মানব পাচার রোধে আইনের প্রয়োগ দরকার

॥ আবির আব্বাস চৌধুরী ॥ মানব পাচার হলো শোষণ করার উদ্দেশ্যে জোর খাটিয়ে, প্রতারণাপূর্বক কিংবা ধোকা দেয়ার মাধ্যমে মানুষ নিয়ে ব্যবসা করা। এক্ষেত্রে, প্রধান সমস্যা হলো মরিয়া হয়ে ওঠা লোকজনকে শোষণ করে থাকে এমন সব অপরাধীদেরকে খুঁজে বের করা এবং পাচারের শিকার হওয়া লোকজনদের সহায়তা দেয়া। বাংলাদেশি লোকজনকে বিভিন্ন দেশে পাচারের কাজটি অবাধে চলে আসছে। দারিদ্র ও বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা ভাগ্যান্বেষীদেরকে অন্যান্য দেশে যাওয়ার প্রতি আকৃষ্ট করছে। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের একটি রাবার বনের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকের ১৩০ জনের একটি দলকে উদ্ধারের ঘটনাটি উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষ পাচার করা একটি মারাত্মক অপরাধ এবং মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই মানবপাচারের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত, সেটা পাচারের শিকার ব্যক্তিদের নিজের দেশেই হোক বা মধ্যবর্তী ট্রানজিট দেশই হোক কিংবা গন্তব্য দেশই হোকনা কেন। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ সংক্রান্ত দপ্তর (ইউএনওডিসি) মানব পাচার প্রটোকল মানব পাচার রোধে বাস্তবায়নে ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এই প্রটোকলের আর্টিকেল ৩, অনুচ্ছেদ (এ) তে মানব পাচারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অথবা জোর খাটিয়ে বা অনুরূপ উপায় যেমন বলপ্রয়োগ, অপহরণ, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অথবা অর্থের বিনিময়ে বা শোষণের মাধ্যমে লাভ গ্রহণের উদ্দেশ্যে মানুষজনকে কোথাও নিয়োগ দেয়া, পরিবহন করা, স্থানান্তর করা, জাহাজে রপ্তানী করা অথবা তাদেরকে অদিগ্রহণ করা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। শোষণ বলতে পতিতাবৃত্তি বা যৌনগত শোষণের অন্যান্য রূপভেদগুলিকে, বলপ্রয়োগে শ্রম বা পরিসেবায় নিযুক্তকরণ, দাসত্ব বা দাসত্বের অনুরূপ কর্মকান্ড এবং দাসত্বে নিযুক্তকরণ বা অঙ্গহানি করাকে বুঝায়। মানব পাচারের বিষয়ে বিশ্বব্যাপী কঠোর মনোভাব এবং ঐক্যমত্য গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই প্রটোকলের আর্টিকেল ৩-এ এই সংজ্ঞাটি প্রদান করা হয়েছে। প্রটোকলের আর্টিকেল ৫এর ঘোষণা অনুযায়ী এর আর্টিকেল ৩ এ বর্ণিত নীতিমালার লংঘনকে সকল সভ্যদেশের স্থানীয় আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। স্থানীয় আইনে মানব পাচার সম্পর্কে প্রটোকলে বর্ণিত বিবরণকেই যে হুবহু গ্রহণ করতে হবে তা নয় বরং প্রটোকলে প্রদত্ত ধারণা সমষ্টিকে বাস্তবায়ন করার জন্য সেগুলোকে স্থানীয় আইন ব্যবস্থায় সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নিতে হবে। আমাদের উপমহাদেশে মানব পাচারের অবস্থা ভয়াবহ। মানব পাচার সম্পর্কিত জাতীয় (টিআইপি) মূলতঃ এসেছে ১৮৬০ সালের ভারতীয় দন্ডবিধি, ভারতীয় সংবিধান ও ১৯৫৬ সালের অনৈতিক পাচার রোধ আইন থেকে। ভারতীয় দন্ডবিধিতে পাচার সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে ২০টিরও বেশি বিধি রয়েছে এবং অপরাধীদেরকে ফৌজদারী শাস্তি প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। ভারতীয় সংবিধানে মানব পাচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং তা ভারত সরকারের বিভিন্ন আইন কানুনে ও নীতি নির্ধারণী দলিলপত্রে অনুসৃত হয়েছে। অনৈতিক পাচার রোধে আইনটিই ভারতে মানব পাচার রোধে ও নিয়ন্ত্রনে মূল আইন হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া ১৯৭৬ সালের চুক্তিবদ্ধ শ্রমের (বাতিল) আইন, ১৯৮৬ শিশুশ্রম (নিষিদ্ধকরণ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৯৪ সালের মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন এবং ২০০০ সালের অভিবাসন (বাহকের দায়) আইন এর মত বিধিগুলো মানব পাচার সম্পর্কিত বিষয়াদি নিয়ন্ত্রনে কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রথম দশকগুলোতে মানব পাচার সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবেলা করতে ১৯৩৩ সালের অনৈতিক পাচার দমনে আইনটি ব্যবহৃত হতো। যা হোক, সময়ের সাথে সাথে পুরাতন আইনটিতে অপরাধীরা ফাঁকফোঁকর গলিয়ে যেতে পারে মানব পাচারের এমন সব সম্ভাব্য পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হয়। মানব পাচার রোধে ২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মানব পাচার বিরোধী আইন বিষয়ে সরকারের মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে ও সুশীল সমাজের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার জন্য একটি খসড়া প্রণয়ন করে। কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের সকল ক্ষমতার একমাত্র উৎস্য হলো সংবিধান। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আর্টিকেল ৩১ এ বলা হয়েছে যে প্রত্যেক নাগরিকেরই আইনের সুরক্ষা পাবার অধিকার রয়েছে। একইভাবে এজিভি সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার ও জনৈক (১৯৯৭) (এইচসিডি) এর বিবরণ অনুসারে আবেদনকারীর প্রায় ১৫ বছর বয়সী কন্যাটি ১৯৯২ সালের মার্চ মাস থেকে নিখোঁজ ছির। ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে তার পরিবার বুঝতে পারে যে সে শিশু অপহরণকারীদের দ্বারা অপহৃত হয়েছিল এবং তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অতঃপর সে পশ্চিমবঙ্গের একটি নারীনিবাসে অবস্থান করছিল। অপরাধের শিকার নারীটির বিস্তারিত বিবরণ ‘সংলাপ’ নামের একটি ভারতীয় এনজিও কর্তৃক গৃহীত হয়ে বাংলাদেশের একটি এনজিওর নিকট্ পাঠানো হয়েছিল। ঢাকাস্থ মানবাধিকার ব্যুরোর মাধ্যমে মেয়েটির বাবা (আবেদনকারী) মেয়েটিকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রথম অভিযুক্তকে অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু কোনো পদক্ষেপই গৃহীত হয়নি। মেয়েটির পিতা তখন তার মেয়ের দায়দায়িত্ব গ্রহণ ও বাংলাদেশে ফেরত আনার জন্য প্রথম অভিযুক্তদের আদেশ প্রদানের আবেদন জানিয়ে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন বিধিমালা, বিশেষ করে আর্টিকেল ৩১এর উল্লেখ করে মত প্রকাশ করেন যে, এই বিশেষ বিধিটিই আবেদনকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে এবং অভিযুক্তদের নিস্ক্রিয়তা কোনো সরকারি সংস্থা কর্তৃক আবেদনকারীকে সহায়তা প্রদানে অস্বীকৃতির একটি পরিস্কার প্রমাণ। কোর্ট অভিযুুক্তকে এই বিষয়ে অপরাধের শিকার ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণে এবং কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সময়ে সময়ে আবেদনকারীকে অবহিত করানোর জন্য আদেশ প্রদান করেন। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ২০১৪ সালের ১১ জুন তারিখে উপমহাসাগরের সেন্টমার্টিন দ্বীপের কাছে ১৩২ বাংলাদেশী নাগরিককে বহনকারী একটি ট্রলারে আগুন ধরে যাওয়ায় কমপক্ষে ছয় জন লোক মারা যায় এবং ৪০ জন আহত হয়। তাদের মধ্যে ২৭ জন ঝড়ে আহত হয়। বাংলাদেশের কোস্টগার্ড ৩১৫ জন যাত্রীকে উদ্ধার করে। জাহাজটিকে মালয়েশিয়ার দিকে নিয়ে যেতে দেরি করায় যাত্রীরা যখন প্রতিবাদ করে তখন পাচারকারী এবং তাদের সহযোগীারা জাহাজটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাঁচটি ট্রলার পাওয়া গেছে আরেকটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার পুলিশের দেয়া তথ্যানুসারে, গত তিন বছরে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাচার হওয়ার সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনের দ্বারা ২৮০৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছিল। মানব পাচার রোধে এবং ভুক্ত ভোগীদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষে কঠোরভাবে যথাযথ আইন প্রয়োগসহ দরকারী পদক্ষেপ এখনই সময়।
লেখকঃ ব্যরিস্টার এট ল
(লিংকন’স ইন, দ্যা ইউ.কে) এবং সহযোগিগণ,
হোসেন এন্ড খান এসোসিয়েটস।