মান্ধাতা আমলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আস্থাহীনতায় ব্যাংকের গ্রাহকরা

জুবায়ের হোসেন ॥ মান্ধাতা আমলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাংক গুলোতে ক্রমেই আস্থা হারাচ্ছে সাধারণ গ্রাহকরা। নিরাপত্তার খাতিরে জমানো টাকার নিরাপত্তাহীনতার কারনেই এমনটি হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক গুলো থেকেই যখন গ্রাহকদের হাত থেকে প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে টাকা ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে তখন এমন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে আস্থা হারানোর বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক বিষয় বলে মন্তব্য করেছে একাধিক গ্রাহক। তাদের ভাষ্য, সরকারি ব্যাংক গুলোই বর্তমানে সেকেলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনভাবে চলছে। সমস্যার কমতি না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র নির্ভরযোগ্যতার খাতিরে ঐ সকল ব্যাংকে টাকা জমানো। তবে বর্তমানে যে আস্থা সৃষ্টি হচ্ছে তাতে আর মনে হচ্ছে বিনিয়োগ বা ঋণের জন্য অদূর ভবিষ্যতে গ্রাহকরা রাষ্টায়ত্ব ব্যাংকের দারস্থ হবেনা কারন গ্রাহকদের অর্থের নিরাপত্তা দিতে বার বার ব্যর্থ হচ্ছেন তারা। এর কারণ হিসেবে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, মান্ধাতা আমলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অসাধু কর্মকর্তাদের উপস্থিতির বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন সাধারন ঐ সকল অভিযোগকারী গ্রাহকরা। তাদের অভিযোগ তীব্রতা পেয়েছে ঢাকায় কমার্স ব্যাংকের ডাকাতির ঘটনার পর। নগরীর ব্যাংক গুলোর ডাকাতির ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রশ্ন তুলে তারা উদাহরন দিয়েছেন গত ১ এপ্রিল নগরীর সোনালী ব্যাংকের চকবাজার শাখা থেকে ঋণ গ্রহীতা নগরীর জিয়া সড়ক নিবাসী রুস্তুম আলী মল্লিক এর ৭ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনার। তবে বেসরকারী ব্যাংক গুলোতেও পুরো আস্থা নেই তাদের বলে তারা আরও জানান, জনবহুল স্থানেই যখন এমনটা ঘটতে পারে তখন জেলা উপজেলার তো কোন কথাই নেই। তাই সরকারি-বেসরকারি উভয়কেই আস্থাহীন সাধারন গ্রাহক। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবী ইতিমধ্যেই নিরাপত্তার বিষয়ে বিবিধ পদক্ষেপের বাস্তবায়ন প্রক্রীয়া চলছে।
নগরীর ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বরিশাল বিভাগে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব, রাষ্ট্রায়াত্ত্ব বিষেশায়িত এবং বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংক এর সংখ্যা ৩৬টি। রাষ্ট্রায়াত্ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংক গুলো হল, সোনালী ব্যাংক , জনতা ব্যাংক , অগ্রনী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক লিমিটেড। এ চার ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার অফিস, প্রিন্সিপাল অফিস, আঞ্চলিক কার্যালয়, বিভাগীয় অফিস, মহাব্যবস্থাপকের সচিবালয় ও বিভাগীয় অফিস, মহাব্যবস্থাপকের সচিবালয় ও বিভাগীয় কার্যালয় ওয়ার্ক স্টেশণ মিলে পুরো বিভাগে সর্বমোট কার্যালয় রয়েছে ১৯টি। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক এই দুইটিই বরিশাল বিভাগের রাষ্ট্রায়ত বিষেশায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংক। বিভাগে এই দুই ব্যাংকের মোট কার্যালয় ১০টি। বিভাগের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক সমূহ হচ্ছে, পূবালী ব্যাংক , উত্তরা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ডাচ বাংলা ব্যাংক, স্টান্ডার্ড ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সাউথ ইস্ট ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, আনসার