষ্টারের স্ত্রী ও লিবিয়ায় আইএস’র গুলিতে নিহত আরিফুল করিম সিদ্দিক’র হতভাগি মা রাবেয়া বেগম।
নিহতের বাবা আবুল কালাম মাষ্টার জানান, ২০১০ সালে তার ছেলে পরিবারের অস্বচ্ছলতা দূর করতে জীবীকার সন্ধানে সুদান যায়। এর এক বছর পর ২০১১ সালে সেখান থেকে লিবিয়ায় যান ২৫ বছর বয়সী যুবক আরিফুল করিম সিদ্দিক। সেখানে শরিকা নামক প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা কর্মী’র কাজ করার পাশাপাশি সেখানকার বলদিয়া পরিষদের আল ফোকর এলাকায় বসবাস করত। গত চার বছর সেখানে চাকুরী করে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতো আরিফ। সে প্রতিমাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেতন পেত। তবে লিবিয়ায় যুদ্ধ চলায় গত নভেম্বর থেকে দেশে টাকা পাঠাতে পারেনি সে।
তিনি জানান, বাবুগঞ্জের কেদারপুর ইউনিয়নের দক্ষিণা ভুতুর দিয়া গ্রামে তাদের বাড়ি ছিল। নদী ভাঙ্গনে তা বিলীন হয়ে যায়। বিদেশ থেকে পাঠানো ছেলের টাকায় লোহালিয়া গ্রামের মোল্লাবাদি মসজিদ সংলগ্নে একটি বাড়ি করে সেখানেই বসবাস করছেন সবাই। কিন্তু যার টাকায় নির্মাণ করা হয়েছে তার সৌভাগ্য হয়নি বাড়িটি দেখার।
আবুল কালাম বলেন, প্রতিদিনই আরিফ একবার করে ফোন দিয়ে আমাদের খোঁজ খবর নিতো। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে ছোট ভাই আনিছুর রহমানের কাছে ফোন করে আরিফ। যানতে চায় বাড়ির সবাই কেমন আছে। মা এবং বাবার সাথেও দীর্ঘক্ষন কথা বলে। এসময় আরিফ তার মাকে জানায়, লিবিয়ায় অনেক যুদ্ধ হচ্ছে। আইএস এখানকার সাধারন মানুষদের দেখলেই গুলি করে মেরে ফেলছে। তাই এখানে আর মন টিকছে না। কিন্তু চাইলেই দেশে ফিরতে পারছি না। তাই আগামী নভেম্বরে দেশে ফিরে আসবো। মাও তাকে সাবধানে থাকতে বলেন।
আবুল কালাম আরো জানায়, প্রতিদিন ফোন করলেও মঙ্গলবার সারাদিন এমনকি রাতেও আরিফ ফোন করেনি। ভেবে ছিলাম হয়তো কাজের চাপ বেশি তাই পরে কল দিবে। কিন্তু হঠাৎ করে বুধবার সকালে বিদেশী নম্বর থেকে তার মোবাইলে একটি কল আসে। তবে সে কলটি আমাদের পরিবারের জন্য যে বড় ধরনের একটি দুঃসংবাদ বয়ে আনবে তা ভাবিনি।
তিনি বলেন, আরিফের বাংলাদেশী সহকর্মী বিল্লাল হোসেন আমাকে ফোন দিয়ে বলে, কাকা আপনি ভেঙ্গে পড়বেন না। তাড়াতাড়ি বাড়িতে গিয়ে ঘনিষ্ঠ কারো কাছে মোবাইলটি দিন। আপনার ছেলে দুর্ঘটনা কবলিত হয়েছে। একথা শুনে মনটা কেমন যেন করছিলো। বাসায় যেতেই মনির নামে আরেক সহকর্মী কল দিয়ে তার প্রতিবেশীকে জানায়, মঙ্গলবার রাতে আইএস’র গুলিতে আরিফ মারা গেছে। তার লাশ সেখানকার মর্গে রাখা হয়েছে। এমন সংবাদে বাবা-মা, বড় বোন এবং ছোট ভাই সহ কান্নায় ভেঙ্গে স্বজনরা। ছেলে হাড়া কান্না আর বুকফাটা আর্তনাদে ভাড়ি হয়ে ওঠে এলাকার আকাশ-বাতাস। ছেলের শোকে হতভাগি মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলার একদিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তার জ্ঞান ফেরে। সেই থেকে অনাহারে মা ছেলের শোকে পাথর হয়ে আছে।
আরিফের ছোট ভাই মা-বাবা এন্টারপ্রাইজের প্রভাইডার মো. আনিসুর রহমান লিবিয়ায় তার ভাইয়ের সহকর্মীদের বরাদ দিয়ে জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর আরিফ অফিস থেকে বাসায় ফিরে বাংলাদেশি ৫ বন্ধুর সাথে একটি মাইক্রোবাসে পার্শ্ববর্তী বাজারে কেনা কাটা করতে যান। গাড়িটি বাজারের সামনে থামতেই আইএস’র সদস্যরা গাড়িটি লক্ষ করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। এসময় তারা জীবন রক্ষায় গাড়ি থেকে বাইরে লাফিয়ে পড়ে। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। আইএসদের গুলি তার ভাই সহ দুই বাংলাদেশির মাথায় লাগলে ঘটনাস্থলেই তারা মারা যায়। এছাড়া বাকি তিনজন শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়। পরবর্তীতে তাদের স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বুধবার সকালেই নিহত আরিফ সহ দুই বাংলাদেশী যুবকের মরদেহের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তাছাড়া আরিফের কক্ষে সাড়ে ৩ লাখ টাকার মত পাওয়া গেছে। আরিফের লাশ দেশে ফিরিয়ে দিতে সহকর্মীরা চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে তাতে কমপক্ষে ১৪/১৫ দিন সময় লাগবে বলেও জানিয়েছে নিহতের ছোট ভাই।