রাষ্ট্রীয় জাহাজে গত অর্থ বছরে লোকসান প্রায় ৪০ কোটি টাকা

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল প্রতিষ্ঠান-বিঅইডব্লিউটিসি’র যাত্রী পরিবহন খাতে লোকসানের বোঝা ক্রমশ ভাড়ী হলেও সেবার মান তলানীতে ঠেকছে। গত অর্থ বছরে সংস্থাটির অভ্যন্তরীন ও উপকূলীয় যাত্রীসেবা খাতে লোকসানের পরিমান প্রায় ৪০ কোটি টাকায় ঠেকেছে। এমনকি যাত্রী সেবার মান উন্নয়নে (?) সংস্থাটির নৌ বহরে অর্ধ শতাধিক কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি নতুন নৌযান সংগ্রহ করার পরে তা এখন গলার কাটা হয়ে উঠছে। এমভি মধুমতি ও এমভি বাঙালী নামের এসব নৌযান যাত্রী পরিবহনের পরিবর্তে বসিয়ে রাখলেই লোকসানের বোঝা কমে। অতিমাত্রার জ্বালানী ব্যয়ের এসব নৌযান প্রতি ট্রিপে ৩-৪ লাখ টাকা পরিচালন লোকসান গুনছে। অথচ প্যাডেল হুইল জাহাজগুলোতে জ্বালানী ব্যয় অর্ধেকেরও কম এবং ভ্রমনে যাত্রীদের আগ্রহ বেশী হলেও সংস্থাটির কারিগরি পরিদফতরের কতিপয় অতি উৎসাহী কর্মকর্তা অতিমাত্রার জ্বালানী ব্যয়ের নৌযান দুটি পরিচলনে বেশী আগ্রহী।
পাশাপাশি পাডেল হুইল জাহাজগুলোর নিয়মিত মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষনে উদাসীন সংস্থার কারিগরি পরিদফতর। প্রায় শত বছরের পুরনো এসব নৌযানগুলো ১৯৯৫ সালে পূণর্বাসনের পরে আজ পর্যন্ত ইঞ্জিনসমুহ ‘মেজর ওভারহলিং’ করা হয়নি। সবগুলো নৌযানের প্যাডেল ও তলার অবস্থাও ঝুকিপূর্ণ। সম্পূর্ণ জোড়াতালি দিয়ে ও জরুরী প্রয়োজনে মেরামতের মাধ্যমে নৌযানগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে গত শনিবার পর্যন্ত সংস্থাটির ৪টি প্যাডেল জাহাজের ৩টিই অচল ছিল। এর মধ্যে গতকাল ‘পিএস টার্ণ’ জাহাজটি যাত্রী পরিবহনে ফিরলেও এর প্যাডেল ও মূল ইঞ্জিনের অবস্থা ভাল নয়। ২০০২ সালে নতুন ইঞ্জিন সংযোজন করা নৌযানটির প্যাডেল পরিপূর্ণভাবে পূণর্বাসন করা হয়নি গত ৩০ বছরেও। এমনকি নৌযানটি মূল ইঞ্জিনের ‘টার্বো চার্জার’ অকার্যকর হয়ে পড়ার পরে গত ৬ মাসেও তা সংগ্রহ করা হয়নি। ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে মেঘনার ভাটি ¯্রােত অতিক্রম করে নৌযনটি বরিশাল থেকে ঢাকায় পৌছতে পারবে না।
এদিকে গত ২১ ফেব্রুয়ারী রাতে বরিশাল থেকে যাত্রী নিয়ে ঢাকায় যাবার পথে কাপ্তেন পথ হারিয়ে ‘পিএস মাহসুদ কে ভিন্ন পথে নিয়ে ডুবো চড়ায় তুলে দেবার পরে এর তলায় ফাটল ধরে। দুঘন্টা পরে জোয়ারে নৌযানটি চড়ামূক্ত হলেও তলার অবস্থা এতটাই নাজুক হয়ে পড়ে যে, তা যাত্রী পরিবহন থেকে প্রত্যাহার করে সংস্থাটির ডকইায়ের্ড তুলতে হয়েছে। আগামী ২০ মার্চের আগে পড়ে নৌযানটি যাত্রী পরিবহনে ফেরার কথা বলা হলেও তা কতটুকু সম্ভব হবে সে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। এর আগে গত ৪ জুলাই প্রায় হাজারখানেক যাত্রী নিয়ে বরিশাল বন্দরের সন্নিকটে পিএস মাহসুদ বিপরিত দিক থেকে আসা একটি বেসরকারি নৌযানের সাথে সংঘর্ষে ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ঐ দূর্ঘটনায় ৫ যাত্রীও নিহতও হয়। ঘাতক নৌযানটির মালিক-কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে মাহসুদ-এর মেরামত সম্পন্ন করে। কিন্তু ছয়মাসাধিককাল পরে যাত্রী পরিবহনে ফেরার মাস খানেকের মধ্যেই পুনরায় দূর্ঘটনায় পড়ে এখন আবার ডকইয়ার্ডে।
