বেগম জিয়া লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছেন- ওবায়েদুল কাদের

রুবেল খান ॥ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক এবং সড়ক, যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী ওবায়েদুল কাদের-এমপি বলেছেন, বিএনপি এখন বাংলাদেশ নালিশ পার্টিতে পরিনত হয়েছে। কান্নাকাটি আর নালিশ করা ছাড়া এখন আর তাদের কোন রাজনীতি নেই। ঈদের পরে নাকি তারা দুর্বার আন্দোলনে নামবে। কিন্তু দিন গেলো, সপ্তাহ গেল, মাস গেলো আন্দোলনের কোন খবর নেই। কারন বেগম জিয়া বুঝতে পেরেছেন বিএনপি’র আন্দোলনে কেউ সাড়া দিবে না। তাইতো বেগম খালেদা জিয়া ভয় পেয়ে লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি’র বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক এবং সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি এসব কথা বলেছেন।

এর পূর্বে নগরীর ফজলুল হক এভিনিউ সড়কে বিসিসি’র নগর ভবনের সামনে মুক্ত মঞ্চে আয়োজন করা হয় মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ এবং নবায়ন কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। বিকাল ৪টায় অনুষ্ঠান শুরু হলেও অনুষ্ঠানস্থলে জন¯্রােত শুরু হয় দুপুর থেকেই। নগরী মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার নেতা-কর্মী কাকভেজা হয়ে পায়ে হেটে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র আর ভুভুজেলা বাশির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে গোটা নগরী। শুধু মহানগরী এলাকাই নয়, বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকেও বাস, লঞ্চ বোঝাই করে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেয় আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা।

এদিকে উদ্বোধনী আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি সড়ক ও যোগাযোগ এবং সেতু মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আরো বলেন, বিএনপি কখনো আওয়ামী লীগকে দোষ দিচ্ছেন, আবার কখনো নির্বাচন কমিশনকে দুষছেন। তারা যাই করুক আগামী ২০১৯ সালের পূর্বে কোন নির্বাচন নয়।

জোট সরকারের আমলে বিএনপি’র বিভিন্ন সমালোচনা করে ওবায়দুল কাদের বলেন, হত্যা, গুম খুনের মধ্যে দিয়েই বিএনপি’র উত্থান। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে হত্যা, গুম, খুন করেছে। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা বাড়িতে ঘুমাতে পারেনি। তাদের বাড়ি-ঘর, জমি, গাছ-পালা কেটে নিয়ে গেছে। লুটপাট করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ শান্তির দল। তাই আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতার আমলে বিএনপি নেতা-কর্মীরা শান্তি আছে।

তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরে তার একটি ভাঙ্গা সুটকেট ছিলো। কিন্তু সেই সুটকেস এর ভেতরে কি আলাদিনের চেরাগ ছিলো যে এক সাথে সাতটি কোকো লঞ্চ নেমে গেলো। আওয়ামী লীগ দুর্নীতি এবং সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাসী নয়। এটা বিএনপিকেই মানায়। দশ ট্রাক অস্ত্র তারাই এনেছিলো। বিদেশের আদালতে দুর্নীতি মামলায় তাদেরই সাজা হয়েছিলো।

মন্ত্রী বলেন, বিএনপি’র আন্দোলন মানেই মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করা। বাস-ট্রাকে পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যা, মানুষের গাছ-পালা কেটে ফেলে মানুষকে কষ্ট দেয়। আন্দোলনের নামে তারা ১৬৫ জনকে পুড়িয়ে মারা সহ বিভিন্ন ভাবে হত্যা করেছে। বাংলা ভাই এবং এরশাদ সিকদারের মত সন্ত্রাসীদেরও জন্ম দিয়েছিলো তারা।

বরিশালে বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর আগমন এবং সদস্য সংগ্রহের সমালোচনা করে তিনি বলেন, মহাসচিব বরিশালে এসে জয় করে যেতে পারেননি। বরং বিএনপি নেতা-কর্মীদের ভয়ে পালিয়ে গেছেন। তিনি একজন মহাসচিব। কিন্তু তার সামনেই বিএনপি নেতা-কর্মীরা মারামারি, ধাক্কাধাক্কি এবং বিশৃঙ্খলা করেছেন। তিনি একজন মহাসচিব হলেও নেতা-কর্মীদের থামাতে পারেননি। তাই নেতা-কর্মীদের ভয়ে সড়ক পথে বরিশাল থেকে পালিয়ে গেছেন। কিন্তু বলছেন তাকে অসম্মানের কথা। শুধু বরিশালেই নয়, বিএনপি যেখানেই জেলা সম্মেলন করছে সেখানেই নিজেদের মধ্যে মারামারি ও বিশৃঙ্খলা করেছে। কারন নেতা-কর্মীরা নিজেরাই এখন হতাশ।

