বৈশাখকে কেন্দ্র করে ইলিশের দাম আকাশচুম্বি

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বাঙালির উৎসব পহেলা বৈশাখ আগমনের বাকি মাত্র এক দিন। উৎসবের অনন্য অংশ হিসেবে থাকা পান্তা ইলিশ খাওয়ার রীতি বৈশাখের প্রধান আকর্ষন। আর তাই শেষ সময়ে নগরীর পাইকারী ও খুচরা উভয় বাজারেই চলছে ইলিশ ডাকাতি। বিভিন্ন বাহানায় উভয় বাজারের বিক্রেতারা সকল শ্রেনীর ক্রেতাদের করছেন নাজেহাল। গত বছর থেকে ইলিশ রক্ষায় সরকারসহ সুশীল সমাজ বৈশাখে ইলিশ খাওয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখার ঘোষণা দেন। এর পরেও এই পান্তা ইলিশ এর চলন যেন ভুলছেনা ভোজনরসিক বাঙালিরা। অন্যদিকে বেশি দামে বিক্রির কারন হিসেবে বাজারে ইলিশের চাহিদা ও অভয়াশ্রমে ইলিশ নিধনে নিষেধাজ্ঞাকেই দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা জানিয়েছেন বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালী জেলার নদীগুলোর মধ্যে যেসব স্থানে বেশি মাছ ধরা পড়তো ঐ স্থানগুলোকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করে ২ মাস মাছ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। ঐ স্থান ব্যতীত অন্য নদীতে জাল ফেলে গত ও চলতি মাসে মাছের আমদানি বাড়ানো যায়নি স্থানীয় আড়তগুলোতে। তবে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে খুচরা বাজার বার্মার ইলিশে সয়লাব থাকে। যার প্রভাব এবারও রয়েছে। দেশি ইলিশের স্বাদের তারতম্যের কারণে বার্মার ইলিশের পরও মিঠা পানির এ ইলিশের কদর নগরবাসী সহ সকলের কাছে বেশি। তাই নিষেধাজ্ঞার সময়টায় চাহিদা অনুযায়ী ইলিশ সরবরাহ না থাকায় জেলে ও দাদনদারদের থেকেই ইলিশের দাম চড়া থাকে। তারা জানান, দিনে দিনে ইলিশের আকার ছোট হয়ে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে ৬/৭শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশেও ডিম পাওয়া যায়। কিন্তু চার বছর আগেও ৮শ গ্রামের নিচের মাছে ডিম পাওয়া যেতো না। তাই এসব ইলিশ ধরতে অনেকে কারেন্ট জালও ব্যবহার করেন। এই জাল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকায় অভয়াশ্রম ব্যতীত অন্য নদী থেকেও তেমন একটা ইলিশ ধরা যাচ্ছে না। নগরীর পোর্টরোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র (ইলিশ মোকাম) ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা ও পাইকারী ক্রেতাদের ভিড় অনেক। বাজারে ইলিশ, নদীর চিংড়ি, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে। তবে ক্রেতাদের তুলনায় মাছের পরিমাণ অনেকটাই কম। এ বিষয়ে ক্রেতা মহিউদ্দিন মিয়া নামের এক চাকরিজীবী বলেন, বৈশাখের আগে বাজারে ইলিশের দাম চড়া। পাশাপাশি অন্য মাছের পরিমাণও কম। তাই বুঝেশুনে মাছ কিনতে হচ্ছে। আড়ৎ কর্মচারী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আমদানি কমের কারণে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড়শ’ মণ ইলিশ আসছে, যা ১৪১ জন আড়ৎদার ভাগ করে নিচ্ছেন। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেই এ ইলিশ আসবে দুই থেকে আড়াই হাজার মণ। পোর্টরোডের আড়ৎদার মাসুম সিকদার জানান, এখন প্রতিদিনই ইলিশের দাম বাড়ছে। পহেলা বৈশাখের আগের দিন পর্যন্ত দাম বাড়বে। তিনি জানান, পাইকারী বাজারে ৪শ’ গ্রামের কম ওজনের ইলিশের নিষেধাজ্ঞার আগে কেজি প্রতি দাম ছিলো ৩শ’ টাকা, এখন তা সাড়ে ৪শ’ টাকা। ৫ থেকে ৮শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশের নিষেধাজ্ঞার আগে কেজি প্রতি দাম ছিলো সাড়ে ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা, এখন তা ৭৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আবার ১ কেজি আকারের ইলিশ নিষেধাজ্ঞার আগে বিক্রি হয়েছে ১৫শ’ টাকায়, এখন তা হচ্ছে ২৫শ’ টাকায়। আর ২৫শ’ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া দেড়কেজি ওজনের ইলিশ এখন বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। অপর এক আড়ৎদার জানান, দাম যাই হোক বড় আকারের ইলিশ মাছ সংরক্ষণ করে রাখা হতো দেড়মাস আগে থেকে। কিন্তু এখন তাও পাওয়া যায় না। এখন যা পাওয়া যাচ্ছে সংরক্ষণ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে।
জেলা মৎস্য অফিসের কর্মকর্তা (হিলসা) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, বরিশাল, ভোলা, মেহেন্দিগঞ্জের মেঘনা ও কালাবদর নদীর বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ইলিশ ধরা বন্ধ। অন্য নদীতেও ধরা পড়ছে না আশানুরূপ ইলিশ। তার উপরে মৎস্য বিভাগের অভিযান সব মিলিয়ে সরবরাহ কম থাকায় বাজারে ইলিশের দাম কিছুটা বাড়তি। তবে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞার কারণে বাৎসরিক মাছ উৎপাদনের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি ভরা মৌসুমে ইলিশের অভাব না থাকায় বাজার যেমন সহনশীল হচ্ছে, তেমনি সংশ্লিষ্ট সকলেই লাভবান হচ্ছেন।