বিদ্যুৎ ও সড়ক অবকাঠামো সহ নদী ভাঙনে ডকইয়ার্ডগুলোর উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ দেশের নৌ নির্মাণ শিল্পে বরিশাল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বরিশাল নদী বন্দরের অদূরে বেলতলা এলাকায় সম্পূর্ণ দেশীয় ও লাগসই প্রযুক্তির বেসরকারী নৌ নির্মাণ কারখানাগুলোতে প্রায় ২৫টি অভ্যন্তরীন ও উপকূলীয় রুটে চলাচলকারী যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযানের সাফল্যজনক নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখানে নির্মিত হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ আধুনিক যাত্রীবাহী নৌযান। কয়েকটি সরকারী ও বেসরকারী ব্যাংক এসব নৌযান নির্মাণে সীমিত কিছু আর্থিক সহযোগিতাও প্রাদান করছে। তবে এসব ডকইয়ার্ড এখনো শিল্পের মর্যাদা লাভ করেনি। সম্পূর্ণ বেসরকারী উদ্যোগে গড়ে ওঠা এসব নৌ নির্মাণ শিল্পকে সরকারী কোন নীতিমালার আওতায় নেওয়ারও উদ্যোগ নেই। নদী ভাঙন, দুর্বল সড়ক অবকাঠামো আর লাগাতার বিদ্যুৎ সংকট এখনো বরিশালের উদীয়মান নৌ নির্মাণ শিল্পকে পিছনে টানছে।
সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের অনুমোদিত নকশায় এবং প্রতিষ্ঠানটির প্যানেল প্রকৌশলীদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এসব ডকইয়ার্ডে নির্মিত নৌযান সমূহ ইতোমধ্যে দেশের অভ্যন্তরীন নৌপথে যাত্রী ও উপকূলীয় এলাকায় পণ্য পরিবহনে যথেষ্ঠ সুনাম অর্জন করলেও এ শিল্পের সম্প্রসারণে তেমন কোন উদ্যোগও নেই। এমনকি বরিশালে এসব ডকইয়ার্ড সমূহ গত কয়েক বছর ধরে কীর্তনখোলা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের কবলে। ফলে সংকুচিত হয়ে আসছে উজ্জল সম্ভাবনার ডকইয়ার্ডগুলোর পরিধি। এতে করে এখানে নতুন করে কাজের অর্ডার দিতেও অনেক উদ্যোক্তা আস্থাহীনতায় ভুগছেন। এবারের বর্ষা মৌসুমে কীর্তনখোলা নদী তীরবর্তি বেলতলা এলাকায় ভায়বহ আকার ধারণ করায় ডকইয়ার্ডগুলো সহ পাশর্^বর্তি ফেরিঘাট সহ অদূরেই বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের পানি শোধনাগারও ভয়াবহ হুমিকর মুখে।
তবে এরপরেও গত কয়েক বছর ধরে বরিশালের বেসরকারী ডকইয়ার্ডগুলো যথেষ্ঠ টেকশই, নির্ভরযোগ্য এবং বিলাসবহুল নৌযান তৈরী করে চলছে। ইতোমধ্যে দেশের সর্ববৃহৎ কয়েকটি যাত্রীবাহী নৌযান নির্মিত হয়েছে বরিশালের ডকইয়ার্ডগুলোতে। ‘কীর্তনখোলাÑ২’ , সুন্দরবন-৯ ও সুরভীÑ৯’ নামের এসব বিলাসবহুল যাত্রীবাহী নৌযান সম্পূর্ণভাবেই বেসরকারী খাতে নির্মিত হয়েছে। এসব নৌযান নির্মাণে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংক ছাড়াও বেসরকারী ইসলামী ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড সীমিত কিছু অর্থায়ন করেছে।
এছাড়াও আড়াই হাজার টন পণ্য পরিবহন ক্ষমতা সম্পন্ন ‘এম ভি সিÑস্পিরিট’ ও দেড় হাজার টন পণ্যবাহী উপকূলীয় নৌযান ‘এমভি সীÑএ্যাঞ্জেল’ নির্মিত হয়েছে বরিশালের বেসরকারী ডকইয়ার্ডগুলোতে। এখানের একটি ডকইয়ার্ডে সম্প্রতি নির্মিত হয়েছে দেশের উপকূলীয় নৌপথে যাত্রীবাহী বিলাসবহুল নৌযান ‘এমভি পারিজাত’। মাস কয়েক আগেই বরিশালের অপর একটি বেসরকারী ডকইয়ার্ড থেকে কীর্তনখোলায় ভাসানো হয়েছ ‘এমভি সুরভীÑ৯’ নামের একটি বিলাসবহুল নৌযান। সুরভী শিপিং লাইন্স-এর মালিকানায় নির্মিত এ নৌযানটি বরিশালÑঢাকা নৌপথে নির্ভরতার সাথে যাত্রী পরিবহন করছে। গত বছরই এখানে নির্মিত ‘এমভি সুন্দরবন-৯’ নামের অপর একটি নৌযান পটুয়াখালীÑঢাকা নৌপথে যাত্রী পরিবহন করছে। এর আগে এখানে নির্মিত হয় দেশের প্রথম সর্ববৃহৎ যাত্রীবাহী নৌযান ‘এমভি কীর্তনখোলাÑ২’।
বর্তমানে এখানে ‘সুন্দরবন-১০’ নামের অপর একটি নৌযানের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের সর্বাধুনিক এ নৌযানটি বরিশালÑঢাকা নৌপথে যাত্রী পরিবহন শুরু করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাঈদুর রহমান রিন্টু। তিনি বরিশালে তিলে তিলে গড়ে ওঠা এ নৌ নির্মাণ শিল্পসমূহ রক্ষায় অবিলম্বে সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি বেলতলা এলাকার নদী ভাঙন প্রতিরোধ সহ এসব ডকইয়র্ডের সাথে সংযোগ রক্ষাকারী রাস্তাঘাটের উন্নয়নের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘœ করারও দাবী জানান। তিনি দেশের নৌ পরিবহন খাতের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নে সরকারীÑবেসরকারী ব্যাংকসমূহের অতীত মনোভাব ও দৃষ্টিভংগির পরিবর্তনেরও আহ্বান জানিয়েছেন। নৌ নির্মাণ শিল্পে ব্যাংকসমূহের সুদের হার হ্রাস সহ এক্ষত্রে সরকারী ব্যাংকসমূহকে অতীতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে বের হয়ে বাস্তব দৃষ্টিভংগি নিয়ে কাজ কারারও আহ্বান জানিয়েছেন ।