মহানগর আ’লীগের শূণ্যতা পূরণে নতুন নেতৃত্ব চায় মাঠ নেতারা

পুলক চ্যাটার্জি, অতিথি প্রতিবেদক॥ বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি এখন এক সদস্যের। এ কমিটিতে আর কেউ নেই। ওই এক নেতার বুদ্ধি-পরামর্শেই চলছে নগর শাখার কার্যক্রম। তিনি সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম। নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক মেয়র ও সাংসদ শওকত হোসেন হিরন মারা যাওয়ার পর আফজালের জালে জড়িয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে নগর আওয়ামীলীগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর একাধিক ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ নেতা বলেছেন, আফজালুল করিম মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হলেও তিনি নগরীর ভোটার নন। শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুর পর আফজাল একাই টানছেন মহানগর আওয়ামীলীগ। ফলে সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেমে এসেছে স্থবিরতা। নগর আওয়ামী লীগের মাঠ নেতারা এমন অবস্থার অবসান চান। মহানগর আওয়ামীলীগের কমিটি গঠনের বিষয়টি নিয়ে নগরীতে চলছে নানামুখি আলোচনার ঝড়।
মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন প্রসঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় এক দায়িত্বশীল নেতা বলেছেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আওয়ামীলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন ছাড়া সভাপতির শূন্য পদ পূরণ করা সম্ভব নয়। যেহেতু ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন এবং আফজালুল করিম নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে আর পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটি তথা দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে নতুন কাউন্সিল অথবা পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেন। এক্ষেত্রে নগরীর ওয়ার্ড নেতৃবৃন্দের মতামতও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ওই নেতা। তিনি আরও জানান, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ২০১২ সালের কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি গঠনের সম্ভাবনাই বেশি।
নগর আওয়ামীলীগের কমিটি নিয়ে নানামুখি আলোচনা চলছে স্থানীয় রাজনীতি সচেতন মহলে। নগরের ওয়ার্ড নেতা-কর্মীরা নতুন নেতৃত্ব পেতে অনেকটা উজ্জীবিত। দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতেও লেগেছে প্রাণচাঞ্চল্যের ঢেউ। কারণ দীর্ঘ প্রায় দু’বছর পর নগর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছে। দলের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির শূন্য পদে এবং সাধারণ সম্পাদক পদেও নতুন নেতৃত্ব আসছে, এমনটাই আভাস দিয়েছেন নগরীর ৩০ ওয়ার্ডের অধিকাংশ নেতারা। অধিকাংশ ওয়ার্ড নেতৃবৃন্দের মতে, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে আসতে পারেন সদর আসনের বর্তমান সাংসদ প্রয়াত শওকত হোসেন হিরনের সহধর্মিনী জেবুন্নেসা আফরোজ। তবে এ পদে আরও যারা আসতে চাইছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন বরিশাল নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল, কর্নেল (অবঃ) জাহিদ ফারুক শামিম ও আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি একেএম জাহাঙ্গীর। সাংসদ হিরনের মৃত্যুর পর সদর আসনের উপ-নির্বাচনে জেবুন্নেসা আফরোজ হিরন সাংসদ নির্বাচিত হয়ে দলীয় কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হন এবং সে প্রেক্ষাপটে তিনিই মহানগর সভাপতি পদের অন্যতম দাবিদারে পরিণত হয়েছেন। তবে দেশের বাইরে থাকায় এ ব্যাপারে এমপি জেবুন্নেসা আফরোজের ব্যক্তিগত মতামত জানা যায়নি।
অপরদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম এবং যুবলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর নাম আলোচিত হচ্ছে জোরেসোরে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর একাধিক সিনিয়র ওয়ার্ড নেতা বলেছেন, শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুর পর সাধারণ সম্পাদক আফজালুল করিমের সাংগঠনিক ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই নেতাদের অভিযোগ, আফজাল যতটা না সাংগঠনিক কাজে সময় দিয়েছেন। তার চেয়ে বেশি দৌড়ঝাঁপ করেছেন নিজের পদ-পদবী রক্ষা এবং জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য। ওয়ার্ড নেতাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, নগর সভাপতির পদ সাংসদ জেবুন্নেছা আফরোজ পেয়ে যাচ্ছেন, এমনটা বুঝতে পেরে আফজাল নিজেই সভাপতি পদের জন্য কেন্দ্রে দৌড়ঝাঁপ শুরু করলে হিরন অনুসারী ওয়ার্ড নেতারা আফজালের পক্ষ ছাড়েন। হিরন সমর্থকদের মধ্যে বেশ কিছু সংগঠক আফজালের বিরোধিতায় মাঠেও নেমেছন সক্রিয়ভাবে। তারা কোনক্রমেই আফজালুল করিমকে আর সাধারণ সম্পাদক পদে দেখতে চান না। তাদের মতে, নগরীর তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে আফজালুল করিমের যোগাযোগ নেই বরং তারা এখন কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর পক্ষ নিয়েছেন। ১৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সিটি কাউন্সিলর গাজী নাঈমুল হোসেন বলেন, তারা ঈদুল আযহার পর ২০টি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ একত্রিত হয়ে সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর প্রতি তাদের সমর্থনের কথা ব্যক্ত করেছেন। ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অধিকাংশ শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি জানান।
নগরীর ২নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আমির হোসেন তালুকদার বলেন, বর্তমান অবস্থায় কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব চাচ্ছে নগরীর মাঠ নেতারা।
নগরীর ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুরাদ হাসান রিন্টু জানান, মহানগর আওয়ামী লীগ এক রকম অচল হয়ে আছে। তাই কাউন্সিলের মাধ্যমে তারা নতুন নেতৃত্ব চান।
তবে প্রয়াত শওকত হোসেন হিরনের সমর্থকদের একটি ক্ষুদ্র অংশ মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে আফজালুল করিমকে পুনরায় দেখতে চান। ১২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মফিজুর রহমান চৌধুরী আজকের পরিবর্তনকে বলেন, তারা হিরনপন্থী জেবুন্নেছা আফরোজ এমপিকে সভাপতি এবং আফজালুল করিমকে সাধারণ সম্পাদক পদে পেতে চান। মহানগরের কমিটি গঠন প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম বলেন, প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন তার জীবদ্দশায় মহানগর আওয়ামী লীগের একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া কমিটি করেছিলেন। ওই খসড়া কমিটিতে সভাপতি পদে জেবুন্নেছা আফরোজ এমপিকে রেখে দুই/এক দিনের মধ্যে তা দলীয় সভানেত্রীর কাছে দেওয়া হবে। আফজাল দাবি করেন, নগরীর ওয়ার্ড নেতৃবৃন্দের সমর্থন আছে  ওই খসড়া কমিটির প্রতি।
এদিকে যে প্রক্রিয়ায়ই কমিটি হোক না কেন, সাধারণ সম্পাদক পদে সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহকে চাচ্ছেন জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অধিকাংশ নেতারা।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মোঃ ইউনুস এমপি বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটির ব্যাপারে দলীয় সভানেত্রী গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিদ্বান্ত দেবেন। এখানে পুরনো খসড়া কমিটি কিংবা আবেগ-অনুরাগের কথা বলে ধুম্রজাল সৃষ্টি না করাই শ্রেয়।
জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি শাহজাহান হাওলাদার বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি হতে হবে দলের শেকড় থেকে গড়ে ওঠা নেতৃবৃন্দদের নিয়ে।
জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক ডা. মোকলেসুর রহমান মনে করেন, সাধারণ সম্পাদক পদে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ এবং সুসংগঠিত করতে পারবেন। কারণ বয়সে তরুণ হলেও সাদিক রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য।
দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা-কর্মী মনে করেন, মহানগর কমিটি এমন নেতৃত্বের হাতে তুলে দেওয়া উচিত যাদের মাধ্যমে দল সুসংগঠিত হবে এবং আগামী দিনে বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রাম মোকাবেলায় মাঠে থাকবে।
এদিকে রাজনীতিতে নতুন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা কর্ণেল জাহিদ ফারুক শামিম সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনেকটা আলোচনায় উঠে এসেছেন। বিশেষ করে বরিশাল বিএনপির স্তম্ভ বলে খ্যাত, বার বার নির্বাচিত সাংসদ মজিবর রহমান সরোয়ারের সাথে মাত্র ৫ হাজার ভোটে হেরে যাওয়ায় অখ্যাত এই সামরিক কর্মকর্তা অনেকটাই হিরো বনে যান। ওই সময় আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে চলে আসেন কর্ণেল জাহিদ ফারুক শামিম। রাজনীতিতে হঠাৎ এসে ভোটারদের মন জয় করে ফেলেছিলেন। তিনি বরিশাল আওয়ামী রাজনীতিতে ক্লিনম্যান হিসেবে পরিচিত। জাহিদ ফারুক শামিম সভাপতি পদে নির্বাচিত হলে অযৌক্তিক কিছু হবে না বলে তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করেন।