রাজাপুরে বিপর্যয়ের মুখে একটি দাখিল মাদ্রাসা অদৃশ্য ইশারায় থেমে গেছে নতুন ভবন নির্মাণ কাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ অদৃশ্য ইশারায় মাঝপথে থেমে গেছে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ কাজ। ম্যানেজিং কমিটির শীর্ষ পদটিও অনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পাল্টে ফেলা হয়েছে। এমনকি চল্লিশ বছর ধরে যেখানে যেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবস্থিত, সেই জমিও অবৈধভাবে দখলের চেষ্টা চলছে। ঝালকাঠীর রাজাপুরে অবস্থিত এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম জীবনদাসকাঠী এন.এ.এস দাখিল মাদ্রাসা। বর্তমানে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়া মাদ্রাসাটির শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে নতুন ভবন নির্মাণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দকৃত ৬৪ লাখ টাকা। অভিযোগ পাওয়া গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে নির্মাণ কাজ বন্ধ রেখে মাদ্রাসাটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন রাজাপুরের নিজ গালুয়া ইউনিয়নের জীবনদাসকাঠী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাসাটির লাইব্রেরী সহ পুরনো ৫টি কক্ষ ভেঙ্গে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য মাটি খনন করা হয়েছে। পাশের মাঠ জুড়ে স্তুপ করে রাখা আছে ইট, বালু ও রডসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী। ঝালকাঠির একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তিন সপ্তাহ আগে এখানে ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করলেও কয়েকদিনের মধ্যে তা থেমে যায়। ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারী এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্দেশে আমরা সকল বিধি-বিধান মেনেই কাজ শুরু করেছি। কিন্তু মাঝপথে আকস্মিক ওই বিভাগ থেকেই আমাদের নির্মাণ কাজ থামিয়ে রাখতে বলা হয়। এতে আমরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি। এখন পরবর্তি নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদ্রাসাটির একজন শিক্ষক জানান, সরকারের উন্নয়ন খাতে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার পর সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জীবনদাসকাঠী এনএএস দাখিল মাদ্রাসার দ্বিতল ভবন নির্মাণের জন্য ৬৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ঝালকাঠির একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ৭৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থের মাদ্রাসা ভবনটি নির্মাণের জন্য কার্যাদেশ প্রদান করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ জানুয়ারি মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আ: শাকুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় নতুন ভবন নির্মাণের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়। ম্যানেজিং কমিটির ওই সিদ্ধান্ত মোতাবেক মাদ্রাসা ক্যাম্পাসের উত্তর ভিটিতে থাকা লাইব্রেরীসহ ৫টি পুরনো কক্ষ ভেঙ্গে সেখানে নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। আর পূর্ব-ভিটির টিনকাঠের শ্রেণি কক্ষগুলো মেরামতের উদ্যোগ নেয় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষক-কর্মচারীদের একাধিক সূত্র থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, নতুন ভবন নির্মাণের জন্য সরকারি বরাদ্দ আসার পর মাদ্রাসার এক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মাওলানা মোজাম্মেল হক তালুকদার বেকে বসেন। তিনি নিজের এক নিকট আত্মীয়র মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন। তাতে বলা হয়, মাদ্রাসাটির নিজস্ব কোন সম্পত্তি নেই। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। মূলত এরপর থেকেই বন্ধ রয়েছে ভবন নির্মাণ কাজ। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ১১ ফেব্রুয়ারি বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের প্রধান নির্বাহী ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গির আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এসময় স্থানীয়দের কাছে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, চল্লিশ বছর ধরে যে জমিতে মাদ্রাসাটি চলে আসছে সেখানেই নতুন ভবনটি নির্মাণ করা হবে। তবে তিনি চলে আসার পর এক সপ্তাহ পার হলেও পুনরায় নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গির আলম জানান, প্রয়োজনীয় বাধ-বিচার করেই ওই জমিতে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছিল। এখন কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে কাজ বন্ধ রেখে তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অভিযোগগুলো সত্যি হলে মাদ্রাসার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ফিরিয়ে নেয়া হতে পারে। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে ওই জমিতেই ভবন নির্মাণ চালিয়ে যাওয়া হবে। মাদ্রাসাটি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে সেই জমিতে ভবন নির্মাণ করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইনত এমন কোন সুযোগ নেই।
অপরদিকে মাদ্রাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আজিজ আকন জানান, ১৯৭৭ সালে তিনিসহ স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবী নিজেদের জমি দান করে জীবনদাসকাঠী দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এরমধ্যে আজিজ আকনের পরিবার ৭৪ শতাংশ এবং মাওলানা মোজাম্মেল হক ৩১ শতাংশ জমি দান করেন। গত ৩৯ বছর ধরে এই জমিতেই পরিচালিত হয়ে আসছিল মাদ্রাসাটির কার্যক্রম।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, বর্তমানে ওই জমির মূল্য বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় মোজাম্মেল হক নিজের দান করা জমি ফিরিয়ে নিয়ে মাদ্রাসার জন্য অন্যত্র জমি দিতে চাইছেন। এ কারণেই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এ কাজে সহযোগিতা না করায় মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আবদুর শাকুরকে তিনি কয়েক দফা হুমকী-ধমকী দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে বরিশালের একটি প্রশিক্ষণ ইনিস্টিটিউটে অবস্থানরত আবদুর শাকুরের কাছে উপস্থিত হয়ে তাকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন মাওলানা মোজাম্মেল হকের লোকজন। এর কয়েকদিন পর আবুল কালাম আজাদ নামে এক ব্যক্তিকে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ঘোষণা করা হয়। এ ব্যাপারে জানতে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মোজাম্মেল হকের বাড়িতে গিয়ে ও মোবাইল ফোনে তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারী ১৭ জনসহ সকল শিক্ষার্থীর দিন কাটছে চরম অনিশ্চয়তায়। এতদিন পুরনো হলেও যেসব শ্রেণিকক্ষ ছিল তাতে কোনমতে চলছিল শিক্ষা কার্যক্রম। কিন্তু এখন সে অবস্থাও নেই। আশঙ্কা করা হচ্ছে, দুই পক্ষের টানা হেচড়ায় শেষপর্যন্ত পুরনো এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।