বৃদ্ধাশ্রমে থেকেও সন্তানদের মঙ্গল কামনায় মা

রুবেল খান॥ তোমাকে ভালবাসতে কোন দিবস লাগে না। তবুও তোমার জন্য একটি দিবস মা। আজ সেই বিশ্ব মা দিবস। দিনটি পালনে অনেক রকম আয়োজন থাকলেও বঞ্চিত মায়েদের খবর নিচ্ছে না কেউ। পারিপার্শ্বিক নির্দয় সিদ্ধান্ত আর সংসারের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে অনেক মা এখানো সন্তানদের কাছে থাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কেউ ঝি এর কাজ, কেউ ভিক্ষাবৃত্তি আবার কারো আশ্রয় জুটছে বৃদ্ধাশ্রমে। এমনই একজন হতভাগী মা কদবানু। ৭০ উর্ধ্ব বয়সি বৃদ্ধা কদবানু পটুয়াখালী সদর থানা এলাকাধিন বড় বিঘাই গ্রামের মৃত আফতের মৃধার স্ত্রী। ৬ সন্তানের জননী হয়েও ছেলে, মেয়ে এবং নাতী-নাতনিদের সঙ্গে এক ঘরে আশ্রয় জোটেনি অভাগী কদবানুর কপালে। তাই ছেলে-মেয়ের আদর ভালোবাসা বঞ্চিত এই মায়ের শেষ আশ্রয় হয়েছে শান্তি নিবাসে (বৃদ্ধাশ্রম)। প্রায় ১৪ বছর ধরে সন্তান ও নাতী নাতনিদের আদর ভালোবাসা বঞ্চিত অসহায় এই মা এখন ভালো ভাবে চোখেও দেখেন না। হৃদরোগসহ বার্ধক্যজনিত নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত কদবানু এক প্রকার শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন। তার পরেও থেমে নেই জীবন চাকা। সরকারী খাবার আর সেখানকার নিবাসীদের সাথে গল্প গুজব করেই জীবন সংগ্রামে বেঁচে আছেন এই মা। তবে এত দুঃখ কষ্টের পরেও ভুলতে পারেননি আদারের সন্তানদের। সন্তানদের আদর ভালোবাসা বঞ্চিত হলেও এখনো সেই সন্তানদেরই মঙ্গল কামনা করছেন হতভাগা মা। এখনো তার মুখে একটি কথাই শোনা যাচ্ছে “আমার বড় ছেলেডা অশান্তিতে আছে। মুই লগে না থাকতে পারলেও আল্লায় জানো অগোরে ভালো রাহে। বউ, মাইয়া-পোলাগো লইয়া সুহে শান্তিতে থাহুক।”
গতকাল শনিবার নগরীর আমতলার মোড় সমাজ সেবা অধিদপ্তরের অধিনস্ত শান্তি নিবাসে দীর্ঘ ১৪ বছরের নিবাসী কদবানু পরিবর্তন প্রতিবেদকের সামনে অশ্রুশিক্ত দু’ছোখে আর ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে দুঃখ ভরা জীবনের ইতিহাস তুলে ধরেন এই হতভাগি মা কদবানু। সংসার জীবনের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি জানান সংসারে তার ২ ছেলে এবং তিন মেয়ে রয়েছে। ছোট মেয়েটি ছাড়া বাকি সবার বিবাহ হয়েছে। গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর বড় বিঘাই গ্রামে হলেও ছেলে এবং মেয়েরা তাদের সন্তানদের নিয়ে বরিশালের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছে। এর মধ্যে ছোট ছেলেটা শ্বশুর বাড়িতেই ঘর জামাই হয়ে থাকছে। মেয়েরা থেকেও স্বামীর সংসারে গিয়ে ভুলে গেছে মাকে। দুই-তিন মাস পরে একবার এসে মাকে দেখে গেলেও পারে আর না গেলেও পারে। বড় ছেলেটি স্ত্রী এবং সন্তানদের লেখা পড়া করাতে গিয়ে মায়ের খোঁজ খবর নেয়ার সময় করে উঠতে পারছে না। এতোগুলো সন্তান থাকতেও তাদের টাকায় কেনা কাপড় গায়ে জড়ানোর সৌভাগ্য আজও হয়নি কদবানুর। তিনি জানান, যুদ্ধের সময় তার বড় ছেলের বয়স ছিলো ৭ থেকে ৮ বছর। চারদিকে শুধু গুলির শব্দ আর লাশের গন্ধ। একমাত্র সন্তানটিকে বাঁচিয়ে রাখতে ঘরের মধ্যেই মাটি খুড়ে লুকিয়ে রেখে ছিলেন। সন্তানের খাবার যোগাতে দিনের বেলায় মানুষের ঘরে ঘরে সাহায্যের হাত পাতেন দুখিনী মা কদবানু। এদিকে যুদ্ধ শেষে কদবানু ও আফতের মৃধার সংসারে আরো ৫টি সন্তানের জন্ম নেয়। এর পর একটি সময় স্ত্রী এবং সন্তানদের রেখে পরকালে চলে যান তিনি। এর পর সন্তানদের লেখা-পড়া করানোর দায়িত্ব নেন অসহায় মা। মানুষের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে তাদের লেখা পড়া এবং ভরণ-পোষনের দায়িত্ব নেন। এক সময় সন্তানদের সাথে নিয়ে বরিশালে আসেন। এটাই যেন তার জীবনের চরম ভুল ছিলো। বরিশালে