বিদ্যুৎ সংকটে দুর্ভোগে সাড়ে ৩ কোটি মানুষ

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ বরিশাল, ভোলা, গোপালগঞ্জ ও ভেড়ামারা সহ একাধিক উৎপাদন ইউনিট বন্ধ থাকার পাশাপাশি জাতীয় গ্রীড থেকে সরবরাহ হ্রাসের ফলে গতকাল পশ্চিম জোনের ২১টি জেলা জুড়ে বিদ্যুতের চরম হাহাকারে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ চরম দুর্ভোগে পরেন। দক্ষিন-পশ্চিম মোসুমী বায়ু দূর্বল হবার ফলে বৃষ্টিপাতের প্রবনতা হৃাস পাবার সাথে তাপমাত্রার পারদ গতকাল প্রায় ৩৬ডিগ্রী সেলসিয়াসের কাছে পীঠে ওঠা-নামা করে। আর এরই মধ্যে গতকালের নজিরবিহীন বিদ্যুৎ সংকট বরিশাল ও খুলনা বিভাগ সহ ফরিদপুর অঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষের দুর্ভোগকে ভয়বহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। গতকাল দিনভরই বরিশাল সহ দক্ষিনাঞ্চল জুড়ে বিদ্যুতের চরম হাকার অব্যাহত ছিল। ফলে এবার বিলম্বে জমে ওঠা ঈদ বাজারেও ফের চরম দুর্ভোগ নেমে আসে।
ভোলায় নব নির্মিত ২২৫মেগওয়াট পাওয়ার স্টেশনের দুটি ইউনিটই গতকাল সকাল থেকে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় সংকট সৃষ্টি হয় পশ্চিম জোনে। এ ইউনিট দুটি গত কিছু দিন ধরে পরীক্ষামূলকভাবে চলছিল। অপরদিকে বরিশাল ও ভেড়ামাড়া গ্যাস টার্বাইনের ২০মেগাওয়াটের ৫টি ইউনিটও জ্বালানী সংকট সহ নানা কারাগরি ত্রুটির কারনে বন্ধ থাকছে। এরই মধ্যে গোপালগঞ্জের পিকিং প্লান্টটিও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে পড়েছে। ফলে পশ্চিম জোনের বেশীরভাগ উৎপাদন ইউনিটই বন্ধ থাকায় গ্রীড সঞ্চালন লাইনে ভোল্টেজ সংকটে জাতীয় গ্রীড থেকেও চাহিদা মাফিক সরবরাহ গ্রহণ করা সম্ভব হয় নি।
ফলে গতকাল সকাল থেকেই দক্ষিনাঞ্চল সহ সমগ্র পশ্চিম জোনেই সরবরাহ ঘাটতি শুরু হয়। এরই মধ্যে দুপুর সোয়া ৩টার পরে বরিশালÑভেড়ামারা ডবল সার্কিট গ্রীড লাইনে ফ্রিকোয়েন্সী দূর্বল হয়ে গোটা সঞ্চালন ব্যবস্থাই বিপর্যস্ত হয়ে পরে। এসময় সমগ্র দক্ষিনাঞ্চলই ব্লাক আউটে চলে যায়। প্রায় কুড়ি মিনিট পরে বরিশাল গ্রীড সাব-স্টেশনটি সচল করা সম্ভব হলেও ৯০মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১০মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে ২৫মেগাওয়াটে সরবরাহ বৃদ্ধি করা হলেও গোটা দক্ষিনাঞ্চল জুড়েই বিদ্যুতের চরম হাহাকার চলতে থাকে। বিকেল ৫টায় চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ৩০মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবারহ করা হচ্ছিল বরিশাল গ্রীড সাব-স্টেশন থেকে । অথচ তখন চাহিদা ছিল প্রায় ৯০মেগাওয়াট। সন্ধা ৬টা নাগাদ বরিশাল ও পটুয়াখালী সহ সমগ্র দক্ষিনাঞ্চলে প্রায় দেড়’শ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫০মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে পারেনি পিডিবি। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বরিশাল গ্যাস টার্বাইন পাওয়ার স্টেশনের ১টি ও ভোড়ামাড়া পাওয়ার স্টেশনের ২টি ইউনিট সচল করা সম্ভব হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের পুরনো এসব ইউনিট থেকেও ক্ষমতার দুইÑতৃতিয়াংশের বেশী বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছিল না।
ফলে সমগ্র দক্ষিনাঞ্চলের চিকিৎসা ও পানি সরবারহ ব্যবস্থা গতকাল পুনরায় মুখ থুবড়ে পরে । মাত্র এক দিন আগে গত রবিবারও বরিশাল ২৩০/১৩২কেভী গ্রীড সাব-স্টেশনে গোলযোগের কারনে বরিশাল ও ঝালকাঠী সহ দক্ষিনাঞ্চলের বেশীরভাগ এলাকায় দিনভর বিদ্যুতের হাহাকার চলছিল। গতকাল সকাল থেকেও আরো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ঈদের বাজারে চরম বিরূপ প্রভাব পরে। ৩৫.৫ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার সাথে লাগাতার বিদ্যুৎ সংকটে ঈদ বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা সবার মাথার ঘাম পায়ে গড়ায়। বরিশাল শের-এ-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সহ দক্ষিনাঞ্চলের সব সরকারী-বেসরকারী চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো চরম অচলবস্থার কবলে পড়ে। হাসপাতালগুলাতে অনেক জরুরী অস্ত্রপাচারও বন্ধ রাখতে হয় বিদ্যুতের অভাবে। বিদ্যুৎ সংকটে বরিশাল মহানগরীর বেশীরভাগ পানির পাম্পও অচল ছিল গতকাল। ফলে নগরী জুড়েই পানির হাহাকার লেগে যায়। একই পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল গোটা দক্ষিনাঞ্চলের জেলা-উপজেলা সদরের পৌর এলাকাগুলোতেও। সন্ধায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভোলার ২২৫মেগাওয়াটের পাওয়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট চালু করার চেষ্টা চলছিল। গোটা দক্ষিনাঞ্চল জুড়েই ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে রোজাদার সহ সাধারন মানুষের দুর্ভোগ ছিল বর্ণনার বাইরে।