অপরদিকে গত প্রায় ৬ মাস ধরে যাত্রী পরিবহন থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে রাজধানীর সাথে দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে নির্ভযোগ্য নৌযান ‘পিএস অষ্ট্রিচ’কে। নৌযানটি যাত্রী পরিবহনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে তকমা দিচ্ছে সংস্থার মেরিন বিভাগ। তবে গত কয়েকমাসে ভিআইপি সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রমোদ ভ্রমনের জন্য অস্ট্রিচকে ভাড়া দেয়া হয়েছে। তলা সহ উপরী কাঠামো মেরামতের লক্ষ্যে গত ২৬ ডিসেম্বর অষ্ট্রিচকে সংস্থার ২ নম্বর ডকইয়ার্ডে নেয়া হলেও এখনো তা স্লীপওয়েতে তোলা হয়নি। এমনকি নৌযানটির উপরীকাঠামোর মেরামত কাজ পর্যন্ত শুরু হয়নি গত প্রায় ৩ মাসে। এজন্য সংস্থার সদর দফ্তর থেকে প্রাক্কলন অনুমোদন দেয়া হলেও গতকাল পর্যন্ত কোন কাজ শুরু হয়নি। এমাসের মধ্যে পিএস মাহসুদ আনডক হলে পিএস অষ্ট্রিচকে ডকিং করার কথা রয়েছে।
গত ২০ দিন যাবত রকেট স্টিমার সার্ভিসের ৬টি নৌযানর মধ্যে সচল ছিল দুটি। তবে এর মধ্যেই এমভি মধুমতি জাহাজটির প্রপেলার ক্ষতিগ্রস্থ হবার কারনে সেটিও যাত্রী পরিবহন থেকে সরিয়ে রাখা হয় ৪ দিন। গতকাল পিএস টার্ণ জাহাজটি যাত্রী পরিবহনে ফেরায় ঢাকা-চাঁদপুর-বরিশাল-ঝালকাঠী-পিরোজপুর হয়ে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ ও সপ্তাহে একদিন খুলনা পর্যন্ত রকেট স্টিমার সার্ভিসটি নিয়মিত চলার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কর্তৃপক্ষ।
তবে রাষ্ট্রীয় এ নৌ বানিজ্য প্রতিষ্ঠানটির রকেট স্টিমার সহ উপকূলীয় স্টিমার সার্ভিসের সব ঐতিহ্য ইতোমধ্যে ম্লান হয়ে গেছে। এসব সার্ভিসে যাত্রী সেবার মান তলানীতে ঠেকেছে বহু আগে। তবে খরচের বহরের কোন কমতি নেই। যাত্রী সেবার মান অক্ষুন্ন রাখা সহ তা উন্নয়ন আলাদা একটি ‘যাত্রী সেবা ইউনিট’ও রয়েছে। কিন্তু তার পরেও সংস্থাটির যাত্রীবাহী সার্ভিসের প্রতি ভোক্তাদের অসন্তুষ্টি এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। নতুন সংগ্রহ করা এমভি মধুমতি ও এমভি বাঙালী নৌযান দুটির প্রতি যাত্রীদের অসন্তুষ্টি শুরু থেকেই ষোল আনা। ৪টি প্যাডেল জাহাজের মধ্যে পিএস লেপচা ও পিএস টার্ণ-এর যাত্রী সেবার মানও অত্যন্ত করুন। এসব বিষয়ে সংস্থার যাত্রী সেবা ইউনিট প্রধানের মতামত জানতে গত ১৫দিনে একাধিকবার তার সেল ফোনে কলা করা হলেও তিনি ধরেন নি।
তবে গতকাল সার্বিক বিষয় নিয়ে বিআইডব্লিউটিসি’র চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ড. জ্ঞান রঞ্জন শীল-এর সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, পিএস টার্ণ আজ(রবিবার) যাত্রী পরিবহনে ফিরছে। পাশাপাশি ২০ মার্চের আাগে-পড়ে পিএস মাহসুদ-এর মেরামত সম্পন্ন করে যাত্রী পরিবহনে দেয়ার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি। যাত্রী পরিবহন খাতে লোকসান এড়াতে ঢাকা থেকে খুলনা পর্যন্ত স্ক্রু-হুইল নৌযানগুলোর পরিবর্তে প্যাডেল হুইল জাহাজ চালানোরও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়ে মাহসুদ যাত্রী পরিবহনে ফিরলে মধুমতির যাত্রাপথ মোড়েলগঞ্জ পর্যন্ত সিমিত করার কথাও জানান তিনি। যাত্রীবাহী নৌযানগুলো নিয়মিত মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষন সহ এ খাতে দূর্ণীতি বন্ধে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহনের কথা জানান সংস্থার চেয়ারম্যান।
উল্লেখ্য, গত অর্থ বছরে রকেট স্টিমার সার্ভিস সহ অভ্যন্তরীন যাত্রী পরিবহন খাতে সংস্থাটির মোট আয় হয়েছে ৬ কোটি ১০ লাখ টাকার মত এবং জ্বালানী, মেরামত ও সংস্থাপন সহ পরিচালন মোট ব্যয় হয়েছে ৩০ কোটি ১২ লাখ টাকা। পাশাপাশি উপকূলীয় নৌপথে আয় ছিল ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকার মত। আর ব্যয় হয়েছে ২১ কোটি ৩২ লাখ টাকারও বেশী। ফলে সব মিলিয়ে যাত্রী পরিবহন খাতে সরকারী নৌ বানিজ্য প্রতিষ্ঠানটির নীট লোকসানের পরিমান ছিল প্রায় ৩৯ কোটি টাকা।