মান্ধাতা আমলের সেবার সদর হাসপাতাল অনিয়ম আর দুর্নীতির অভায়ারণ্যে

রুবেল খান॥ নামে আধুনিক জেনারেল হাসপাতাল হলেও কাজের বেলায় মান্দাতা আমলের ছাপ। রোগীদের সংখ্যাও দিন দিন বেড়ছে। কিন্তু উন্নয়নের ছাপ লাগেনি এতটুকুও। জরুরী বিভাগ থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রই পরিনত হয়েছে অনিয়ম আর দুর্নীতির অভায়ারন্যে। এমনই বাস্তবতা আর তথ্য প্রমান পাওয়া গেছে বরিশাল নগরীর অন্যতম এবং ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বরিশাল জেনারেল (সদর) হাসপাতালে। এসবের কারনে হাসপাতালটি ধ্বংসের চুড়ায় পৌছালেও লিখিত অভিযোগের ভরসায় বসে আছে কর্তৃপক্ষ। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রাচিন এবং ঐতিহ্যবাহী বরিশাল সদর হাসপাতালটি। নগরীর সদর রোড, কাউনিয়া, আমানতগঞ্জ, ভাটিখানা, হাসপাতাল রোড, বাজার রোড, পলাশপুর সহ বিভিন্ন এলাকার লাখ লাখ মানুষ এই হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিচ্ছে। প্রতিদিনই চিকিৎসা সেবা গ্রহনে রোগীদের সংখ্যা বেড়ছে। কিন্তু গত প্রায় ৩০ বছরে এই হাসপাতালটিতে লাগেনি উন্নয়নের ছোয়া। তবে হাসপাতালটির নামের উন্নতি হয়ে নাম করন করা হয়েছে আধুনিক জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু আধুনিকতার কোন ছাপই দেখা যাচ্ছে না হাসপাতালটিতে। সেই সাথে তাল মিলিয়ে চিকিৎসক, নার্স এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বাড়ছে অনিয়ম ও দুর্নীতি। যে কারনে শেষ পর্যায় বন্ধ হতে চলে হাসপাতালটির জরুরী বিভাগটিও।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উন্নয়ন বঞ্ছিত জেনারেল হাসপাতালের জরুরী বিভাগ ইতোমধ্যে চিকিৎসক শূণ্য হয়ে পড়েছে। এখানে বছর দুই আগে ৩ জন ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ছিলেন। এর মধ্যে দু’জন তাদের চিকিৎসা কোর্স সম্পন্ন করে বরিশালের বিভিন্ন জেলায় চলে গেছেন। বাকি একজনকে দিয়ে জরুরী বিভাগে সেবা দিয়ে আসলেও তিনিও গত প্রায় এক মাস পূর্বে ঢাকায় প্রশিক্ষনের জন্য গেছেন। যে কারনে চিকিৎসক বিহীন হাসপাতালটি নার্স নির্ভর হয়ে পড়েছে।
এদিকে চিকিৎসক এবং কর্তৃপক্ষের সু দৃষ্টির অভাবে নার্সরাও অনিয়ম এবং দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জরুরী বিভাগে ১০ জন নার্স রোস্টার অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে সকালে ৪ জন, বিকালে ৩ জন এবং রাতে ১ জন। এরা সবাই নিয়মিত কর্মস্থলে থাকছেন না। আর যারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন তারাও কাজ কাম ফেলে রেখে গল্পগুজবে ব্যস্ত থাকছেন। একজন রোগী চিকিৎসা গ্রহন করতে আসলে তাকে সুস্থ করে তুলতে প্রয়োজনিয় ব্যবস্থা না নিয়ে জরুরী বিভাগ থেকেই রোগীকে ফিরিয়ে দিচ্ছে নার্সরা। এসব করে মাসের পর মাস সরকারী বোনাস বেতন ভোগ করছে সুবিধাভোগি নার্সরা।
এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগী জানান, সামান্য পেটে পিড়া ও কাটা ছেড়া নিয়ে জরুরী বিভাগে এলে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না। জেনারেল হাসপাতালের জরুরী বিভাগে দাড়াতেই নার্সরা বলে দেন চিকিৎসক নেই। আর নেই গজ, তুলা বা ওটি’র যন্ত্রপাতি। এসব অজুহাতে কোন দিক না তাকিয়ে রোগীকে পাঠিয়ে দিচ্ছে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে জরুরী বিভাগের ইনচার্জ ও সেখানকার নার্সেস এ্যাসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক আকবর বলেন, আমারা জতক্ষন সম্ভব জরুরী বিভাগ থেকেই রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছি। কোন রোগীকে কোন প্রকার অজুহাত দেখিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে না।
তাছাড়া জরুরী বিভাগের ইনচার্জ ব্রাদার আকবর বলেন, অনেক সময় মারামারির রোগী আসলে তাদের সার্টিফিটের প্রয়োজন হয়। সে কারনে ঐ রোগীকে শেবাচিম হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। তাছাড়া তিনি বলেন, জেনারেল হাসপাতালে ওটি’র অবস্থা ভালো না। একটি টেবিল আর ১শত ওয়ার্ডের একটি বাল্ব জ্বালিয়ে রোগীদের কাটা ছেড়া শেলাই করা হচ্ছে। এমনকি এখানে গজ, তুলা এবং ব্যান্ডেজ থাকলেও স্প্রীড, পবিসেফ, শেলাই দেয়ার স্টিজ (সুতা) ও প্রয়োজনিয় যন্ত্রপাতি নেই। একাধিকবার এসব চেয়ে শেবাচিম হাসপাতাল পরিচালক’র বরাবর আবেদন জানানো হলেও কোন ব্যবস্থা উপায় হয়নি।
জেনারেল হাসপাতালের আবাসীক মেডিকেল অফিসার ডা. দেলোয়ার হোসেন বলেন, এই হাসপাতালটি পরিচালনার দায়িত্ব শেবাচিম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা যে ভাবে তাদের মালামাল সরবরাহ করে সেভাবেই তারা এখানে কার্যক্রম চালাচ্ছেন। আর জরুরী বিভাগ থেকে চিকিৎসা না দিয়ে রোগীদের শেবাচিম হাসপাতালে প্রেরনের বিষয়টি তিনি খোঁজ খবর নিয়ে দেখবেন বলে জানান।
এদিকে শেবাচিম হাসপাতালের স্টোর অফিসার ডা. আব্দুর রশিদ জানান, স্টিজ, স্প্রীড এবং পবিসেফ সরকার থেকেই তারা সরবরাহ পাচ্ছেন না। সে জন্য চাহিদা থাকা সত্যেও শেবাচিম কিংবা জেনারেল হাসপাতালে তা সরবরাহ করতে দিতে পারছেন না তারা। যে কারনে একটু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তবে জুলাইতে এ সমস্যা সমাধান হবে বলেও আশা ব্যক্ত করেন।
জেনারেল হাসপাতালে নার্স এবং চিকিৎসকদের অনিয়মের বিষয়ে হাসপাতালটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. মু. কামরুল হাসান সেলিম বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।