মৃদু কালবৈশাখীতে জনজীবনে স্বস্তি এলেও লন্ডভন্ড বিদ্যুৎ ব্যবস্থা

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ মহান আল্লাহ রাব্বুল আল-আমীন বৃষ্টির জন্য বান্দার আর্জি মঞ্জুর করেছেন। টানা একমাসের তাপ প্রবাহের পরে রবিবার সন্ধায় বরিশাল সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে মৌসুমের তৃতীয় মৃদু কালবৈশাখীতে সিক্ত হয়েছে কোটি মানুষ। বৃষ্টির জন্য সারা দেশের মত দক্ষিণাঞ্চলের মানুষও আল্লাহ রাব্বুল আলÑআমীনের দরবারে প্রার্থনা জানিয়ে আসছিলেন গত কয়েকদিন ধরেই। গত শনিবার মাগরিব থেকে ফরিদপুরের বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে মহা পবিত্র ফাতেহা শরিফ উপলক্ষে নফল নামাজ, মিলাদ ও পাক কালাম ফাতেহা শরিফ পাঠন্তে দোয়া মোনাজাতেও বৃষ্টির জন্য দোয়া করা হয়। সোমবার বাদ ফজর বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের পীর ছাহেব বিশ্ব ওলী খাজাবাবা ফরিদপুরী কুঃছেঃআঃ ছাহেবের রওজা শরিফ জিয়ারতের নিয়তে ফাতেহা শরিফ পাঠন্তে দোয়া মোনাজাতেও পীরজাদা আলহাজ খাজা মোস্তফা আমীর ফয়সল মুজাদ্দেদী ছাহেব বৃষ্টির জন্য বিশেষভাবে আর্জি জানান মহান আল্লাহর দরবারে।
পরম করুনাময় আল্লাহ রাব্বুল আলÑআমীন বান্দার সে দোয়া কবুল করেছেন। রোববার সন্ধ্যা থেকেই আকাশ কালো মেঘের সাথে মৃদু কালবৈশাখীতে বরিশালে ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পটুয়াখালীতে বৃষ্টি হয়েছে ৭ মিলিমিটার। ভোলা, বরগুনা ও পিরোজপুর সহ দক্ষিণাঞ্চলের সর্বত্রই কম বেশী বৃষ্টিতে সিক্ত হয়েছে গোটা দক্ষিণাঞ্চলের পরিবেশ। সোমবার সন্ধ্যার পরেও কিছু সময়ের বৃষ্টি স্বস্তি ফিরেছে জনজীবনে।
তবে রোববার ৩৬ কিলোমিটার বেগের বাতাসেই লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। ফলে দীর্ঘ কাঙ্খিত বৃষ্টির স্বস্তিকে অনেকটা কেড়েও নিয়েছে এই লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া বিদ্যুত। এ মৃদু কালবৈশাখীর বাতাসেই খোদ বরিশাল মহানগরীর দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবÑস্টেশন বন্ধ হয়ে যায় সঞ্চালন লাইনে ত্রুটির কারণে। গভীর রাতের আগে আর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পূণর্বাসন হয়নি। নগরীর লাকুটিয়া সহ কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ ফিরেছে গতকাল দুপুরে।
তবে এসব কিছুর পরেও দীর্ঘ দাবদাহ থেকে স্বস্তি দিয়েছে রবি ও সোমবারের সন্ধ্যার বৃষ্টি। ঐ বৃষ্টির রেশ ধরে বরিশালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পারদ আগের দিনের তুলনায় গতকাল ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস হ্রাস পেয়ে ৩৪.৫ ডিগ্রীতে স্থির হয়েছে। সাথে দক্ষিণÑপূর্বের বাতাস জনজীবনে বাড়তি স্বস্তি দিয়েছ গতকাল। সাগর কিছুটা উত্তাল রয়েছে। উপকূলীয় এলাকায়ও সাগরের মাঝারী উচ্চতার ঢেউ আছড়ে পড়েছে গতকাল দিন-রাত জুড়ে। তবে কোন সতর্ক সংকেত ছিলনা।
আবহাওয়া বিভাগ থেকে আগামী ৪৮ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানানো হয়েছে। পশ্চিমা লঘুচাপের বর্ধিতাংশ ভারতের গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ হয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে বলে জানিয়ে বরিশাল ও খুলনার আবহাওয়া বিভাগ। এছাড়াও উত্তরাঞ্চল সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সমূহে বিরাজমান তাপ প্রবাহ প্রশমিত হবার সু সংবাদও দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। এমনকি সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা ১-৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস হ্রাস পাবার পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলেও জানানো হয়েছে। দীর্ঘ প্রতিক্ষিত এ বৃষ্টিপাত দক্ষিণাঞ্চলের মাঠ থাকা বোরো ধান সহ বিভিন্ন রবি ফসল এবং মৌসুমী ফলের জন্য বিশেষ উপকারী ভূমিকা পালন করবে বলে জানিয়েছেন কৃষিবিদগণ।
