রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ ও সহাবস্থান হারিয়ে গেছে

রুবেল খান ॥ নগরীর রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ ও সহাবস্থান হারিয়ে গেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ ও সহাবস্থান অনেকদিন ধরে নগরবাসীর কাছে অনুপস্থিত। সেই চর্চা এখন নিজ দলের মধ্যে শুরু হয়েছে। দেশের বড় দুই দল আ’লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা শুধু নয়, কয়েকভাগে বিভক্ত জাতীয় পার্টিসহ সকল দলের মধ্যে একে অপরকে ঘায়েল, সম্মানহানি এবং অবস্থান ক্ষুন্ন করতে নানা কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে রাজনীতি করার ধারা শুরু হওয়ার পর থেকে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেছে। এছাড়াও রয়েছে যোগ্য নেতৃত্বের ও জ্ঞানের অভাব এবং ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তৈরি হওয়া গ্রুপিং প্রথা।
এর সত্যতা স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা বলেন, আগে রাজনীতি ব্যক্তি স্বার্থের বাইরে ছিল। তখন একজন নেতা দলের কর্মী সমর্থক ও দলের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য সর্বদা সচেষ্ঠ ছিল নেতারা।
তিনি বলেন, ছাত্র নেতা হিসেবে পরিচিতি পেতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাছ থেকে কর্মী সমর্থক বাড়ানোর কৌশল, বজ্র কণ্ঠে বক্তৃতা দেয়ার জন্য খুটিনাটি সকল তথ্য সম্পর্কে জানার জন্য পড়াশুনো ও ভাষা ব্যবহার সম্পর্কে তাদের পরামর্শ নেয়া হতো।
সকলের পূর্বে কলেজে গিয়ে হাজির হতেন তারা। ক্লাস শুরুর পূর্বে ছাত্রলীগের সক্রিয়তা জানান দিতে প্রত্যেক দিন মিছিল করতেন। শিক্ষার্থীদের সাহায্যে দিনভর সকলে ব্যস্ত থাকতেন। এসএসসি পরীক্ষার বিদায় অনুষ্ঠানের দিনে বিদ্যালয়ে হাজির হয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য সাহায্য সহযোগিতার জন্য আসার আহবান জানাতেন। কর্মী বাড়ানোর জন্য সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে নিয়ে বক্তৃতা দিতেন।
কর্মী বাড়ানো, সক্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা, শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয়তা ও বক্তৃতা দেয়ার উপর যোগ্যতা নির্ভর করে নেতা নির্বাচন করা হতো। সেখানে কুটিলতা বা কোন কৌশল ছিল না।
কিন্তু এখন নেতা হতে ওই সব যোগ্যতা দেখা হয় না। যোগ্যতা না থাকলেও নেতা বনে যাওয়ায় সকলে বিপদগামী হয়ে পড়েছে। এই কারনে রাজনীতিতে জ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই, কেউ কারো সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করে না। সকলে একে অপরকে ঘায়েল করে নেতা হওয়ার চেষ্টা করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে আ’লীগ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে এই ধারার ব্যবহার বেশি হচ্ছে। এ জন্য যোগ্য নেতৃত্ব, গ্রুপিং এবং সমন্বয়হীনতাকে দায়ি করছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনের জ্যেষ্ঠ নেতারা জানান, এক সময় বরিশালের রাজনীতিতে চলা অস্থিরতা ওয়ান ইলেভেনের পর পাল্টে যায়। এর সিংহভাগ অবদান প্রয়াত মেয়র ও সংসদ সদস্য এ্যাড. শওকত হোসেন হিরনকে দিয়ে তিনি জানান, ২০০৮ সালে সে মেয়র নির্বাচিত হয়ে যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গনে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ ও সহাবস্থান ফিরিয়ে আনেন।
প্রয়াত এ্যাড. হিরন গত নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর থেকে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়ে ফেলে। তখন থেকে শুরু হয় নিজেদের মধ্যে গোপনে অথবা প্রকাশ্যে ঘায়েল করার খেলা।
বিশেষ করে বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অস্থিরতা বিরাজমান। তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে প্রায়ই হাতাহাতি মারামারি হচ্ছে। যা এক সময় বড় ধরনের সংঘাতের সৃষ্টি হবে বলে আশংকা করেছেন জ্যেষ্ঠ নেতারা।
আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তি বলেন, বর্তমানে বরিশাল নগরীতে আওয়ামী লীগের দক্ষ এবং অভিজ্ঞ নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। মূল দলের নেতৃত্বে টানা পোড়ন থাকায় ছাত্রলীগ সহ সহযোগী সংগঠন গুলোরও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বরিশালে পদপ্রাপ্ত অথবা পদবিহীন নেতার ছাড়াছড়ি থাকলেও জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’র আদর্শ এবং নীতিবান রাজনৈতিকের চরম অভাব রয়েছে। নামের আগে নেতা লাগিয়ে ঝাপিয়ে পড়ছে টেন্ডারবাজী, চাঁদাবাজী, দখলবাজী, দস্যুতা আর মারামারি-হানাহানিতে। এমনকি কেউ কাউকে তোয়াক্কা না করেই মেতেছেন কলহের রাজনীতিতে। প্রতিহিংসা বসত এক জনের টানানো ব্যানার রাতের আধারে ছিড়ে এবং খুলে ফেলছে অপর পক্ষ, এক পক্ষ কর্মসূচীর আয়োজন করলে অপর পক্ষ থাকছেন তা প্রতিহতের চেষ্টায়। আর ঠুনকো অযুহাতে হামলা এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ঘটনাতো রয়েছেই।
এ বিষয়ে বরিশালের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক এবং নাগরীক সমাজের ব্যক্তিত্ব এ্যাড. মানবেন্দ্র বটব্যাল বলেন, বরিশাল বাংলাদেশের মতই। বাংলাদেশে গনতান্ত্রিক গণমত ও সহমর্মীতা একান্ত প্রয়োজন। কেননা দেশে অভিভাবকের অভাব রয়েছে। যারাই ক্ষমতায় থাকেন তারাই দেশটাকে নিজের জমিদারী মনে করেন।
তিনি বলেন, বিএনপি সহ অপর দলগুলো অতিতে সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দিয়ে জনগনের থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। এটা কারোই কাম্য নয়। আশাকরি ভবিষ্যৎ দিন গুলোতে একাত্তরের যুদ্ধবিরোধী শক্তি ব্যতিত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অভ্যন্তরিন এবং বাইরের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিয়ে জনগণকে সাথে নিয়ে নিজ নিজ আদর্শের প্রসার ঘটাবে। তাতে অপর কারো বাধা দেয়া অগণতান্ত্রিক হবে বলেও মন্তব্য করেন এই জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক।