বেপরোয়া মোটর সাইকেল চোরচক্র ॥ এক সপ্তাহে ৬টি মোটর সাইকেল চুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ নগরীতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মোটর সাইকেল চোরচক্র। প্রতি মাসেই নগরী থেকে ১০/১২টি মোটর সাইকেল চুরি হয়। মহানগর পুলিশ’র চার থানায় প্রতি মাসে মোটর সাইকেল চুরির ২/৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। গত এক সপ্তাহে নগরীর কাশিপুর থেকে ৬টি মোটর সাইকেল চুরি হয়েছে। বিমান বন্দর থানাতে ৬টি মোটর সাইকেল চুরির অভিযোগ দায়ের হয়েছে। এই ঘটনায় এলাকাবাসী টহল পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ করেছেন। এমনকি বাসা বাড়ির তালা ভেঙ্গে পর পর ছয়টি মোটর সাইকেল চুরির ঘটনায় উঠা টহল পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ একেবারেই ছোট করে দেখছেন না পুলিশ কর্মকর্তারা। চুরির ঘটনার পাশাপাশি রাতে টহল পুলিশের দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে দেখছেন বলে জানিয়েছেন মেট্রোপলিটন বিমান বন্দর থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেন।
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে, গত ১লা অক্টোবর থেকে ৮ অক্টোবর রাত পর্যন্ত মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে বিমানবন্দর এলাকা থেকে ৬টি মোটর সাইকেল চুরি হয়েছে। তবে তা এক একটি করে নয়, এক সাথে তিনটি করে মোটর সাইকেল ঘরের সিঁড়ি’র, গ্যারেজ ও স্টোর রুমের তালা ভেঙ্গে চুরি করে দুর্র্বৃত্তরা। সর্বশেষ গত ৮ অক্টোবর দিবাগত রাতে কাশিপুর ২৯ নং ওয়ার্ডের ইছাকাঠী ভূইয়া সড়ক থেকে ৩টি মোটর সাইকেল চুরি হয়েছে। এর মধ্যে এক স্থান হতে দুটি এবং অপর স্থান হতে একটি মোটর সাইকেল চুরি হয়। তিনটি চুরির ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় পৃথক দুটি সাধারন ডায়েরী করা হয়েছে।
ডায়েরীতে উল্লেখ করা হয়েছে, রোববার রাতে কাশিপুর আনসার ক্যাম্পের পেছনের বাসিন্দা খোরশেদ আলম হাওলাদারের ছেলে জাফর ইকবাল তার ব্যবহৃত লাল রং এর বাজাজ কোম্পানির ১৫০ সিসি পালসার মোটর সাইকেলটি ইছাকাঠী ভূইয়া সড়কে আয়ুব আলী খান এর বাড়ির স্টোর রুমে রাখেন। যার রেজিষ্ট্রেশন নং- পটুয়াখালী-ল-১১-০৫১০। স্টোরের একই স্থানে বরগুনার আমতলী উপজেলার কাজীবাড়ির মোর্শারফ হাওলাদারের ছেলে মো. সোহাগ এর কালো রং এর একটি বাজাজ প্লাটিনা মোটর সাইকেল ছিলো। যার রেজিঃ নং- পটুয়াখালী-হ-১১-৩৭৫৪। মোটর সাইকেল দুটি রেখে স্টোর রুমে এবং সামনে ক্লাবসিবল গেটে তালা ঝুলিয়ে চলে যান মোটর সাইকেলের মালিকগন। পরবর্তীতে গতকাল সোমবার ভোর সাড়ে ৫টায় মোটর সাইকেল নিতে এসে স্টোরের কলাপসিবল গেট খোলা দেখেন। এমনকি ভেতরে থাকা মোটর সাইকেল দুটিও খুঁজে পাননি তারা। এই ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় সাধারন ডায়েরী নং-৩১৫।
এদিকে একই রাতে ভূইয়া সড়কের পার্শ্ববর্তী আবুল বাশার ভূইয়া’র ছেলে জাহাঙ্গীর ভূইয়ার’ বাজাজ কোম্পানির লাল রং এর ১৫০ সিসি পালসার মোটর সাইকেল চুরি হয়েছে। যার রেজিষ্ট্রেশন নম্বর বরিশাল-ল-১১-২৬১৮। এই ঘটনায় তিনি বিমানবন্দর থানায় একটি সাধারন ডায়েরী করেছেন। যার নম্বর- ৩১৩। ডায়েরীতে তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রতিদিনের ন্যায় রোববার রাত ১০টার দিকে তার ব্যবহৃত মোটর সাইকেলটি নিজ বাড়ির সিঁড়ির নিচে রেখেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমিয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। সকালে উঠে দেখতে পান বাড়ির কলাপসিবল গেটের তালা ভাঙ্গা এবং মোটর সাইকেলটি নেই।
