বির্তকিত হয়ে পড়েছে ছাত্রলীগ

জুবায়ের হোসেন॥ নগরীতে প্রতিটি বিতর্কিত কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি এই নীতি সংগঠনের জেলা ও মহানগর শাখার বর্তমানের নেতা কর্মিরা মানে না। বর্তমানে তারা টেন্ডারবাজী, সরকারি দফতর ও জমি দখল, টাকার ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষে জড়ানো ছাড়াও ভাড়াটে হিসেবে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও তারা যাত্রা ও জুয়া পরিচালনার দায়িত্বেও রয়েছে বলে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে।
বর্তমানের ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের দাবী তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এসব কাজে জড়াননি। তাদের দলের নেতারা জড়িয়েছেন বলে মন্তব্য করেন একাধিক ছাত্রলীগ নেতা। জেলা ও মহানগরের সাবেক একাধিক ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, ছাত্রলীগে পূর্বের নেতৃত্ব দেয়া সকলেই নীতিবান ও আদর্শ রাজনীতিবিদ ছিলেন। এই নগরী থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতি ও বিএম কলেজে নেতৃত্ব দিয়ে দলের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক হয়েছেন বিএম কলেজের সাবেক ভিপি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ্যাড. জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, আ.খ.ম জাহাঙ্গীর হোসাইন এমপি। বিএম কলেজ থেকে নির্বাচিত জিএস এরপরে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহ-সভাপতির পর জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে অগ্রনী ব্যাংকের দায়িত্বে যাওয়া এ্যাড. বলরাম পোদ্দার বাবলু এই নগরীতে ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। এছাড়াও এই নগরী থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতি করে প্রভাবশালী আ’লীগ নেতার ভূমিকায় রয়েছেন অনেক সাবেক নেতা। তারা বিতর্কিত কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত না করে সংগঠনের সুনামের বিষয়টিই বেশি ভাবতেন। তবে বর্তমান নেতারা এসব রাজনীতি পছন্দ করে না। নীতির রাজনীতি বইয়ের ইতিহাস ভেবে পথ চলেন বর্তমান নেতারা। তাদের কাছে টাকা আয় করাটাই মূখ্য। সেটা যেমনভাবে করা যায়। সেই পন্থা অবলম্বন করতে তারা একটুও পিছু তো হটেই না বরং প্রতিনিয়ত তারা বির্তকিত কর্মকান্ডের নতুন নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেন। যা সোমবার নগর ভবন দখলে প্রমান দিয়েছে।
তাদের কর্মকান্ডে নেতারা এত বিব্রত যে কেউ এদের লাগাম টেনে ধরা তো দুরের কথা, এখন এড়িয়ে চলছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম তো প্রকাশ্যে বলে ফেলেন “এখানের ছাত্রলীগের এমন অবস্থা আগে জানলে আসতাম না”। এসব নেতাদের দিয়ে ছাত্রলীগের গতিশীলতা বাড়াতে ২০১১ সালের ৯ জুলাই ৩ সদস্য বিশিষ্ট জেলা ও মহানগরের কমিটি ঘোষনা করা হয়।
কমিটির নেতারা এত ব্যস্ত যে এখন পর্যন্ত ছাত্রলীগের মহানগর কমিটি ৩ সদস্যবিশিষ্ট রয়ে গেছে। তারা হলো-সভাপতি জসিম উদ্দিন, সাধারন সম্পাদক অসিম দেওয়ান ও সাংগঠনিক সম্পাদক তৌসিক আহম্মেদ রাহাত। জেলা সভাপতি সুমন সেরনিয়াবাত, সাধারন সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক ও সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সৈয়দ আবিদ। তবে তারা পূনাঙ্গ কমিটি গঠনে সমর্থ হয়েছে। পদ পেয়ে অর্থ উপার্জনের মিশনে এসব নেতারা প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম জেলা সভাপতি সুমন সেরনিয়াবাত ও তৌসিক আহম্মেদ রাহাত। প্রায় প্রতি মাসে প্রতিটি সরকারি দপ্তরে একাধিক টেন্ডারবাজী ও