রেকর্ড ভাঙ্গা বর্ষণে নগরীর ৮০ ভাগ এলাকা প্লাবিত

রুবেল খান ॥ ভারতের উরিষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চল এলাকায় অবস্থানরত স্থল নিম্নচাপের কারনে নগরীসহ সমগ্র উপকুলীয় এলাকায় মৌসুমের তিন দিনের রেকর্ড ভাঙ্গা ভয়াবহ লাগাতর বর্ষনে জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। মহানগরীর প্রায় ৮০ ভাগ এলাকা পানির তলায়। প্লাবিত হয়েছে। নগরীর প্রান কেন্দ্র সদর রোড থেকে শুরু করে প্রায় প্রত্যেকটি অলিগলির কোথাও হাটু সমান আবার কোথাও কোমড় সমান জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি জোয়ারের কারনে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বসত বাড়ির ভেতরে পানি প্রবেশ করেছে। এর ফলে নগর জীবনে নেমে এসেছে দুর্বিষহ ভোগান্তি। গৃহবন্ধি হয়ে পড়েছে লাখ মানুষ। শুধুমাত্র নগরীতেই নয়, পটুয়াখালী, কলাপাড়া, ভোলা ও বরগুনা সহ দক্ষিনাঞ্চলের বিশাল এলাকার গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
এদিকে নিম্নচাপের প্রভাবে জলাবদ্ধতার কারনে অষোষিত ভাবে বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে নগরী সহ আশ পাশের জেলা উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ঝড়-ঝাপটা মাথায় নিয়ে সকালে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে এসেও ফিরে গেছে। এমনকি দুর্যোগপূর্ন আবহাওয়ার কারনে বরিশাল নদী বন্দর হতে বরিশাল-ঢাকা সহ অভ্যন্তরীন সকল রুটের নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া বরিশাল-ভোলা, ভোলা-লক্ষ্মীপুর ছাড়াও মনপুরা, চরফ্যাশন, হাতিয়া রুটেও সব যাত্রীবাহী নৌযানের চলাচলও বন্ধ রাখা হয়েছে। লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও মাওয়া সেক্টরের কাঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌপথেও।
অপরদিকে, বৃষ্টির কারনে স্বাভাবিক দিনের তুলনায় গতকাল শনিবার নগরীতে গন-পরিবহন চলাচল এবং সাধারন মানুষের উপস্থিতি কম ছিলো।
আবহাওয়া বিভাগ থেকে আজ রোববার সকাল ১১টা পর্যন্ত বরিশাল ও খুলনা সহ সমগ্র উপকুলীয় এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষনের আশংকার কথা জানান হয়েছে। এ নিম্নচাপের কারনে উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করায় গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব মেঘমালা উপকুলভাগ সহ দক্ষিনাঞ্চলে ধেয়ে এসে সাম্প্রতিকালের ভয়াবহ বৃষ্টি ঝড়াচ্ছে দক্ষিনাঞ্চল সহ সমগ্র উপকুলভাগে। আবহাওয়া বিভাগ উপকুলীয় দ্বীপসমুহের চরাঞ্চল ১-২ফুট বায়ুতারিত জলোচ্ছাসে প্লাবিত হবার আশংকার কথাও জানিয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে সব মাছধরা ট্রলার ও জেলে নৌকাসমুহকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
বরিশাল আবহওয়ায় অফিসের সিনিয়র পর্যবেক্ষক প্রণব কুমার রায় জানান, গত ১৮ অক্টোবর থেকে নগরী সহ আশ পাশের জেলা-উপজেলাগুলোতে কখনো হালকা থেকে মাঝারী আবার কখনো ভারি বর্ষন হচ্ছে। তবে বৃষ্টির পরিমান বেড়ে যায় ১৯ অক্টোবর রাত থেকে। ওইদিন রাত থেকে গতকাল ভোর রাত পর্যন্ত বিরামহীন বর্ষনের পাশাপাশি গতকাল বিকাল থেকেই দমকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়া অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী গত ১৮ অক্টোবর থেকে গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত মোট ২৪১ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র গত ২০ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে গতকাল ২১ অক্টোবর সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৯৩ দশমিক ০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
এদিকে সমুদ্রে নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়াতে বরিশাল নদী বন্দরের জন্য গত ২০ অক্টোবর ২ নম্বর ও পায়রা সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়। যা গতকালও অপরিবর্তিত ছিলো।
এদিকে, গতকাল শনিবার বিকাল থেকে আবহাওয়া অনেকটা অনুকুলে ছিলো। বৃষ্টি কমে গেলেও আকাশে মেঘমালার উপস্থিতি ছিলো। হালকা রোদের দেখাও মেলে নগরীতে। কিন্তু পরবর্তীতে আবহাওয়া পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটে। সাথে শুরু হয় দমকা হাওয়া।
অপরদিকে রেকর্ড পরিমান বৃষ্টির কারনে নগরীর প্রায় ৮০ ভাগ এলাকা পানির নিচে ডুবে আছে। পুকুর এবং খাল ভরাট করে ইমারত নির্মানের কারনে জমে থাকা পানি নামতে পারছে না। আবার কোথাও কোথায় স্থাপনা নির্মানের জন্য নির্মান সামগ্রী রাস্তার উপরে ফেলে রাখায় তা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে ড্রেনে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নগরীর বটতলা সড়ক, অক্সফোর্ড মিশন রোড, গোরস্থান রোড, বৌদ্ধপাতা সড়ক, কলেজ রো, স্ব-রোড, পলাশপুর, আমানতগঞ্জ, কাজিপাড়া, সাগরদী দরগাহ বাড়ি এলাকা সহ নিম্নাঞ্চল পানির নিচে ডুবে আছে। এসব এলাকায় দুই থেকে আড়াইফুট পর্যন্ত জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এর বাইরে নগরীর প্রান কেন্দ্র সদর রোড, কালিবাড়ি রোড, আগরপুর রোড (সাংবাদিক মাঈনুল হাসান সড়ক) সহ সদর রোডের আশাপাশের সড়ক গুলোতে হাটু সমান জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় পথচারীদের সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। নিম্নাঞ্চলে বাড়ি-ঘর এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে। এর ফলে বাড়ি ঘরের প্রয়োজনিয় এবং মূল্যবান মালামাল ও দোকানের পন্য সমগ্রীর বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নগরীতে জমে থাকা পানিতে জাল নিয়ে ব্যবস্ত হয়ে পড়ে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষ।
জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর দুর্ভোগ প্রত্যক্ষ করতে নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মো. আহসান হাবিব কামাল। জমে থাকা পানি নিস্কাশনের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। বিসিসি’র পরিচ্ছন্নতা বিভাগের ওয়ার্ড ভিত্তিক পরিদর্শকদের ডেকে এনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য বলেন। এমনকি তিনি নিজে দাড়িয়ে থেকেও কোন কোন স্থানে জলাবদ্ধতা নিসরনে কাজ করিয়েছেন।