ওবায়দুল কাদের তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে বলেন, একজন রয়েছেন তিনি গত সাড়ে ৮ বছর পূর্বে পালিয়েছেন। এখন আর ফিরে আসার কোন খবর নেই। হামলা, মামলা এবং আদালতে ভয়ে তিনি পালিয়ে আছেন। যারা হামলা, মামলা, নির্যাতনের পালিয়ে যায় তাদের নির্বাচন নিয়ে স্বপ্ন দেখা মানায় না। দেশের জনগন ২০০১ সালের সেই ভয়াল চিত্র আর দেখতে চায় না। আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকেই আবার বিজয়ী করবে। কেননা মুক্তিযুদ্ধকে বাঁচাতে হলে আওয়ামী লীগকে বাঁচাতে হবে, স্বাধীনতাকে বাঁচাতে হবে। আওয়ামী লীগকে বাঁচাতে হবে। গনতন্ত্র এবং উন্নয়নকে বাঁচাতে হলে আওয়ামী লীগকে আরো একবার ক্ষমতায় আনতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে ওবায়দুল কাদের বলেন, একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলেই দেশের উন্নয়ন হয়। বরিশাল নিয়ে আমাদের নেত্রীর পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিপূর্বে এই অঞ্চলে সেতু, রাস্তাঘাট, স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় নির্মান করেছেন। তাছাড়া ফরিদপুর থেকে বরিশাল নগরীর গড়িয়ারপাড় পর্যন্ত ফোর লেন রাস্তা নির্মান প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে। পাশাপাশি গরিয়ারপাড় থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ফোর লেন সড়ক নির্মানের জন্য সিপিপি তৈরী করে মন্ত্রনালয়ে প্রেরণের নির্দেশ দেন সড়ক ও জনপদ বিভাগকে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনা অনুযায়ী মুলাদী-বাবুগঞ্জের মীরগঞ্জে সন্ধ্যা নদীতেও সেতু নির্মান কাজের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি’র বক্তৃতায় স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক চীফ হুইপ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সিনিয়র কার্যনির্বাহী সদস্য ও বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপি বলেন, দীর্ঘ ২১ বছর উন্নয়ন বঞ্চিত ছিলো অবহেলিত বরিশাল অঞ্চল। ২১ বছর যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে হায়েনার মত মানুষ হত্যা এবং নির্যাতন করেছে। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়ি ঘর দখল, লুটপাট করেছে। ১৯৭৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত তারা আওয়ামী লীগের ২৬ হাজার নেতা-কর্মী হত্যা করেছে। যার মধ্যে রয়েছে বরিশাল কলেজের ভিপি ফারুক এবং আগৈলঝাড়ার বীর বাহাদুরও। ওরা বাংলাভাইকে সৃষ্টি করেছে। সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলা করে ঝালকাঠির দুই বিচারক সহ বহু মানুষকে হত্যা করেছে। যারা হত্যা এবং সিরিজ বোমা হামলা করেছে তারা কাদের তৈরী? ১০ ট্রাক অস্ত্র কারা এনেছিলো? গুম, খুন হত্যা এবং নৈরাজ্যের পরেও আমরা ক্ষমতার আমলে ওদের কিছু বলিনি। কারনে জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “ওরা অধম হলে আমরা কেন উত্তম হবো না”।

জনগনের উদ্দেশ্যে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপি বলেন, আপনারা ভুলে যাবেন না ২০০১ সালের কথা। সেদিন কিভাবে ওরা বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো। মানি লন্ডারিং করে বিদেশে টাকা পাচার করেছে। জিয়াউর রহমান এর মৃত্যুর পরে ছিলো একটি ভাঙ্গা সুটকেস। সেই সুটকেস থেকে ৭টি কোকো লঞ্চের মালিক হলেন কিভাবে। ভাঙ্গা সুটকেসের মধ্যে কি আলাদিনের চেরাগ ছিলো।

তিনি বলেন, ৯৬ তে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে জননেত্রী শেখ হাসিনা বরিশালের অবহেলিত জনগোষ্ঠির উন্নয়নের কথা বলেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এই অঞ্চলের উন্নয়নের। তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রেখেছেন। এ অঞ্চলের মানুষ কখনো ভাবেননি যে পদ্মা সেতু পার হয়ে তারা ঢাকায় যাবেন। বরিশালে পায়রা বন্দর, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনা তা করে দেখিয়েছেন। বরিশালবাসী এখন দাবী তুলেছেন বরিশালে স্বতন্ত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের। জনগনের এই দাবীও অপুর্ণ রাখবেন না প্রধানমন্ত্রী। বরিশালে স্বতন্ত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় করবেন তিনি। তাই আর একবারের জন্য হলেও জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে হবে। কেননা নৌকায় ভোট দিলে শেখ হাসিনা কিংবা আমার কোন লাভ হবে না। দেশ এবং জনগনের উন্নয়ন হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে অন্যান্যদের মাঝে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারন সম্পাদক আব্দুর রহমান এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাসিম-এমপি, তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক মো. আফজাল হোসেন এবং বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক এ্যাড. তালুকদার মো. ইউনুস এমপি।

এছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য গোলাম রব্বানী তিলু, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক এ্যাড. একেএম জাহাঙ্গীর ও সহ-সাধারন সম্পাদক গাজী নঈমুল হোসেন লিটু। এছাড়াও বরিশাল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মইদুল ইসলাম, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ সহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী, বিভিন্ন উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়রগন উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভার পূর্বে নতুন ভোটার হিসেবে একজন নতুন নারী ভোটার এবং মমতাজ মজিদুন্নেছা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মমতাজ কাওসারকে আওয়ামী লীগের নতুন সদস্য করা এবং আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ-এমপি, এ্যাড. তালুকদার মো. ইউনুস-এমপি, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ্যাড. গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল সহ কয়েকজনের আওয়ামী লীগের সদস্য পদ নবায়নের মধ্যে দিয়ে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন দলের সাধারন সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়েদুল কাদের। আজ শুক্রবার তিনি বরিশাল-পটুয়াখালী সড়কে লেবুখালী সেতুর নির্মান কাজ পরিদর্শনে যাবেন।