তা নিয়ে সংঘর্ষ যার উজ্জল প্রমাণ। শুধু সরকারি দপ্তরই নয়, তারা জড়িয়েছে দখল বাণিজ্যে। প্রাথমিক অবস্থায় পদবিওয়ালা নেতারা জেলা মহানগর মিলিয়ে তিন ভাগে বিভক্ত থাকলেও আর্থিক ক্ষেত্রে তারা প্রথম থেকেই ছিল এক। একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করছে সব বিতর্কিত কাজে। বর্তমানে ছাত্রলীগের হস্তক্ষেপ ছাড়া মূল দল অচল হয়ে পড়েছে। দলের সিনিয়র নেতারাও অনেক ক্ষেত্রে তাদের সমীহ করে চলেন। বিতর্কিত যত কাজ সব কিছুতেই ছাত্রলীগের সহায়তা নেন তারা। গত ৭ মার্চের আলোচনা সভায় দলীয় কার্যালয়ে ছাত্রলীগের হাতাহাতি, ১১ মার্চ বিএম কলেজের সাধারন ছাত্রদের সাথে ছাত্রলীগের ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া ও বাণিজ্য মেলার সাইকেল স্ট্যান্ড নিয়ে সংঘর্ষ, ১২ মার্চ বিসিসির উচ্ছেদ অভিযানে ছাত্রলীগের বাধা, ১৪ মার্চ বিএম কলেজে ছাত্রলীগের রাতভর হামলা ও সংঘর্ষ, ১৫ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোঃ নাসিম এর সামনেই সার্কিট হাউজে ছাত্রলীগের হাতাহাতি, ২২ মার্চ চরকাউয়া মিনিবাস মালিক সমিতি দখল নিয়ে সংঘর্ষ ও সর্বশেষে ২৩ মার্চ ইজারার দরপত্র কিনতে গিয়ে নগর ভবন দখল। তবে এই শেষ নয় এমন শতাধিক অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। নগরী ও আশপাশ জুড়ে বর্তমানে চলমান বেশিরভাগ যাত্রা, জুয়াই দেখাশোনা করছে ছাত্রলীগ। বাণিজ্য মেলার নামে সর্বশেষ শুরু হওয়া পুতুল নাচ, যাত্রা, বিচিত্রা অনুষ্ঠান এর মতো অশ্লীলতা সঠিকভাবে চালানোর দায়িত্বও ছাত্রলীগের কতিপয় নেতার। যেখানে রোজ প্রত্যক্ষভাবে তারাই তদারকি করে থাকেন। তবে এ সকল অভিযোগ পুরোপুরি মানতে নারাজ জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগ নেতারা। তাদের দাবী সবখানে তারা ইচ্ছে করে যান না, দলের অন্যান্য সংগঠনের নেতাদের অনুরোধে তাদের গিয়ে বিতর্কে পরতে হয়। তবে বিতর্কে পড়ার যথার্থ মুনাফাও তারা পেয়ে থাকেন। তাদের এমন কর্মকান্ড পুরো নগরবাসীর মধ্যেই একটি চাপা ঘৃনা তৈরি করেছে। এ বিষয়ে সুশীল সমাজের সাথে আলাপকালে তা স্পষ্ট হয়েছে। এ বিষয়ে বরিশাল ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ মহসিন উল ইসলাম হাবুল বলেন, জবাবদিহিতার অভাবে ছাত্রলীগ এখন সকল ক্ষেত্রেই হস্তক্ষেপ করছে। একজন শিক্ষক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে বাণিজ্য মেলার অশ্লীলতা ছাত্রলীগের তত্ত্বাবধানে চলছে তার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আগামী ১ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে এইচএসসি পরিক্ষা, অন্যদিকে চলছে বাণিজ্য মেলার অশ্লিলতা যা চালাচ্ছে ছাত্রলীগ নেতা কর্মীরাই। তাদের উচিৎ ছাত্রদের কল্যানে কাজ করা কিন্তু তারা করছে বিপরীত।
একই বিষয়ে জেষ্ঠ্য সাংবাদিক এ্যাডঃ মানবেন্দ্র বটব্যাল বলেন, ছাত্রলীগের এমন কাজ কোন ভাবেই কাম্য নয়। এতে মূলদলের ভাবমূর্তী নষ্ট হচ্ছে। এদের শীঘ্রই নিয়ন্ত্রন করা দরকার যা অনেক আগেই করা উচিৎ ছিল। এদের এখনই নিয়ন্ত্রন করা না হলে এরা আগামীতে ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ হয়ে যেতে পারে।
একই বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আ’লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডাঃ মোখলেছুর রহমান দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এই সমস্যা আমরাই সৃষ্টি করেছি, দূর থেকে কেউ এসে এমন সমস্যা তৈরি করে নি। সমস্যা যখন আমাদের সৃষ্ট, এর সমাধানও আমাদেরই করতে হবে। তবে অতীব দুঃখের বিষয় এই যে, আমরা যে সমস্যার তৈরিকারক তা আমরা নিজেরাও বুঝি না তাই কোন সমাধানও হচ্ছে না।