মাঠ পর্যায়ে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির অভাব দক্ষিণাঞ্চলে বানিজ্যিকভাবে আমের আবাদ ও উৎপাদন সম্ভব হয়নি এখনো

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ দেশের দক্ষিণাঞ্চল সহ উপকূলীয় এলাকা যুড়ে আম সহ বিভিন্ন মওশুমী ফলের গাছ মুকুলে ভড়ে গেছে। পৌষের মধ্যভাগ থেকে গাছে যে মুকুলের আগমন শুরু হয়েছিল, এখন তা সব গাছেই ভড়ে উঠছে। দক্ষিণাঞ্চলে এখনো বানিজ্যিকভাবে আমের আবাদ ও উৎপাদন শুরু না হলেও ক্রমে এর প্রসার ঘটছে। তবে আম সহ বিভিন্ন ফলদ এবং বনজ গাছের চারা ও কলম-এর বানিজ্যিক উৎপাদনে দক্ষিাঞ্চল ইতোমধ্যে দেশের শীর্ষস্থান দখল করেছে। বরিশালের বানরীপাড়া, পিরোজপুরের নেসারাবাদ, কাউখালী ও সদর উপজেলা সহ এ অঞ্চলের কয়েকটি উপজেলা থেকে সারা দেশেই ফলদ ও বনজ গাছের চারাÑকলম সরবারহ হচ্ছে।
দেশের উপকূলভাগের ৪৭হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা যুড়ে ইতোমধ্যে যে প্রায় সোয়া ২লাখ হেক্টর নতুন লবনাম্বুজ বনভ’মী সৃষ্টি করা হয়েছে তবে উপকূলেল একটি বড় অংশেই বিভিন্ন ফলজ জাতের গাছও রোপন করা হয়েছে। কিন্তু এর আবাদ পরবর্তি সুষ্ঠু পরিচর্জা আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি নির্ভর নয়। এখনো বন বিভাগ সহ কৃষি সম্প্রসারন অধিদফÍরের কাছে দক্ষিণাঞ্চলে ফলদ গাছের বানিজ্যিক সম্প্রসারন খুব একটা গুরুত্ব লাভ করেনি। মাঠ পর্যায়ে খামারীদের কাছে এসব ফলদ গাছের আবাদ ও আধুুনিক পরিচর্জা প্রযুক্তি এখনো খুব একটা হস্তান্তর হয়নি। অথচ দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৩০ভাগ এলাকাই দেশের উপকূলীয় এলাকায়। অথচ দেশের মোট জনসংখ্যার ২৮%-এরই বসবাস ৭১০কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকা যুড়ে। এ অঞ্চলে সৃষ্ট বিশাল বনভ’মির একটি অংশ যুড়ে নানা ফলদ গাছ থাকলেও তা খুব একটা পরিকল্পিত ও আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর নয়।
স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিমানে বৈচিত্রের ফল আম অন্য যেকোন ফলের সাথেই তুলনাহীন। পাকা আমে প্রচুর পরিমানে ‘ভিটামিন-এ’ এবং খনিজ পদার্থ রয়েছে। এমনকি কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে আমে ‘ভিটামিন-এ’র পরিমান অন্য যেকোন ফলের চেয়ে বেশী। ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট-বারি’র মতে আমাদের দেশের ৫লক্ষাধীক হেক্টর জমিতে বছরে আড়াই লাক্ষাধীক টন নানা জাতের আম উৎপাদিত হচ্ছে। বারি ইতোমধ্যে বেশ কিছু উচ্চ ফলণশীল ও সুমিষ্ট আমের জাতও উদ্ভাবন করেছে। এরমধ্যে ‘বারি আমÑ১’ বা ‘মহানন্দা’ জাতের আমের আকৃতি প্রায় গোলাকার। এ জাতের আম গাছে প্রতিবছরই নিয়মিত ফল দেয়। যার প্রতিটি গাছে ৭শ থেকে ৮শ পর্যন্ত আম উৎপাদন হয়ে থাকে। এছাড়া ‘বারী আম-২’ এবং ‘বারি আম-৩ বা আ¤্রপালি’ ইতোমধ্যে সারা দেশে যথেষ্ঠ গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করেছে। ‘বারি’ আরো বেশ কিছু উন্নত জাতের সুমিষ্ট আমের জাত উদ্ভাবন করেছে। তবে এসব আমের চারা ও কলম দক্ষিণাঞ্চলের মাঠ পর্যায়ে খুব একটা সহজলভ্য নয়। বরিশাল ও পটুয়াখালীতে বারি’র দুটি হর্টিকালচার নার্সাারী থেকে কিছু উন্নত ও সুমিষ্ট আমের চারা ও কলম পাওয়া গেলেও তা কৃষকদের কাছে সহজলভ্য করার কোন উদ্যোগ নেই।
