বিদ্যুত বিভাগের মহাচুরিতে সাধারনের ঘাড়ে বাড়তি বিলের বোঝা

সাইদ মেমন ॥ বিদ্যুত বিভাগের ডিজিটাল মিটার ও ইউনিট ব্যবহারের পরিমানের প্রকারভেদের উপর বিলের টাকার হিসেবের জটিলতার সুযোগ নিয়ে নীচু থেকে উচু সকল পদবীধারীদের অবৈধ আয় বাড়িয়েছে। যার কারনে নিরীহ ও সাধারন গ্রাহকরা বাড়তি বিলের টাকা জমা দিচ্ছে। গ্রাহকদের ডিজিটাল মিটারের ও ইউনিট ব্যবহারের বিলের টাকার হিসেবে না বুঝতে পারার কারনে অটো এবং রিক্সার চার্জ দেয়া গ্যারেজ পরিচালনাকারীরাও বিদ্যুত বিভাগের অসাধুদের সাথে সাথে কালো টাকার মালিক বনে যাচ্ছে।
যার সত্যতা স্বীকার করে ওজোপাডিকোর বিদ্যুত বিতরন ও বিক্রয় কেন্দ্র-১’র নির্বাহী প্রকৌশলী আমজাদ হোসেন বলেন, যারা এসব কর্মকান্ডে জড়িত তাদের চিহিৃত করা যাচ্ছে না। কেউ যদি গোপনে এদের পরিচয় দেয়। তাহলে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিদ্যুত বিতরন ও বিক্রয় কেন্দ্র-২’র নির্বাহী প্রকৌশলী এটিএম তারিকুল ইসলাম বলেন, এই অভিযোগ এখন আর নেই। বর্তমানে মিটার রিডারদের ইউনিট সংগ্রহের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন সহকারী প্রকৌশলীরা মিটারের ইউনিট সংগ্রহ করে। তারপর বিল করা হয়। এছাড়াও প্রতিমাসে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রতিটি অটো গ্যারেজের মিটার পরিদর্শন করে। তাই এখন আর চুরি করা সম্ভব নয়।
তবে বিদ্যুত বিভাগের নির্ভরযোগ্য সুত্র জানিয়েছে, কোন পরিকল্পনা মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত সঠিকভাবে তদারকি হয় না। যত কঠোর পদক্ষেপের উচু থেকে নিচু পদবীধারীদের অবৈধ আয় রোধ করা সম্ভব নয়। কারন অবৈধ আয়ের ভাগ সকলেই পায়। তাই দেখানো কঠোরতার স্থায়িত্ব সময় থাকে।
সুত্র জানায়, শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি গ্রাহক বিদ্যুত বিলের ইউনিটের ও ডিজিটাল মিটারের হিসেব সম্পর্কে সম্পূর্ন অজ্ঞাত। এর পর রয়েছে ইউনিট ব্যবহারের পরিমানের উপর বিভিন্ন কোটার টাকার হিসেব এবং বানিজ্যিক ও আবাসিক গ্রাহকদের ইউনিটের টাকার হিসেবে ব্যবধান।
কাউনিয়ার বাসিন্দা গ্রাহক রবিউল ইসলাম সুজনের কাছে বর্তমানের ডিজিটাল মিটারের ও ইউনিটের হিসেবে সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, তিনি কিছুই জানেন না। বিদ্যুত বিভাগ যা বিল করে দেয়। সেই টাকা জমা দেয়া হয়।
তিনি বলেন, ডিজিটাল মিটার থেকে কিভাবে ইউনিট ব্যবহার পরিমান কিভাবে বের করা হয়। তা না জানায় তা যে ইউনিট উল্লেখ করে তাই মেনে নেয়া হয়। এছাড়া আবাসিক ও বানিজ্যিক গ্রাহকদের ইউনিটের মুল্যর ব্যবধান এবং ইউনিটের বেশি কমের কারনে টাকা কম-বেশির হিসেবের অজ্ঞতায় দেখা হয় না বলেন তিনি।
তিনি বলেন, এই জন্য বিদ্যুত বিভাগের ডিজিটাল মিটার থেকে ইউনিট ব্যবহারের পরিমান বের করার নিয়ম ও ইউনিটের মুল্যর তালিকা গ্রাহকদের সরবরাহ করা উচিত। তাহলে অজ্ঞতার কারনে বাড়তি টাকার বিলের হাত থেকে রক্ষা পাবেন বলে মন্তব্য করে সুজন।
মহাবাজ এলাকার সামসুজ্জামান সান্টু নামের গ্রাহক তো নিয়ম ও ইউনিটের মুল্যের তালিকা বিদ্যুত বিভাগের বাধ্যতামুলক সরবরাহের দাবি করেছেন।
বিদ্যুত বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবৈধ আয়ের উৎস্য সম্পর্কে নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রাহক বলেন, তার পরিবারে যে পরিমান বিদ্যুত ব্যবহার করা হয়। তাতে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা বিল আসতো। বিদ্যুত বিভাগের লোকের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করে রক্ষার পেয়েছন তিনি।
ওই গ্রাহক বলেন, তিনি এখন এক হাজার টাকার নিচে সব সময় বিল জমা দিচ্ছেন। কোন কোন মাসে ৫ থেকে ৬০০ টাকা বিল জমা দেন। এই জন্য তিনি মাত্র ৫০০ টাকা বাড়তি ব্যয় করেন।
নগরীর এক গ্যারেজে প্রতিদিন ২০ অটো রিক্সার চার্জ দেয়। বিদ্যুত বিভাগের লোকের সাথে চুক্তি অনুযায়ী মাসে ৫ হাজার টাকার বেশি বিল আসে না। এর জন্য বিদ্যুত বিভাগের লোকদের বাড়তি আরো ৫ হাজার টাকা দেন।
বিদ্যুত বিভাগের লোকদের দেয়া হিসেব অনুযায়ী একটি ৪ ব্যাটারির অটোরিক্সা প্রতিদিন সর্বনি¤œ ১৫ ইউনিট বিদ্যুত ব্যবহার করে। ব্যাটারি বা চার্জের যন্ত্রে ত্রুটি দেখা দিলে এর পরিমান আরো বেড়ে যায়। এছাড়া ৫ ও ৬ ব্যাটারির অটোতে ২২ থেকে ২৫ ইউনিট বিদ্যুত ব্যবহার হয়।
এতে একেকটি গ্যারেজে বিদ্যুত বিলের পরিমান অর্ধ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু তারা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় করে। আর হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা।
এক গ্যারেজ মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, মিটার পরিদর্শনের পূর্বে ইউনিট জমা থাকা মিটার নষ্ট করা হয় কিংবা বিদ্যুতের লোকেরা এসে মিটার পরিবর্তন করে বিলের সাথে ইউনিট উল্লেখ করে স্থাপন করে দেয়। এই জন্য জমা পড়া ইউনিটের মুল্যর তিনভাগের এক ভাগ অনেকে আবার অর্ধেক টাকা দেয়।
অবৈধ এই আয়ের খেসারত দেয় অজ্ঞ গ্রাহকরা। প্রতিটি ফিডারের বিদ্যুত বিভাগের মিটারে উঠা ইউনিটের পরিমান ও মুল্য উঠে সাধারন গ্রাহকদের বিলে। চুরির এই কর্ম বিদ্যুত বিভাগের সকলের যোগ সাজসে হয়ে থাকে।