মামলা ও অর্ধশত অভিযোগের বোঝা নিয়ে বহাল তবিয়তে গণপূর্ত নির্বাহী প্রকৌশলী

রুবেল খান॥ একাধিক মামলা এবং অর্ধশত অভিযোগ রয়েছে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগের পাহাড় জমলেও হচ্ছে না কোন তদন্ত বা নেয়া হচ্ছে না বিভাগীয় কোন ব্যবস্থা। যে কারনে বছরের পর বছর বহাল তবিয়তে থেকে সরকারের কোটি কোটি টাকা লুটপাটে মেতে উঠেছেন দুর্নীতিবাজ এই নির্বাহী প্রকৌশলী। সেই সাথে ঠিকাদারদের পাওনা কয়েক কোটি টাকার বিল ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে লুটপাটের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যে কারনে প্রাপ্ত বিল না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপান করতে হচ্ছে বেশ কিছু সাধারন ঠিকাদারদের।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন যোগদানের পর থেকেই দুর্নীতির আখড়া খানায় পরিণত করেন বরিশাল গণপূর্ত বিভাগ নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়টি। শুরু থেকেই তিনি কর্মচারিদের অহেতুক শাস্তি প্রদান এবং ঠিকাদারের সাথে স্বেচ্ছাচারিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বরিশাল নগরীর আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি’র মুষ্টিমেয় নেতাদের কাজ এবং অর্থের বিনিময়ে কব্জা করে লুটপাটে মেতে উঠেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন।
বিশেষ করে তার দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন সাধারন ঠিকাদাররা। ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদারদের তালিকায় থাকা প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদাররা তার দুর্নীতি এবং লোলুপ দৃষ্টিতে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। বরাদ্দ এবং বিল বঞ্চিত এসব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাঝে রয়েছে মেসার্স এস আলম এন্টার প্রাইজ, মেসার্স কে আই সি ট্রেডার্স, রুস্তম আলী এন্ড কোং, দি ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রেডার্স, দি প্যারামাউন্ড ট্রেডার্স, বাবুল ইলেক্ট্রিক এবং জননী এন্টারপ্রাইজের মতো আরো কিছু ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার। এদের মধ্যে অনেকে নিজ অর্থে করা কাজের বিল হাতে পাওয়ার আগেই পরলোক গমন করেছেন। তবুও কাজের বিল পায়নি তার পরিবার।
এসব প্রতিষ্ঠানের একাধিক ঠিকাদার জানান, ২০০২ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তারা গণপূর্ত বিভাগের কাছে কাজের টাকা পাবেন। কিন্তু মন্ত্রনালয়ের আইনের দোহাই দিয়ে তাদের পূর্বের বিল পরিশোধ করা হবে না বলেও জানিয়ে দেয়া হয়। সেই সাথে বাজেট বা বরাদ্দ ছাড়া কোন প্রকার কাজ না করার জন্য নির্দেশ করা হয় নির্বাহী প্রকৌশলীদের। কিন্তু বরিশাল গণপূর্ত নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন এমন আইন কানুন বা নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে কোন প্রকার বরাদ্দ কিংবা টেন্ডার ছাড়া কোটি কোটি টাকা কাজের বিল করেছেন। এসব কাজ কাগজ কলমে হলেও বাস্তবে কোন প্রমাণ নেই। সর্বশেষ গনপূর্ত বিভাগের সামনের মুল ফটক কার্যাদেশ ছাড়া ভেঙ্গে নতুন করে নির্মান, একই ভাবে মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে প্রায় কোটি টাকা উন্নয়ন কাজ, এর আগে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা’র বরিশাল সফরের সময় ৬টি সরকারী ভবনের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীর মৌখিক আদেশে বিভিন্ন কাজ সম্পাদিত করা হয়। পরবর্তীতে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়। কিন্তু নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন দায়িত্ব গ্রহনের পর বরিশাল সার্কিট হাউজ সংস্কার এবং বঙ্গবন্ধু উদ্যানের রাস্তা নির্মান কাজের ভুয়া বিল করে প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঠিকাদারদের নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতালে রং ও রিপেয়ারিং এর নামে গত দুই বছরে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন। সুবিধাবাদী দলের নেতা জাকির হোসেন নিজেকে কখনো রাষ্ট্রপতির আত্মীয় আবার কখনো সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে সাধারন