এর পূর্বে গত ১ অক্টোবর দিবাগত রাতে ২৮নং ওয়ার্ডের ফিশারী রোড এলাকার মীরা বাড়ির একই স্থান থেকে তিনটি মোটর সাইকেল চুরি হয়। এই ঘটনায় ২ অক্টোবর একটি মোটর সাইকেলের মালিক সৈয়দ ফজলে রাব্বী বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় একটি সাধারন ডায়েরী করেন। যার নম্বর-৫১।
ডায়েরীতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১ অক্টোবার রাত পৌনে ১২টার দিকে সৈয়দ ফজলে রাব্বী তার ব্যবহৃত এফ.জেড.এস-ভারর্সন-২ মোটর সাইকেলটি (রেজিষ্ট্রেশন এর সিরিয়াল নং-৫৩৫৬) দ্বিতল বাড়ির গ্যারেজে রাখেন। সেখানে তার ভগ্নিপতি মো. জাহিদুল ইসলামের ব্যবহৃত নীল রং এর ১৫০ সিসি পালসার মোটর সাইকেল (রেজিঃ নং- বরিশাল-ল-১১-৪৫৩৭) এবং বাড়ির ভাড়াটিয়া মো. কবির হোসেন খান এর ব্যবহৃত লাল-কালো রং এর ১৫০ সিসি ডিসকভার মোটর সাইকেল (রেজিঃ নং- ঢাকা মেট্রো-ল-২১-২০০৬) রাখা ছিলো। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পান গ্যারেজের কলাপসিবল গেট খোলা এবং ভেতরে একটি মোটর সাইকেলও নেই। পরবর্তীতে গেটের তালাটি পার্শ্ববর্তী বাগানের ভেতরে পাওয়া গেলেও চুরি যাওয়া মোটর সাইকেল তিনটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিমানবন্দর থানায় খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, গত ১ অক্টোবর এবং ৮ অক্টোবর দিবাগত রাতে সংঘটিত দুটির চুরির ঘটনার সাথে জড়িত কাউকে এখনো খুঁজে বের করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি চুরি যাওয়া মোটর সাইকেল উদ্ধারে তাদের তৎপরতাও দায় সারা ভাবে চলছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে স্থানীয় একাধীক সূত্র জানায়, বিমানবন্দর থানা পুলিশের দায়িত্ব অবহেলার কারনেই এলাকায় উদ্বেগজনক হারে চুরি-ছিনতাই’র ঘটনা ঘটেছে। রাতে বিমানবন্দর থানায় এলাকায় পুলিশের টহল ব্যবস্থা নামে মাত্র জোরদার থাকছে। বাস্তবে রাতের টহল পুলিশের দায়িত্ব অবহেলার চিত্রই বেশি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তারা বলেন, রাত ১০টা থেকে ১২টার কিছু সময় পর্যন্ত পুলিশের টহল টিম দু’একবার চোখে পড়ছে। কিন্তু এর পর ভোর রাত পর্যন্ত তাদের কোন খোঁজ থাকছে না। কোন এক পয়েন্টে টহল গাড়ি থামিয়ে নিদ্রায় মগ্ন হচ্ছেন টহল পুলিশ। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চোর চক্র বাসা-বাড়ির তালা ভেগে কিংবা বিভিন্ন উপায়ে চুরি সংঘটিত করছে।
হঠাৎ করে এ এলাকায় মোটর সাইকেল চুরি হওয়ায় আতংকিত হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী। তারা এ চুরি রোধে প্রশাসনের পাশাপাশি গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছেন। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর কিছুদিন গা ঢাকা দেয় সংঘবদ্ধ চোর চক্র। আবার আইন-শৃংখলা বাহিনীর অভিযান কমে আসলেই শুরু হয়ে যায় চুরি। চুরি হওয়া মোটর সাইকেল মালিকরা জানান, গভীর রাতে নগরীর ৪ থানায় এত টহল পুলিশ এড়িয়ে মোটর সাইকেলগুলো কিভাবে চোরচক্র নিয়ে গেলো তা তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। কেননা রাত ১২টার পর থেকেই ৪ থানা পুলিশ টহল জোরদার করে। পাশাপাশি ডিবি পুলিশের টহলদল নগরীর মোড়ে মোড়ে টহল দেয়। প্রশাসনের এ কঠোর নজরদারীতে চোরচক্রের এ বীরদর্পের চুরিতে আইন-শৃংখলার অবনতি হিসেবে দেখছেন তারা।
এলাকাবাসীর অভিযোগের বিষয়ে বিমানবন্দর থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, এলাকাবাসীর দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ একেবারেই ফেলে দেয়া যাচ্ছে না। কেননা টহল পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ছয় দিনের ব্যবধানে দুই রাতে বাসা বাড়ির তালা ভেঙ্গে ছয়টি মোটর সাইকেল চুরির ঘটনা আমাদের জন্যও হতাশার বিষয়। তাই বিষয়টি খুব গুরুত্বতার সাথেই দেখছি। জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে। দেখা যাক কি করা যায়’ বলে মন্তব্য করেন ওসি।