উত্তর বঙ্গোপাসাগরে সৃষ্ট গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালার কারণে গত ১ ও ২ এপ্রিল দুদিনে ৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পরে গোটা দক্ষিণাঞ্চল থেকেই বৃষ্টি উধাও হয়। এমনকি আবহাওয়া বিভাগের দীর্ঘ মেয়াদী বুলেটিনে এপ্রিল মাসে বরিশাল অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী ১৩০-১৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের কথা বলা হলেও গতমাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৮০ ভাগ কম বৃষ্টি ঝড়েছে এ অঞ্চলে। গত ৩ এপ্রিল থেকেই দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে থাকে দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে। উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় সৃষ্ট গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা উধাও হয়ে যায় ২৪ ঘন্টার মধ্যেই।
আবহাওয়া বিভাগের দীর্ঘ মেয়াদী বুলেটিনে এপ্রিল মাসে দেশের উত্তর থেকে মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত ৩-৪ দিন বজ্রসহ মাঝারী থেকে তীব্র কালবৈশাখী সহ বজ্র-ঝড় এবং দেশের অন্যত্র ৪-৫ দিন হালকা থেকে মাঝারী কালবৈশাখী বা বজ্র-ঝড়ের পূর্বাভাস দেয়া হলেও তার সাথে বাস্তবতার কোন মিল ছিলনা। পাশাপাশি এপ্রিল মাসে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের ওপরে একটি তীব্র তাপপ্রবাহ এবং অন্যত্র ৩৬Ñ৩৮ ডিগ্রী সেলসিয়াসের ১-২ টি মৃদু থেকে ৩৮Ñ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের তাপপ্রবাহ বয়ে যাবার কথা বলা হলেও বাস্তবে ৩ এপ্রিল থেকেই দক্ষিণাঞ্চল সহ সারা দেশেই মাস জুড়ে তীব্র তাপদাহ অব্যহত ছিল। লাগাতর এ তাপ প্রবাহ গত ৩০ বছরের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। গত মাসে বঙ্গোপসাগরে ১-২ টি নি¤œচাপ সৃষ্টির কথা জানিয়ে এর মধ্যে একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়ার কথাও বলেছিল আবহাওয়া বিভাগ। কিন্তু গতমাসে জুড়ে কোন নি¤œচাপ সৃষ্টি হয়নি বঙ্গোপসাগরে।
তবে গত ২৪ এপ্রিল বরিশাল অঞ্চলের তাপমাত্রা স্মরণকালের সর্বোচ্চ ৩৭.৫ ডিগ্রীতে পৌছে। যা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেশী। আবহাওয়া বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বরিশাল অঞ্চলে এপ্রিল মাসে ৩৪.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস স্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকার কথা। কিন্তু মাসের বেশীরভাগ সময় জুড়েই এ অঞ্চলে তাপমাত্রার পারদ ৩৫-৩৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে।
বৃষ্টির অভাবে ইতোমধ্যে এ দক্ষিণাঞ্চলের খাল সহ উপরিস্তরের উৎসগুলোও পানি শূন্য প্রায়। ভূগর্ভেও পানির স্তর ক্রমশ নিচে নামছে। তবে রবি ও সোমবারের বৃষ্টিপাত পরিস্থিতি কিছুটা হলেও সামাল দিতে সহায়ক হলেও আরো বৃষ্টি না হলে দক্ষিণাঞ্চলে মাঠ থাকা বোরা ধান ব্যাপক ঝুঁকির কবলে পড়বে বলে শংকিত কৃষিবিদগণ।