আসার কয়েক বছর পর ৩ মেয়েকে মোটামুটি ভালো যায়গায় বিয়ে দেন। দুটি ছেলে নিজেদের পছন্দে বিয়ে করে একে একে আলাদা হয়ে যান। ছোট ছেলে স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ির ঘর জামাই হয়। ছোট মেয়েটা বাইরে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে মাঝে মধ্যে মায়ের খোঁজ খবর নেন। কিন্তু খেয়ে পড়ে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে ভালো থাকলেও মায়ের খোঁজ নেয়ার সময় পাচ্ছেন না তিনি। শান্তি নিবাসে কোন রকম খেয়ে পড়ে বেচে আছেন। সন্তানদের কাছ থেকে কোন সহায়তা না পেয়ে পান খাওয়াটাও ছেড়ে দিয়েছেন অসহায় কদবানু।
তিনি বলেন, নগরীতে এক চিকিৎসকের বাসায় কাজের লোক হিসেবে কাজ করেছেন। সন্তানরা তাকে না দেখলেও অসুখ-বিসুখ হলে সেই ডাক্তারের কাছেই যান। সেখানে গেলে চিকিৎসা এবং ওষুধ কিনে দেন। মাঝে মধ্যে কিছু টাকাও দিয়ে দিচ্ছেন ওই চিকিৎসক। তবে সন্তানরা বড় হবার পর আজ পর্যন্ত তাদের কেনা টাকায় একটি শাড়ি বা পানের টাকাও জোটেনি তার কপালে। সরকারী ভাবে দেয়া ঈদ এবং কুরবানীতে দুটি শাড়ি, পেটিকোর্ট আর ব্লাউজেই পুরো বছর পার করছেন অসহায় এই মা। শুধু কদবানুই নয়, জীবন সংগ্রামে একই গল্প শুনালেন শান্তি নিবাসের বাসিন্দা আমেনা বেগম। উজিরপুর উপজেলার বড়াকোটা গ্রামের মৃত ইয়াছিন বেপারীর ৮০ বছর বয়সের উর্ধ্ব বয়সী স্ত্রী আমেনা বেগম গত আড়াই বছর পূর্বে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেন। এক ছেলে এবং এক মেয়ের জননী আমেনাকে স্বামীর মৃত্যুর পরে বরিশাল নার্সিং কলেজে চাকুরী দিয়ে দেন স্থানীয়রা। তার মধ্যে একমাত্র ছেলেটিকে হত্যা করে স্থানীয় প্রতিপক্ষরা।
এদিকে চাকুরী করা অবস্থায় মেয়ে হেনা বেগমকে নগরীর হাতেম আলী কলেজ চৌমাথা এলাকার খোকন তালুকদারের সাথে বিয়ে দেন। চাকুরীবাদা না করলেও আ’লীগের নেতা পরিচয়ধারী কুলাঙ্গার জামাতাই কেড়ে নিয়েছেন অসহায় আমেনার সর্বস্ব। জীবনভর মেয়ে এবং জামাতাকে চাকুরী করে খোড়াক জোগালেও শেষ পর্যন্ত তাদের চক্রান্তেই নিজের শেষ সম্বল স্বামীর ভিটার জমি হাত ছাড়া হয়। শেষ পর্যন্ত তার আশ্রয় জোটে বৃদ্ধাশ্রমে।
তিনি জানান, মেয়ে হেনা এবং জামাই খোকন তালুকদার কৌশলে তার পেনশন লিখে নিয়ে তা বিক্রি করে ফেলেন। এমনকি স্বামীর বাড়ির একটু জমি ছিলো তাও মেয়ে আর জামাই মিলে বিক্রি করে ফেলেছে। কিন্তু এখন আর তার কোন খোজ খবর নেয় না। তার পরেও মেয়ে আর নাতীকে ভুলতে পারছেন না। তাই মাঝে মধ্যে গালি আর লাঞ্ছনা শুনেও মেয়েকে দেখে আসছি। শুধু কদবানু আর আয়শাই নয়, শান্তি নিবাসে আছেন আরো ৪ অসহায় মা। যাদের জীবন ইতিহাস একই। এদের চোখে শুধুই দুঃখের কান্না। বৃদ্ধাশ্রমের গেটের দিকে তাকিয়ে থাকছেন। নিতে আসছেন কিনা আপন জন। কিন্তু তাকিয়ে থেকে দু’চোখ দিয়ে কান্না ঝড়লেও তাদের খোঁজ নিতে আসছেন না কেউ। অবহেলিত বৃদ্ধাশ্রমে প্রচন্ড গরম আর শীত উপেক্ষা করে কষ্টে দিন কাটছে তাদের। তার মধ্যেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অসহায় নিবাসী বৃদ্ধাদের সাথে গল্পগুজবেই কেটে যাচ্ছে এক একটি দিন। বরিশাল মহিলা ও শিশু কিশোরী হেফাজতীদের নিরাপদ আবাসন কেন্দ্র’র উপ-তত্তাবধায়ক শ্যামল সেন গুপ্ত বলেন, আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা কালে ২০০০ সনে শান্তি নিবাসের কার্যক্রম শুরু করা হয়। কিন্তু ২০০২ সনে বিএনপি ক্ষমতায় এসে বাতিল করে দেন। তার পরেও জেল খানার বরাদ্দ দিয়েই শান্তি নিবাসীদের খরচ বহন করা হচ্ছে। নিবাসীদের ছেলে মেয়ে অথবা আত্মিয় স্বজনরা তাদের খোঁজ নিচ্ছে না। তাই তাদের কিছু কষ্ট হচ্ছে। তবে শান্তি নিবাসের প্রজেক্ট পূনরায় চালু করতে ঢাকায় চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।