রহস্য আবৃত শেবাচিম হাসপাতালের নিয়োগ প্রক্রিয়া

রুবেল খান॥ শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জনবল নিয়োগ কার্যক্রম কোন ঘোষণা ছাড়াই রহস্যজনকভাবে স্থগিত রয়েছে। অফিস সহায়ক সহ বেশ কয়েকটি পদের কর্মচারী নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের প্রায় চার মাসেও দেয়া হয়নি ফলাফল। যে কারনে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে ১৭২টি পদে চাকুরী প্রত্যাশি আট হাজার পরীক্ষার্থী।
এদিকে নিয়োগ কার্যক্রমে দুর্নীতির অভিযোগে মামলার পর এবার কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে আবেদন করতে যাচ্ছেন বাদী পক্ষ। আজ মঙ্গলবার আদালতের কাছে স্থগিতাদেশ চাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী।
তবে নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে কোন জটিলতা নেই বলে দাবী করেছেন হাসপাতাল পরিচালক। শুধুমাত্র সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং সহায়তা না থাকায় একের পর এক সভা করেও নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।
সূত্রমতে, দীর্ঘ বছর পর শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেনীর ১৭২টি শুণ্য পদে গত ২০১৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জনবল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন কর্তৃপক্ষ। এসব পদের মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার অপারেটর ২টি, ফটোগ্রাফার ১টি, ইনস্ট্রুমেন্ট টেকনিশিয়ান ১টি, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ৫টি, মেডিকেল রেকর্ড কিপার ২টি, টেলিফোন অপারেটর ৩টি, ইনস্ট্রুমেন্ট কেয়ারটেকার (আইসিটি) ১টি, ড্রাইভার ১টি, ইলেকট্রিশিয়ান/ লিফটম্যান/ মেকানিক ৫টি, অফিস সহায়ক ৬৭টি, ওয়ার্ডবয় ১টি, নিরাপত্তা প্রহরী ৫টি, বাবুর্চি ১২টি এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মী ৬৬টি।
এদিকে নিয়োগ বিজ্ঞাপ্তি প্রকাশের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার চাকুরী প্রত্যাশিরা সংশ্লিষ্ট পদে আবেদন করে। যার মধ্যে যাচাই বাছাইতে ৮ হাজার আবেদনকারীর আবেদন বৈধ বলে বিবেচিত হয়। এর মধ্যে অফিস সহায়ক ও বাবুর্চি সহ অন্যান্য পদে ৫ হাজার ৩৬৫ জন বৈধ আবেদনকারীর লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করা হয় চলতি বছরের জুন মাসের শেষে সপ্তাহে। অবশ্য এই পরীক্ষা গত ২৪ এপ্রিল গ্রহণের কথা ছিলো। কিন্তু নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে সাবেক পরিচালক ডা. মু. কামরুল হাসান সেলিম এবং বর্তমান উপ-পরিচালক ডা. মো. শহীদুল ইসলাম সহ নিয়োগ কমিটির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করা হয়।
অপরদিকে প্রথম পর্বের নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণের মাস দু’এক পরেই দুর্নীতির দায়ে শেবাচিম হাসপাতাল থেকে ওএসডি হয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যোগদান করেন নিয়োগ কমিটির সভাপতি ও পরিচালক ডা. মু. কামরুল হাসান সেলিম। যে কারনে নিয়োগ কার্যক্রমও ধোয়াশা হয়ে যায়। সেই সাথে রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগে মামলার বিষয়টিও। ওএসডি হওয়া পরিচালক এবং বর্তমান উপ-পরিচালক ডা. মো. শহীদুল ইসলাম সহ নিয়োগ কমিটির বিরুদ্ধে নিয়োগ পরীক্ষায় লাখ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগে গত ৩০ আগস্ট অফিস সহায়ক পদে চাকুরী প্রত্যাশী মো. আব্দুর রহমান হাওলাদার এবং মো. মিলন নামে দু’ ব্যক্তি বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। আদালত মামলাটি অপেক্ষমান রাখলে বিষয়টি সেই অবস্থাতেই রয়ে গেছে।
এদিকে পরিচালকের বদলি, আদালতে মামলা এবং ক্ষমতাসীন সহ সংশ্লিষ্টদের নিয়োগ বাণিজ্যের জটিলতার কারনে শেষ পর্যন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায় নিয়োগ কার্যক্রম। কোন কার্যক্রম পরিচালনা না হওয়ায় নিজে থেকেই স্থগিত হয়ে যায় নিয়োগ কার্যক্রম। যে কারনে প্রথম ধাপে পরীক্ষা গ্রহণের প্রায় চার মাস অতিবাহিত হলেও প্রকাশ করা হচ্ছে না পরীক্ষার ফলাফল। এমনকি নেয়া হচ্ছে না বাকি পদের জন্য আবেদনকারীদের নিয়োগ পরীক্ষা। আদৌ নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হবে কিনা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে চাকুরী প্রত্যাশী আবেদনকারীরা। এ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোন প্রকার সদুত্তর না পাওয়ায় এমনকি ইতিবাচক কিছু না পেয়ে চাকুরী প্রত্যাশিদের মাঝে হতাশার মেঘ দিন দিন আরো ঘনিভূত হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন ফারুক জানান, সাবেক পরিচালকের বদলির ফলে নিয়োগ কার্যক্রম এক প্রকার স্থগিত হয়ে আছে। তবে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে কোন প্রকার বাধাও নেই। মামলার কারনে কোন নিষেধাজ্ঞা বা জটিলতারও সৃষ্টি হয়নি।
তিনি বলেন, হাসপাতালে জনবলের চরম সংকট রয়েছে। যে কারনে কার্যক্রম পরিচালনায় ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। তাই জনবল নিয়োগ খুবই জরুরী হয়ে দাড়িয়েছে। যে কারনে স্থগিত হয়ে থাকা নিয়োগ কার্যক্রম পূনরায় শুরুর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এজন্য ইতোপূর্বে নিয়োগ কমিটিকে নিয়ে একাধিক সভা করেছেন। এমনকি গতকাল সোমবার পরিচালকের কার্যালয়ে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করতে সভা করেছেন। কিন্তু একের পর এক সভা করেও কোন কাজ হচ্ছে না।
পরিচালক বলেন, আমি একা চাইলেই হবে না। নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু সেই মানসিকতা নিয়ে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করতে সহযোগিতা করছে না কেউ। যে কারনে নিয়োগ কার্যক্রমও সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী আজাদ রহমান জানান, মামলাটি নিয়ে পরবর্তী কোন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি। তবে আজ মঙ্গলবার নিয়োগ কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতের কাছে আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি।