রহস্যেঘেরা আগুনে পুড়ে গেলো ক্যাটামেরন জাহাজ এ্যাডভেঞ্চার-৬

রুবেল খান ॥ নির্মান কাজ শেষে চলাচল শুরুর মাত্র তিন দিন আগেই আগুনে পুড়ে কয়লা হলো বরিশাল-ঢাকা নৌ রুটের ক্যাটামেরন জাহাজ এমভি এ্যাডভেঞ্চার-৬। গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া খেয়াঘাট সংলগ্নে কীর্তনখোল নদীর দক্ষিণ প্রান্তে এ্যাডভেঞ্চার শিপইয়ার্ডে রহস্যজনক ভাবে আগুন লেগে জাহাজটির প্রথম থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের ৭টি ইউনিট প্রায় দেড় ঘন্টা চেষ্টা চালিয়ে নিয়ন্ত্রনে আনলেও ততক্ষনে জাহাজে স্থাপনকৃত ইঞ্জিন, এসি, চেয়ার, ডেকোরেশন সহ অন্যান্য সকল আসবাবপত্রই পুড়ে ছাই হয়েছে। এতে করে ১০ কোটি টাকার উপরে ক্ষয়ক্ষতি ধারনা করছেন জাহাজ মালিক পক্ষ। তবে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত সম্পর্কে এখনই কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। তবে জাহাজ মালিক পক্ষের অভিযোগ শত্রুতাবশত জাহাজটিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। যা তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে বলেও মনে করছেন তারা।

প্রত্যক্ষদর্শী এ্যাডভেঞ্চার শিপ ইয়ার্ডের স্টাফ সাদ্দাম হোসেন জানান, গতকাল মঙ্গলবার রাতে তারা জাহাজ নির্মান কাজ শেষে করে তারাবিহ নামাজ আদায়ের জন্য পার্শ্ববর্তী মসজিদে নামাজ পড়তে যান। এর পূর্বে শিপইয়ার্ড এবং জাহাজের সকল বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং জাহাজের সকল দরজা-জানালা বন্ধ করে আসেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে মসজিদের গেটে দাড়িয়ে দেখতে পান এ্যাডভেঞ্চার জাহাজ এর দ্বিতীয় তলায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তাৎক্ষনিকভাবে তিনি সহ অন্যান্য স্টাফ এবং স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং দ্রুত ফায়ার সার্ভিসকে সংবাদ দেন। তাদের আসার পূর্বে স্থানীয়রা ঝাপিয়ে পড়ে যে যার মত করে আগুন নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করলেও তাতে ব্যর্থ হয়। এক পর্যায়ে দ্বিতীয় তলার আগুনের লেলিহান শিখা জাহাজ এর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

এ্যাডভেঞ্চার শিপইয়ার্ডের কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, এ্যাডভেঞ্চার-৫ এবং ৬ নামের জাহাজটির চলাচল শুরু করতে বড় ধরনের সকল কাজ সম্পন্ন করেছেন। এখন শুধু টুকি-টাকি ডেকরেশনের কাজ চলছিলো। যা আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যেই শেষ হতো। সে অনুযায়ী আগামী শুক্রবার দুটি জাহাজই এক সাথে নদীতে ভাসানোর পাশাপাশি ওই দিন পরীক্ষামূলকভাবে চলাচল শুরুর কথা ছিলো। কিন্তু তার আগেই গতকাল রাতে রহস্যজনক ভাবে আগুনে পুড়ে যায় এ্যাডভেঞ্চার-৬ জাহাজটির পুরো অংশ।

তিনি বলেন, আগুন লাগার সাথে সাথেই ফায়ার সার্ভিসকে সংবাদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা আসার আগেই জাহাজটির প্রথম থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত স্থাপনকৃত সকল চেয়ার, ফোম, এসি, লাইট, ডেকরেশন এবং ইঞ্জিন রুম সহ সকল আসবাবপত্রই ও যন্ত্রপাতি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয় দাবী করে ওই কর্মকর্তা বলেন, যে আগুন লেগেছে তাতে ১০ কোটি টাকার উপরে হবে।

এ্যাডভেঞ্চার শিপইয়ার্ডের মালিক পক্ষের স্বজন মামুন হাওলাদার অভিযোগ করে বলেন, ফায়ার সার্ভিসের ঘটনাস্থলে পৌছে কমপক্ষে এক থেকে দেড় ঘন্টা সময় লেগেছে। ঘটনাস্থলে পৌছতে তাদের বিলম্বের কারনেই জাহাজটির সকল অংশ পুড়ে ছাই হয়েছে। তারা খবর পাওয়ার সাথে সাথে পৌছতে পারলে এতোটা ক্ষয়ক্ষতি হতো না।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, যে স্থানে জাহাজটিতে আগুন লেগেছে তা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট কিংবা অন্য কোন ভাবে লাগতে পারেনা। তাছাড়া আগুনের ঘটনা ঘটেছে জখন কেউ শিপইয়ার্ড এবং জাহাজের কাছা কাছি ছিলো না। সুযোগ বুঝে কেউ শত্রুতাবশত জাহাজটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ মামুন হাওলাদারের।

তবে অভিযোগ ঠিক নয় দাবী করে ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স এর উপ-পরিচালক শামীম আহসান বলেন, আমরা খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে পৌছেছি। এক এক করে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট গুলোর ঘটনাস্থলে পৌছতে সর্বোচ্চ হলে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লেগেছে। কিন্তু আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিলো যে তাদের ঘটনাস্থলে পৌছাবার আগেই জাহাজের বেশিরভাগ অংশই পুড়ে গেছে।

তিনি বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রনের জন্য আমাদের বরিশাল এবং ঝালকাঠি ফায়ার সার্ভিসের মোট ৭টি ইউনিট প্রায় দেড় ঘন্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রনে এনেছে। এর মধ্যে একটি ইউনিট ছিলো নৌ স্টেশনের। তবে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত এবং ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাৎক্ষনিকভাবে কোন তথ্য জানাতে পারেননি ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক শামীম আহসান। তিনি বলেন, এই ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। ওই তদন্ত কমিটিই অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমান নিশ্চিত করবে। তদন্ত রিপোর্ট পেলে বিস্তারিত বলা যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

উলে¬­খ্য, অগ্মিকান্ডে ভূস্মিভূত হওয়া নির্মাণাধীন অ্যাডভেঞ্চার-৬ নৌযানটি সম্পূর্ণ নতুন মেরিন ইঞ্জিন ও শীট দিয়ে তৈরী করা হয়েছিলো। তিন তলা বিশিষ্ট এই জাহাজটি ভাগ করা হয়েছে ইকোনমিক, বিজনেস ও প্রিমিয়াম ক্লাস। যাত্রীর আসনের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছিলো থাইল্যান্ড থেকে আমদানীকৃত আধুনিক স্লি­পিং চেয়ার। ৬’শ যাত্রী ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ক্যাটামেরন টাইপের জাহাজের ভাড়াও নির্ধারনও করা হয়েছিলো। জাহাজটি বিলাশবহুল বারান্দা, রেস্টুরেন্ট ব্যবস্থা ও সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করা হয়। যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণে কাঠ, প্ল­াস্টিক, এসএস পাইপ এবং ফাইবার দিয়ে তৈরী করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন নানা ডিজাইন। দীর্ঘ ১৫ মাস পূর্বে থেকে নির্মানাধীন ৪০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৩ মিটার প্রস্থের জাহাজ তৈরীতে প্রায় ৩০ কোটি টাকার মত ব্যয় হয়েছে।