রোয়ানু’র আঘাতে উপকূলের অনেক এলাকা তছনছ

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মাঝারী মাত্রার ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ গতকাল শেষ রাতে পশ্চিম উপকূলের সুন্দরবন এলাকায় প্রথম আঘাত হেনে গোটা উপকূল ভাগকে অনেকটাই তছনছ করে দেয়। ঝড়টি দুপুরের পরে ভোলার দক্ষিণভাগ অতিক্রম করে সন্ধ্যার দিকে সবলেই হাতিয়া-সন্দ্বীপ উপকূল অতিক্রম করে ভূূূূভাগে আঘাত হেনে কিছুটা দূর্বল হয়ে যায়। ঝড়ের তান্ডবে ঘর চাপা পরে পটুয়াখালীর দশমিনা ও ভোলার তজুমদ্দিনে ৩ জনের প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে। রেডক্রিসেন্ট-এর ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচীর প্রায় ৫৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক শুক্রবার সকাল থেকে গতকাল দিনভরই উপকূলবাসীকে সতর্ক করা সহ উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয়। গতকাল সকাল থেকে প্রায় ৫ লাখ নারী-পুরুষ ও শিশুকে উপকূলের ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করা হয়। সন্ধ্যার আগেই দক্ষিণ উপকূলের আশ্রয় কেন্দ্রগুলো থেকে আশ্রিতরা ঘরে ফিরে গেলেও ভোলা উপকূলের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু অবস্থান করছিলো। এ ঝড়ের ছোবলে উপকূলের বিপুল সংখ্যক গাছপালা ও কাঁচা ঘর বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিস্তারিত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
বরিশাল মহানগরী সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে রাত ৩টার আগেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। যা গতকাল সন্ধ্যা নাগাদ পুনর্বহাল করা হয়। গোটা উপকূলের হাজার হাজার হেক্টর জমির উঠতি বোরো ও পরিপক্ক আউশ ধান সহ বিপুল পরিমান আগাম আমন বীজতলাও বিনষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন সবজির প্রায় পুরোটাই বিনষ্ট হয়েছে এ ঝড়ে। উপকূলের কলাপাড়াতে গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত প্রায় ২শ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এসময় বরিশালে বৃষ্টি হয়েছে দেড়শ মিলিমিটারেরও বেশী। গোটা বরিশাল মহানগরী পানির তলায় চলে যায় গতকাল সকালের আগেই। নগরীর অনেক রাস্তায় জাল ফেলে মাছ ধরতেও দেখা যায় এসময়। শিশুরা সাতার কেটে আনন্দ ফূর্তিও করেছে নগরীর নবগ্রাম রোড সহ কয়েকটি সড়কের ওপর। দুপুর ৩টা পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলেও সন্ধ্যা পর্যন্তই ঝড়ো হাওয়া বইছিল। তবে বিকেল ৪টা দিকে কয়েকবারই মেঘের আড়াল থেকে সূর্য কয়েক মিনিটের জন্য বেরিয়ে এসে রোদ ছড়িয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু গতকাল শেষ রাতে খুলনা-বাগেরহাট উপকূলের সুন্দরবনে প্রথম আঘাত হানার পরে ক্রমে তা পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে। সকাল ১০টা মধ্যে কুয়াকাটাÑকলাপাড়া উপকূল অতিক্রম করে ঝড়টি আরো পূর্বদিকে এগুতে থাকে। কলাপাড়া রাডার স্টেশন দমকার আকারে ঝড়ের তীব্রতা ঘন্টায় ৮০ কিলোমিটার রেকর্ড করলেও গড়ে তা ছিল ৬০-৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত। এর পরে ঝড়টি খুবই ধীরে দেশের পূর্ব উপকূলের দিকে এগুতে থাকে।
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু’র প্রভাবে বরিশাল মহনগরী সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় শুক্রবার রাত ৩টার মধ্যে। দিনভর ঝড়বৃষ্টির কারণে সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়নি। তবে ওজোপাডিকো’র কর্মীরা দুপুরের দিকে কাজে নামলেও কাশীপুর ও পলাশপুর ৩৩ কেভী সাব-স্টেশনমুখি ৩৩ হাজার ভোল্টের সঞ্চালন লাইনগুলো চালু করে বিতরণ ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা সম্ভব হয়নি।
রোয়ানু’র কারণে শুক্রবার বিকেল থেকে বরিশাল নদী বন্দর সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়া হয়। ভোলাÑলক্ষ্মীপুর ও ভোলাÑবরিশাল ফেরি সার্ভিসটিও শুক্রবার সন্ধ্যায় বন্ধ করে দেয় হয়। অপরদিকে রাজধানীর সাথে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংক্ষিপ্ত সড়ক পথের মাওয়া-কাওড়াকান্দী সেক্টরে ফেরি সার্ভিস রাতভর চালু থাকলেও প্রচন্ড ঝড়ো হওয়ার কারণে গতকাল সকাল ৭টার পরে ঐ ফেরি সার্ভিসটিও বন্ধ করে দিতে হয়। পাটুরিয়াÑদৌলতদিয়া সেক্টরে রো-রো ফেরিগুলো দিন-রাতই যানবাহন পারাপার করছিল।