বাঙালীর কাছে আম একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ফল হিসেবে সদুর অতীতকাল থেকেই সমাদৃত। রসালো ও সুমিষ্ট এ ফল-এর উৎপাদন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোয়ায় যথেষ্ঠ উন্নত হলেও দক্ষিণাঞ্চলে সে ধরনের পরিবর্তন আসেনি। বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা ও পিরোজপুরের বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর আম গাছ থাকলেও তা পরিকল্পিত ও বানিজ্যিক ভিত্তিতে নয়। তবে সাম্প্রতিককালে পিরোজপুরের কাউখালী, মঠবাাড়ীয়া, নেসারাবাদ, বরিশালের বানরীপাড়া এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও গলাচিপা ছাড়াও বরগুনার আমতলী এলাকায় সিমিতাকারে আমের বানিজ্যিক আবাদ শুরু হয়েছে। তবে দক্ষিণাঞ্চলে আম সহ ফলদ গাছ পরিচর্যার বিষয়ে সাধারন কৃষক সহ গৃহস্থের লোকজন এখনো কৃষি সম্প্রসারন কর্মীদের তেমন কোন সহায়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বরিশাল বিভাগীয় সদরে আজ পর্যন্ত সরকারী কোন নার্সারী স্থাপিত হয়নি। নগরীর উপকন্ঠে রহমতপুরে একটি নার্সারী থাকলেও তা বেশীরভাগ মানুষেরই অজানা। পাশাপাশি নগরীর লাকুঠিয়া এলাকায় একটি বিক্রয় কেন্দ্র থাকলেও সেখানে তেমন কোন গাছই পাওয়া যাচ্ছে না। যা এ নগরবাশীর কাছেও অনেকটা অজানা।
এব্যপারে বারি’র বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, তারা উন্নত জাত ও তার আবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেও মাঠ পর্যায়ে তার সম্প্রসারন দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর-ডিএই’র। তবে ডিএই’র দায়িত্বশীল মহল এ লক্ষে তাদের প্রচেষ্টার কথা জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে পিরোজপুর সহ কয়েকটি জেলার বিভিন্ন এলাকায় আমের পাশাপাশি মাল্টা আবাদ ও উৎপাদনে যথেষ্ট সাফল্যের কথাও জানিয়েছেন ডিএই’র দায়িত্বশীল মহল।
তবে সব বাধাÑপ্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেও দক্ষিণাঞ্চলে আম সহ বিভিন্ন ফলদ গাছের আবাদ সম্প্রসারন হচ্ছে। প্রতিবছর বরিশাল বিভাগীয় সদর সহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে বৃক্ষ মেলা উদযাপিত হয়। যেখানেও বিভিন্ন ধরনের ফলদ গাছের চারা ও কলম বিক্রী করছে বেসরকারী নার্সারীগুলো।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মধ্যে গাছ রোপনের একটি সহজাত প্রবনতার কথাও জানিয়েছেন কৃষি বিজ্ঞানীগন। এখন তাদের কাছে অধুুনিক আবাদ ও পরবর্তি পরিচর্জা প্রযুক্তি পৌছে দিতে পারলে আম সহ বিভিন্ন ধরনের ফলের উৎপাদনে আশাতীত সাফল্য লাভ সম্ভব বলে মনে করছেন মহলটি।
বন বিভাগ এবং কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের মতে দক্ষিণাঞ্চল সহ উপকূলীয় এলাকা আম ছাড়াও দেশীয় সব ধরনের ফলদ গাছ-এর আবাদ ও সুমিষ্ট ফল উৎপাদনের উপযোগী। ২০০৩-০৪সালে সরকার দেশে ১কোটি নারকেল চাড়া রোপনের যে কর্মসূচী গ্রহন করে তার আওতায় বন বিভাগ, বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারন অধিদফÍর প্রায় ৬৫লাখ নারকেল চাড়া বিতরন করেছিল। যার ৫০ভাগেরও বেশী রোপন করা হয় উপকূলীয় জেলাগুলোতে। কিন্তু এসব নারকেল গাছ রোপন থেকে শুরু করে তার পরবর্তি পরিচর্জাও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি নির্ভর ছিলনা। ফলে ঐসব নারকেল গাছ থেকে আশাব্যঞ্জক উৎপাদন না আসলেও তা এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় যথেষ্ঠ অবদান রাখতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে।
কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে দক্ষিণাঞ্চলে আম সহ সব ধরনের ফলদ গাছ আবাদ ও ফল উৎপাদনে একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহন করে পরবর্তিতে তা সমগ্র এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। যার সুফল হবে সুদুর প্রসারী ও টেশসই