রাজাপুরের শেরে বাংলার জন্মস্থান অবহেলিত

রহিম রেজা, রাজাপুর॥ আজ ২৬ অক্টোবর, ১৮৭৩ সালের এই দিনে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাঁতুরিয়া মিয়াবাড়ির মাতুলালয়ে জন্মগ্রহন করেন অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের স্বপ্নদ্রষ্টা শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। এ মহান নেতার জন্মগৃহ এবং তার প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি আজও অবহেলায় পড়ে রয়েছে। দেশ বিদেশের অসংখ্য পর্যটক এখানে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। সাঁতুরিয়া গ্রামের শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের জন্মভবনটি প্রতœসম্পদ হিসেবে ঘোষণার প্রায় চার বছর হলেও সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়নি। অযতœ আর অবহেলার মধ্যে পড়ে রয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা ও বাংলার অবিসংবাদিত এ নেতার বিভিন্ন স্মৃতি চিহ্ন। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। তথ্য মতে, এ দিন মধ্যরাতে ‘বাংলার বাঘ’ জন্ম নেন সাঁতুরিয়ার নানাবাড়িতে। বাড়িটি ‘সাঁতুরিয়া মিয়াবাড়ি’ নামে পরিচিত। শেরে বাংলার শৈশব ও কৈশোরের অনেকটা সময় কেটেছে এ গ্রামে। এখানকার একটি মক্তবে তিনি লেখাপড়া করেন। যে পুকুরে তিনি সাঁতার কাটতেন তা আজও বিদ্যমান। ১৯৪১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাঁতুরিয়া এমএম হাই স্কুল। এক সময় তিনি সাঁতুরিয়াকে রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করেন। এছাড়াও সাঁতুরিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে তার অনেক স্মৃতি। মহান এ নেতার জন্ম নেয়া ভবনসহ মোঘল আমলে নির্মিত আরও কয়েকটি ভবন এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে অধিকাংশই জরাজীর্ণ। দীর্ঘদিন সংষ্কার করা হয়নি। ইমারতগুলো যে কোন মুহূর্তে ভেঙ্গে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে অনেক স্মৃতিচিহ্ন হারিয়েও গেছে। এক সময়ে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের কর্নধার, কলকাতা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মূখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও তিনি একাধিক বার সাঁতুরিয়ায় এসেছিলেন। তার ছেলে মরহুম একে ফাইজুল হকও বাংলাদেশের মন্ত্রী ছিলেন। অথচ শেরে বাংলার জন্ম ভিটা এবং সাঁতুরিয়ায় তার নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিও আজ জরার্জীণ। জন্ম ভবনে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন তার মাতুল বংশধররা। স্কুলটিতে ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাঠদান। বহুবার এখানে একটি যাদুঘর স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হলেও এ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। যে নেতার জন্য বাংলার কৃষকরা জমিদারদের শোষণ নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল তার জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালনেও বিভিন্ন মহলে রয়েছে অনীহা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারের লক্ষ্যে ২০০৮-০৯ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলার জন্য পর্যটন স্থান/স্পট চিহ্নিতকরণের কাজ করে। এ সময় শেরে বাংলার জন্মস্থানটিকে এর আওতায় নেয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর শেরে বাংলার জন্মভবনকে ১৯৬৮ সালের প্রতœতত্ত্ব সংরক্ষণ আইন (১৯৭৬ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় ভবনটি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রতœসম্পদ আইনের ১০ ধারা (১) উপ-ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার ১ নং সাঁতুরিয়া মৌজার তিনটি খতিয়ান ও দাগের মোট দশমিক ৬১ একর জমি সংরক্ষিত প্রতœসম্পদ বলে ঘোষণা