ভিডিপি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, স্যোসাল ইসলামী ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এবং ব্যাংক এশিয়া। তবে এ সকল বেসরকারি ব্যাংক গুলো নগরীতেই অবস্থিত। আর বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংক গুলো মেনে চলার চেষ্টা করে সঠিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিপত্তি শুধুমাত্র সরকারি ব্যাংকগুলো নিয়ে। কারন এরা চলছে বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায়। এ সকল ব্যাংকের এমন অনেক শাখা রয়েছে যা এখন পরিণত হয়েছে কর্মচারীদের বসতবাড়িতে। নিরাপত্তা তো দূরের কথা এসকল ব্যাংকে সাধারন সেবা পেতেও গ্রাহদের পোহাতে নানা ভোগান্তি। বেসরকারি ব্যাংকগুলো যেমন তেমন সরকারি ব্যাংক গুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার নামে রয়েছেন একজন পুরোনো বন্দুকধারী ব্যক্তি যার নেই কোন প্রশিক্ষণ। অনেক সময়ই দেখা যায় ব্যাংকের রক্ষীর বেশে রয়েছেন একজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা অতিরিক্ত বয়স্ক ব্যক্তি। অনেক সময়তো ওই নিরাপত্তা রক্ষীদের দেখা যায় পিয়ন হিসেবে কাজ করতে। আর তাদের হাতে যে অস্ত্রটি থাকে তা দেখলে হয়ত ব্যঙ্গ করতেও লজ্জা পাবে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বর্তমানের ডাকাতরা। এছাড়া এই ব্যাংক গুলোর ব্যবস্থাপনাও খুবই দুর্বল। গোপনীয়তা বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই এ সকল ব্যাংকে। কারন কার বেশি পরিমান টাকা তোলা হবে তা খুব সহজেই জেনে যাচ্ছে ছিনতাই কারীরা। উদাহরণ ১ এপ্রিলের চকবাজার ব্যাংক থেকে উত্তোলনকৃত ঋণের ৭ লাখ টাকা ছিনতাই। অবশ্য এক্ষেত্রে অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীদের যোগসাজোশ থাকতে পারে বলে জানায় সূত্রটি। আধুনিক এলার্ম সিস্টেম তো দূরের কথা এসকল ব্যাংকগুলোর অধিকাংশেরই সিসি ক্যামেরা শুধুমাত্র নামেই রয়েছে। এ সকল ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষণও করেন না তারা বলে আরও জানায় সূত্রটি। এমন একাধিক দুর্বলতার কারনেই রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংক গুলোতে আস্থা হারাচ্ছে সাধারণ গ্রাহক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বরিশাল অফিসের উপ-মহা ব্যবস্থাপক মোঃ ওবায়দুল হক এর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফ থেকে ইতিমধ্যেই নিরাপত্তার জন্য করনীয় পদক্ষেপের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্দেশনায় রয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তির সতর্কীকরন যন্ত্র যেমন- এলার্ম, সিসি ক্যামেরা, আধুনিক অস্ত্রসহ যোগ্য নিরাপত্তা রক্ষী, ছুটির দিনেও ব্যাবস্থাপক তার নিজস্ব শাখার নিরাপত্তা তদারকীকরন ইত্যাদি। ইতিমেধ্যই বেসরকারি ব্যাংকগুলো এই নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করে ফেলেছে। তবে সরকারি ব্যাংক গুলোর অধিক শাখা ও বিভিন্ন জেলা উপজেলায় শাখা থাকায় তারা এখনও এই নির্দেশনা মানতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশনা মানা হচ্ছে কিনা তা তদারকীরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন ব্যাংকে গিয়ে তা তদারকি করবেন বলেন উপ-মহা ব্যবস্থাপক। টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা গুলোতে ব্যাংক এর কিছু অসাদুরা জড়িত থাকতে পারে এই কথার সত্যতা স্বীকার করে তিনি আরও বলেন, যদি অভ্যন্তরের কেউ এমন ঘটনায় জড়িত থাকে তবে তদন্ত করে তাদের যথোপযুক্ত শাস্তি দেয়া হবে। একটি ব্যাংকের পক্ষে যতটুকু নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব তার দেয়া হবে। তবে এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয় তাই প্রশাসনকেও এগিয়ে আসতে হবে বলেও জানান মোঃ ওবায়দুল হক।