বিসিসির তদারকি না থাকায় রিকসা চালকদের কাছে জিম্মি যাত্রীরা

রুবেল খান ॥ বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত রিকসা ভাড়া গত প্রায় এক যুগেও কার্যকর হয়নি। এমনিক সেই নির্ধারিত ভাড়াও করা হয়নি সংশোধন কিংবা পরিবর্তন। যাত্রীদের ভোগান্তি নিরসনে বিভিন্ন স্পটে স্থাপন করা ভাড়া নির্ধারনের সাইনবোর্ডগুলোও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে যাত্রীদের জিম্মি করছে রিকসা চালকরা। এক সময় সর্মনি¤œ ভাড়া চার টাকা থাকলেও বর্তমানে রিকসায় বসতে হলেও দিতে হচ্ছে ১০ টাকা। আর এ নিয়ে প্রায় সময় রিকসা চালকদের কাছে লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে যাত্রীদের। রিকসা নিয়ন্ত্রনে নগর কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু তদারকী কিংবা মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীদের এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের দায়ভার অনেকটা মাথা পেতে নিয়েছেন বিসিসি’র সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারাও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় রিকসা ভাড়া নিয়ে চালকদের বাড়াবাড়িতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে নগরবাসী। রিকসা চালকরা যে যার মতো ভাড়া আদায়ের কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের। এমন পরিস্থিতিতে নগরবাসীর দাবীর মুখে ২০০৬-০৭ অর্থ বছরে রিকসা ভাড়া নির্ধারন করে দেয় সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। বিসিসি’র প্রথম মেয়র এ্যাড. মজিবর রহমান সরোয়ারের সময়ে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা চালক লাইসেন্সের সাথেই সংযুক্ত করা হয়েছিলো।
তৎকালীন সময়ে বিসিসি কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী নগরীতে সর্বনি¤œ রিকসা ভাড়া ছিলো ৪ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২২ টাকা। যার মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের সামনে থেকে বিএম কলেজ পর্যন্ত ১০ টাকা, নথুল্লাবাদে ১২ টাকা, শেবাচিম হাসপাতালের সামনে ৮ টাকা এবং কোতয়ালী মডেল থানায় ৫ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।
এছাড়া নগর ভবনের সামনে থেকে দপদপিয়া খেয়াঘাট পর্যন্ত ২২ টাকা, শেবাচিম হাসপাতালের সামনে থেকে বিএম কলেজ ১০ টাকা, সদর হাসপাতালে ১২ টাকা, সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে ৮ টাকা, টাউন হলের সামনে থেকে পুলিশ লাইনের সামনে ৫ টাকা, কাকলীর মোড় থেকে নতুন বাজার ৪ টাকা, নথুল্লাবাদ থেকে নগর ভবন ১০ টাকা, মেডিকেল কলেজের সামনে ১০ টাকা, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ১০ টাকা, জেলা স্কুলের সামনে ১০ টাকা, কোতয়ালী মডেল থানা পর্যন্ত ১০ টাকা ভাড়া সহ প্রতিটি স্থানে ভাড়া নির্ধারন করা হয়।
এদিকে বিসিসি থেকে এই ভাড়া নির্ধারণের পর গত ১০ বছরেও তা কার্যকর হয়নি। এমনকি ভাড়া কার্যকরে নেয়া হয়নি তেমন কোন পদক্ষেপ। অবশ্য মরহুম শওকত হোসেন হিরন মেয়র থাকা কালে প্রথম দিকে নগরীর বিভিন্ন স্পটে বিসিসি থেকে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা সাইন বোর্ডের মাধ্যমে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। তার পরেও ভাড়া কার্যকর না হলে সময়ের ব্যবধানে সেই সব সাইনবোর্ডগুলো লাপাত্তা হয়ে গেছে।
অপর দিকে গত ১০ বছরের ব্যবধানে দ্রব্য মূল্য কয়েক দফায় বৃদ্ধি পেলেও সংস্কার কিংবা পরিবর্তন হয়নি রিকসা ভাড়ার তালিকার। যে কারণে রিকসা চালকরাই যে যার মতো করে ভাড়া নির্ধারণ করে নিয়েছেন। এক প্রকার স্বেচ্ছাচারীতার মাধ্যমে রিকসা চালকরা জিম্মি করে রেখেছে যাত্রীদের। বতর্মান সময়ে রিকসায় পা রাখার চিন্তা করলেও ১০ টাকা ভাড়া গুনতে হয় যাত্রীদের।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান সময়ে সিটি কর্পোরেশনের সামনে থেকে শেবাচিম হাসপাতালের সামনে রিকসায় যেতে হলে যাত্রীকে গুণতে হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। সদর রোড অশ্বিনী কুমার হলের সামনে থেকে বিএম কলেজ পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হয় ৩০ টাকা। নথুল্লাবাদ থেকে সদর রোড ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। তাছাড়া এক সময় রিকসা ভাড়া প্রতি ঘন্টায় ৮০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা শুধুই ইতিহাস। কারণ এখন প্রতি ঘন্টায় রিকসা ভাড়া দিতে হচ্ছে সর্বনি¤œ তিনশ টাকা। যা যাত্রীদের জন্য খুবই ভোগান্তিকর। কেননা চালকদের নির্ধারিত ভাড়ার ১টাকা কম বললেও যাত্রীদের তোলা হচ্ছে না রিকসায়। আবার প্রায় সময় রিকসা চালকদের সাথে যাত্রীদের হাতাহাতি এমনকি মাঝে মাঝে লাঞ্ছিত হতে হয় যাত্রীদের। এজন্য অবশ্য বিসিসি কর্তৃপক্ষকে দায়ি করছেন যাত্রীরা।
তাদের দাবী পূর্বে যে ভাড়া নির্ধারন করা হয়েছে তা কার্যকর করতে পারেনি বিবিসি। তাছাড়া বর্তমান সময়ে ঐ ভাড়া নিয়ে যাত্রী বহন করা হলে চালকদের পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে। অবশ্য বর্তমান দ্রব্য মূল্যের সাথে মিল রেখে নতুন করে রিকসা ভাড়া নির্ধারণ করলে যাত্রীদের জিম্মি হয়ে থাকতে হতো বলে দাবী জানান তারা।
এ প্রসঙ্গে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের যানবাহন লাইসেন্স পরিদর্শক আতিকুর রহমান মানিক এর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, বিসিসিতে এক সময় টোকেনধারী লাইসেন্স এর সংখ্যা ছিলো ১২ হাজার। কিন্তু বর্তমানে নগরীতে এত রিকসা নেই। বেশি হলে সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার রিক্সা নগরীতে চলাচল করছে।
ভাড়া নির্ধারণ এবং তা নিয়ন্ত্রনের বিষয়ে মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকার দায় স্বীকার করে তিনি বলেন, আমরাও রিকসায় চলাচল করি। রিকসা চালকরা আমাদের সাথেও যে দুর্ব্যবহার করে তা মানা যায় না। কিন্তু পেশায় রিকসা চালক বিধায় এদের কেউ কিছু বলে না।
তিনি বলেন, রিকসা চালকদের ভাড়া পুনরায় নির্ধারণের বিষয়টি অতি দ্রুত সমাধান করা জরুরী। তবে বিষয়টি নিয়ে পূর্বে এমন করে ভাবা হয়নি। যাত্রীরা যাতে ভোগান্তির হাত থেকে রক্ষা পায় সে জন্য নতুন করে রিকসা ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে সিটি মেয়র এর সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নিবেন বলেও জানান তিনি।