করে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এ ব্যাপারে ২০১০ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ২০১০ সালের ১৮ মার্চের গেজেটে তা প্রকাশ করা হয়। এরপর ওই জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমান ও মালিকানা স্বত্ত্ব নিয়ে দু’জন ওয়ারিস লিখিতভাবে আপত্তি জানালে জটিলতা দেখা দেয়। এ নিয়ে যাচাই-বাছাই কাজে চলে যায় দীর্ঘ সময়। বিষয়টি এখনও পুরোপুরি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের খুলনাস্থ আঞ্চলিক পরিচালক শিহাব উদ্দিন আকবর ওই সময় জানিয়েছিলেন, জরুরিভাবে এখন শুধুমাত্র শেরে বাংলার জন্মভবনটি সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অল্প দিনের মধ্যেই প্রকৌশলী টিম এলাকা পরিদর্শন করবে। এরপর বাজেট বরাদ্দ মিললে ৪-৫ মাসের মধ্যেই মূল কাজ শুরু হবে। কিন্তু দীর্ঘ ৪ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি কিছুই। শেরে বাংলার মতো নেতাকে সঠিকভাবে মর্যাদা না দেয়ায় অভিযোগে এলাকাবাসীর ক্ষোভের শেষ নেই। তার ভাগ্নে নজরুল ইসলামের সাংবাদিকদের জানান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গত সরকার শেরে বাংলাকে মূল্যায়ন করেনি। বর্তমান সময়েও বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। এর পিছনেও কোন অদৃশ্য শক্তি থাকতে পারে। সাঁতুরিয়া এমএস মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক ফজলুল হক আকন বলেন, কোন সরকারই মহান নেতার স্মৃতি সংরক্ষণে এগিয়ে আসেনি। শেরে বাংলার প্রতিষ্ঠিত এমএম হাইস্কুলে বর্তমানে ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীতে ৬শতাধিক ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করছে। ফলফলও ভাল। কিন্তু স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়নে তেমন একটা নজর দেয়া হয়নি বলেও অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের। তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালে নির্মিত একটি ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ভবনটি সংষ্কার বা পুনঃনির্মাণসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য একাধিকবার আবেদন করেও কোন ফল মেলেনি। শেরে বাংলার জন্মভবনে দীর্ঘদিন যাবত বাস করছেন তার নিকটাত্মীয় হোসনে আরা বেগম বুলু ও তার পরিবারের সদস্যরা। তারাও চান জরুরিভাবে ভবনটি সংষ্কার করা হোক। কিন্তু আগে তাদের জন্য বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে বলেও তাদের দাবি। তারা নিজ উদ্যোগে ওই ভবনের কিছু সংস্কারও করেছেন। শেরে বাংলার স্মৃতি রক্ষাসহ তাঁর জীবনাদর্শ ও অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষে ১৯৯৪ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় শেরে বাংলা স্মৃতি একাডেমী। সংগঠনের মহাসচিব এসএম রেজাউল কবির পল্টু বলেন, সাতুরিয়ায় রাষ্ট্রীয়ভাবে শেরে বাংলার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করার জন্য তারা দীর্ঘদিন যাবত সরকারের কাছে দাবি করে আসলেও আজও তা মেনে নেয়া হয়নি। ঝালকাঠি জেলা পরিষদের মাধ্যমে ২০০৮ সালে শেরে বাংলার নামে একটি পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এজন্য টাকাও বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় তা আলোর মুখ দেখেনি। এছাড়া সাতুরিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নসহ শেরে বাংলার নামে একটি প্রথম শ্রেণীর কলেজ, ডাকবাংলো ও মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার কথাও তাদের দাবির তালিকায় রয়েছে। কিন্তু কোথাও কোন সুখবর নেই। তাই সাতুরিয়াসহ রাজাপুরবাসীর প্রাণের দাবী দ্রুত এ স্থানটি সংরক্ষণের। উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা মাহাবুবা আক্তার শেরে বাংলার জন্মস্থানের এ দুরবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে বরাদ্দ পেলে স্কুল ও জন্মস্থান সংরক্ষণের কাজ করা হবে।