মহাসড়কে বাস, মাহেন্দ্র ও অটো চলাচল বন্ধ

সাইদ মেমন/ রুবেল খান ॥ নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে বাস চলাচল বন্ধ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বরিশাল বাস মালিক সমিতি ও জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন। এছাড়াও নথুল্লাবাদ থেকে মাহেন্দ্র টেম্পু চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে তারা।
গতকাল রোববার দুপুর ১ টা থেকে ধর্মঘট শুরু হয় বলে জানিয়েছেন জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি জানান, রাত থেকে ঢাকা-বরিশালসহ দূরপাল্লা রুটেরও বাস চলাচল বন্ধ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য ডাক দেয়া ধর্মঘটে একাত্মতা জানিয়েছে মালিক ও শ্রমিকরা।
উচ্চাদালতের আদেশে মহাসড়কে থ্রি-হুইলার যানবাহন চলাচল বন্ধের জন্য মাহেন্দ্র টেম্পু ও অটোরিক্সা মালিক শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ ও পয়সার হাট রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া এবং শ্রমিককে মারধরের প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বরিশাল বাস মালিক সিন্ডিকেটের সাধারন সম্পাদক মো. ইউনুস হাওলাদার।
এদিকে সড়ক অবরোধ, শ্রমিক মারধর ও ধর্মঘট নিয়ে বাস মালিক ও শ্রমিক এবং টেম্পু ও অটো মালিক-শ্রমিকরা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এই কারনে দিনভর প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা চরম আতংকের মধ্যে পার করেছে। আর আঘোষিতভাবে আকস্মিক ধর্মঘটের কারনে অভ্যন্তরীন ১৫ এবং বরিশাল-ঢাকা, সিলেট, যশোর সহ অন্যান্য রুটের বাস যাত্রীরা সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়ে। যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক, মাইক্রোবাস এবং মোটর সাইকেলে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। আর অনেক যাত্রীকে বাস টার্মিনাল থেকেই ফিরে গেছে। এমনকি মাহেন্দ্র চলাচল বন্ধ থাকায় অভ্যন্তরিন রুটের যাত্রীরাও সমস্যায় পড়েন।
ঘটনার সূত্রপাত
উচ্চাদালত মহাসড়কে মাহিন্দ্রা টেম্পু, ব্যাটারি চালিত যানবাহনসহ থ্রি হুইলার চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। এর প্রতিবাদে গৌরনদী, আগৈলঝাড়া ও উজিরপুর উপজেলার থ্রি হুইলার মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্যোগে সকালে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদী বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় কাফনের কাপড় মাথায় বেধে অবরোধের পর বিক্ষোভ শুরু করে। সকাল ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধে দুইপাশে অসংখ্য দূরপাল্লার যানবাহন আটকা পড়ে।
দুপুর পৌনে ১টায় গৌরনদী পৌর মেয়র ও উপজেলা আ’লীগের সাধারন সম্পাদক মো. হারিছুর রহমানসহ দুই থানার ওসি বিক্ষুদ্ধ মালিক শ্রমিকদের সাথে বৈঠক করে। পরে তাদের দাবির যথার্থতা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পৌছে দেয়ার আশ্বাস দেয়। এতে তারা অবরোধ প্রত্যাহার করে।
কিন্তু দুপুর ১টায় গৌরনদী-পয়সারহাট ও গোপালগঞ্জ মহাসড়কের যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ করে দেয় গৌরনদী অটোটেম্পু মালিক ও শ্রমিক সমবায় সমিতি। পরে তারা সেখানে সমাবেশ করেছে। সভাপতি আ. ছত্তার হাওলাদারের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শ্রমিক নেতা ফারুক বেপারী, আলী হোসেন, জামাল গোমস্তা, জামাল হোসেন প্রমূখ।
বাস মালিক এবং শ্রমিকদের বরাত দিয়ে সম্পাদ ইউসুফ হাওলাদার বলেন, আন্দোলন চলাকালে বরিশাল থেকে ভুরঘাটাগামী বাস সেখানে পৌছুলে স্থানীয় কিছু অটোরিক্সা এবং মাহেন্দ্র চালকরা হামলা করে। তারা শ্রমিকদের মারধর এবং বাস ভাংচুরের চেষ্টা করে।
শ্রমিক নেতা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বিষয়টি পুলিশ সুপারকে অবহিত করা হয়। তিনি বিষয়টি সমাধান করা আশ্বাস দেন। পুলিশ সুপার ব্যর্থ হওয়ায় বাস মালিক এবং শ্রমিক সংগঠন যৌথ ভাবে বরিশাল থেকে বাস ধর্মঘট ডাক দেয়া হয়।
উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি ও মাহেন্দ্র ও অটোরিক্সা চলাচল বন্ধ
শ্রমিকদের মারধর ও বাস ভাংচুরের চেষ্টা করার খবর নথুল্লাবাদে এসে পৌছুলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক যাত্রী জানায়, মুহূর্তের মধ্যে শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে অভ্যন্তরিন সকল রুটে যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। একই সাথে বরিশাল-ঢাকা রুটের নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল সহ সড়কের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি আলফা, মাহেন্দ্র এবং ইজিবাইকের উপর হামলা করে। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সংবাদ পেয়ে জেলা এবং বিমান বন্দর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করে। এরপর থেকে আলফা, মাহেন্দ্র এবং ইজিবাইক চলাচল বন্ধ হয়।
ধর্মঘট অব্যাহত রাখার ঘোষনা
আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মহা সড়কের সকল প্রকার ত্রি-হুইলার যানবাহন চলাচল বন্ধ না করা পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন মালিক সিন্ডিকেটের নেতা ইউসুফ হাওলাদার। রাত ১০টার পর বরিশাল থেকে দুরপাল্লার সকল রুটের বাস চলাচল বন্ধ বলে জানান তিনি।
প্রশাসনের সমাধানের চেষ্টা
রাতে প্রশাসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাস মালিক-শ্রমিক এবং আলফা মাহেন্দ্র মালিক এবং শ্রমিকদের নিয়ে সমঝোতা বৈঠকে বসেছেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তারা কোন সমাধানে পৌছার খবর দিতে পারেননি।
পুলিশ সুপারের বক্তব্য
এসএম আক্তারুজ্জামান বলেন, মহাসড়কে ত্রি-হুইলার যানবাহন চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিয়ে উচ্চ আদালত থেকে একটি নির্দেশ জারি করে। এর প্রতিবাদে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরিশাল-ঢাকা মহা সড়কে ও গৌরনদী আগৌরঝাড়া ফিডার রোডে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ করে অটো-টেম্পু এবং মাহেন্দ্র শ্রমিকরা। পুলিশ তাদের শান্ত করে ফিরিয়ে দেয়। এর কিছুক্ষন পর পুনরায় তারা সমবেত হয়ে ত্রি-হুইলার যানবাহন চলাচলের দাবীতে গৌরনদীর-আগৈলঝাড়া পয়সার হাট মহা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে তারা।
বাস মালিক এবং শ্রমিকদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, আন্দোলন চলাকালে বরিশাল থেকে ভুরঘাটা গামি একটি বাস সেখানে পৌছুলে স্থানীয় কিছু অটোরিক্সা এবং মাহেন্দ্র চালকরা শ্রমিককে মারধর এবং বাস ভাংচুরের চেষ্টা করে। এ খবর বাস মালিক এবং শ্রমিকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে তারা যৌথ ভাবে বাস ধর্মঘটের পাশাপাশি অটোরিক্সা এবং মাহেন্দ্র চলাচল বন্ধ করে দেয়।
পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনার পর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে উভয় পক্ষের সাথে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে যেহেতু উচ্চ আদালতের নির্দেশে। সে ক্ষেত্রে সব কিছু আইন অনুযায়ী করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে সরেজমিনে দেখাগেছে, হঠাৎ করে বাস এবং মাহেন্দ্র চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় হাজার হাজার যাত্রীকে পড়তে হয় সিমাহিন ভোগান্তিতে। দুপুর থেকে দূরপাল্লার পরিবহন চললেও অভ্যন্তরিন সকল রুটে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিলো। যে কারনে নথুল্লাবাদ থেকে কাশিপুর এবং গড়িয়ারপাড় পর্যন্ত পায়ে হেটে গিয়ে মোটর সাইকেল, মাইক্রোবাস এবং ট্রাকে চেপে যাত্রীদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে দেখা গেছে। তবে বেশিরভাগ যাত্রীরাই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রায় ব্যর্থ হয়ে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছে বলে একাধিক যাত্রী নিশ্চিত করেছেন।