ঠিকাদার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রভাবিত করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এদিকে ঠিকাদাররা আরো জানায়, ২০১৩ সাল থেকে উল্লেখিত প্রায় ২০ জন ঠিকাদারদের দিয়ে কিছু উন্নয়ন কাজ করালেও এর বকেয়া বিল আজ পর্যন্ত ঠিকাদারদের পকেটে আসেনি। আদৌ তা পাবে কিনা সে সম্পর্কে জানানেই ঐসব ঠিকাদারদের। তারা বলেন ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে বরিশালে বিভিন্ন উন্নয়নের জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দ পান নির্বাহী প্রকৌশলী। কিন্তু তার পরেও দেড় কোটি টাকা ঠিকাদারী বিল বকেয়া রয়ে যায়। কিন্তু যে টাকা বরাদ্দ হয়েছে তা কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে তা নির্বাহী প্রকৌশলী এবং তার পার্টনার ও ঘনিষ্ট ঠিকাদার ছাড়া কেউ জানেনা। তবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা নিশ্চিত করেছেন বরাদ্দের মধ্যে থেকে দুর্নীতিবাজ নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন ও তার সহযোগিরা আড়াই কোটি টাকা ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাত করে নিয়েছেন।
তারা আরো বলেন, সাধারন ঠিকাদারদের ৫ কোটি টাকার বেশি বিল পাওনা রয়েছে। এ বিল পরিশোধের জন্য এপিপি/আরএপিপি’র তালিকা অনুযায়ী পাওনা বিল পরিশোধের জন্য প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশ অমান্য করা হয়েছে। সে অনুযায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী তার ঘনিষ্ট এবং পার্টনার ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করেন। কিন্তু বাকি যে সাধারন ঠিকাদার রয়েছে তাদের বিল পরিশোধ না করে বিভিন্ন ভুয়া ভাউচার দেখিয়ে আরো প্রায় দেড় কোটি টাকা লুট করে নেন। গণপূর্ত বিভাগের উপরস্থ কর্মকর্তা বা দুদকের মাধ্যমে তদন্ত এবং রেজিষ্ট্রার তল্লাশি করলে দুর্নীতিবাজ জাকির হোসেন’র দুর্নীতির সকল প্রমাণ বেড়িয়ে আসবে বলেও দাবী করেন ঠিকাদাররা।
অপর দিকে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন বরিশাল নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে যোগদানের পর এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে উল্লেখিত বিষয়ে ঠিকাদারদের অর্ধ শত লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। গনপূর্ত বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী, বরিশালের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাস্ট্র মন্ত্রী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, দুর্নীতি দমন কমিশন, সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব সহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন দপ্তরে ডাক এবং হাতে হাতে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়। এর পাশাপাশি নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ঠিকাদারকে হত্যা চেষ্টা মামলা, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নির্মান কাজ নিয়ে দুর্নীতির মামলা এবং কর্মচারীদের অনৈতিক ভাবে বদলি এবং দায়েরকৃত মামলা সহ একাধিক মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার পরেও জাকির হোসেন এর বিরুদ্ধে অজ্ঞাত কারনে নেয়া হচ্ছে না কোন প্রকার ব্যবস্থা। তবে মাঝে মধ্যে অফিসিয়াল অডিট হলেও নির্বাহী প্রকৌশলী প্রতিজনকে নগদ অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার অনৈতিক কর্মকান্ড এবং দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ফজলু, শাহাদৎ এবং জাফর নামে তিন কর্মচারীকে রাখা হয়েছে সাইজ করে। তাদের বদলি করে অনত্র পাঠানোর আদেশ হলেও দায়েরকৃত একটি মামলায় এই আদেশ স্থগিত করে রেখেছে আদালত। কিন্তু তার পরেও গত কয়েক মাস যাবৎ বেতন বোনাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এই কর্মচারীরা। যে কারনে অন্যান্য কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা এর দুর্নীতিবাজ জাকিরের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না। তবে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগ দুর্নীতি মুক্ত করনের দাবী জানিয়েছেন এখানকার সাধারন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ঠিকাদাররা।